শিক্ষকের ‘শাসনে’ বিপর্যস্ত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য

০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪২ PM , আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৪ PM
শিক্ষকের ‘শাসনে’ বিপর্যস্ত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য

শিক্ষকের ‘শাসনে’ বিপর্যস্ত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য © এআই

প্রতিবছর দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে অর্ধলক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। অধ্যয়নকালে নৈমিত্তিক চাপে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রায়ই অভিযোগ করেন তারা। এমনকি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে। পড়াশোনা, অর্থনৈতিক সংকট আর সম্পর্কের টানাপোড়েনের বাইরেও বড় একটি অংশের অভিযোগ, কিছু শিক্ষকের নানা আচরণ তাদের মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। ফলে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা সার্বক্ষণিক একটি ‘ভয়ের পরিবেশে’ বাস করেন।

সম্প্রতি কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী অর্পিতা নওশিনের আত্মহননের সংবাদে এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওই শিক্ষার্থীর সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মেডিকেলটির এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের রোষানলে পড়ে ওই বিষয়ে ৫ বার অকৃতকার্য হয়েছেন, সেটি থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপে নওশিন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এর আগে গত ১৮ মার্চ সাতক্ষীরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী সজীব দত্তের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের সময়ও তার ডিপ্রেশনের বিষয়টি সামনে আসে।

এসব ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগের পাহাড় জমে মেডিকেল শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— আচরণ পছন্দ না হলে, ভিন্ন রাজনৈতিক মতের হলে অথবা কোনো বিষয়ে প্রতিবাদী হলে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য করেন শিক্ষকদের একাংশ।

মেডিকেলের ম্যাক্সিমাম টিচার এত নির্দয় যে সেটা ভাবা যায় না। এই পরিবেশে উনাদের কাছে নিজেকে খুব worthless মনে হয়। এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। আর এজন্য উনাদের বিহেভিয়ারে কোনো চেঞ্জ  আসে না। মেডিকেলের মত এত টক্সিক আর জঘন্য পরিবেশ আমি জানি না কোথাও আছে কি না— সানজিদা সারহান, অর্পিতা নওশিনের স্কুলজীবনের বান্ধবী ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী

বিভিন্ন কারণে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণও মেলে গবেষণায়। ২০২৪ সালে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মতিয়া আহমেদ ও সিটি ইউনিভার্সিটির প্রভাষক শাহ জাফর সাদিক কাদেরীর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশই ডিপ্রেশনে (বিষণ্ণতা) আক্রান্ত। এ ছাড়া অ্যাংজাইটিতে (উদ্বেগ) ৭২ শতাংশ এবং স্ট্রেসে (মানসিক চাপ) আক্রান্ত ৫৩ শতাংশ। এর মধ্যে ছাত্রীদের হার ছাত্রদের তুলনায় কিছুটা বেশি।

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
অর্পিতা নওশিনের মৃত্যুর সংবাদ শেয়ার করে সাইক কলেজ অব মেডিকেল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সাবেক শিক্ষার্থী ওমর ফারুক ফেসবুকে লিখেন, ‘স্রেফ ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া আমাদের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। আমি নিজে একজন ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থী হিসেবে এই অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় স্রেফ ‘অ্যাটিটিউড’ পছন্দ না হওয়ার দোহাই দিয়ে আমাকে ৪টি সাবজেক্টে ফেল করিয়ে দেওয়া হয়েছিল— এমনকি একটি বিষয়ে লিখিত পরীক্ষায় ১০০-তে ৭৪ নম্বর পাওয়ার পরেও কেবল ভাইভাতে আমাকে অকৃতকার্য করা হয়। সেই সময় আমি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম...।’

tdc (32)
অর্পিতা নওশিন

তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার প্রায় ৫৮.৬ শতাংশ এবং সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষকদের মাধ্যমে হওয়া হয়রানির ৭৮% ক্ষেত্রেই ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি’ করার প্রবণতা থাকে এবং ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও বুলিংয়ের হার প্রায় ৯৮.৬% পর্যন্ত দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে যে এটি কেবল মেডিকেলের সমস্যা নয় বরং পুরো স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতেরই এক গভীর ক্ষত। এই বিষাক্ত সংস্কৃতি এবং শিক্ষকদের একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি...।’

আরও পড়ুন: শিক্ষকের রোষানলে এক বিষয়ে ৫ বার ফেল, অভিমানে জীবনটাই দিয়ে দিলেন নওশিন

অর্পিতা নওশিনের স্কুলজীবনের বান্ধবী ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সানজিদা সারহান লিখেন, ‘মেডিকেলের ম্যাক্সিমাম টিচার এত নির্দয় যে সেটা ভাবা যায় না। এই পরিবেশে উনাদের কাছে নিজেকে খুব worthless মনে হয়। এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। আর এজন্য উনাদের বিহেভিয়ারে কোনো চেঞ্জ  আসে না। মেডিকেলের মত এত টক্সিক আর জঘন্য পরিবেশ আমি জানি না কোথাও আছে কি—না।’

শাসন করতে গিয়ে ‘মিসহ্যান্ডলিং’ করেন শিক্ষকরা
স্বাস্থ্য শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষের মতই মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের মধ্যেও কিছু শিক্ষক রয়েছেন, যারা অন্যকে ‘পীড়ন’ করতে চান। এ ছাড়া অনেক শিক্ষকও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ভাল করছেন ভেবে শাসন করতে গিয়ে ‘মিসহ্যান্ডলিং’ করেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ডা. বিজয় কুমার পাল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা এখনো ট্রেডিশনাল টিচিংয়ে অভ্যস্ত। তবে অনেক শিক্ষক আছেন, যারা অনেক স্টুডেন্ট ফ্রেন্ডলি, স্টুডেন্ট সেন্টার্ড, তাদের লার্নিংয়ে স্টুডেন্টকে এমফেসিস দেওয়া হয়, স্টুডেন্টের অপিনিয়ন শোনেন। আবার কিছু কিছু শিক্ষক পাবেন যাদের ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। হয়ত অনেক বেশি উপদেশমূলক পদ্ধতিতে টিচিং করাচ্ছেন, সেখানে ডমিনেন্সি থাকছে, যা টিচার-স্টুডেন্ট রিলেশনশিপকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটা আন্ডারগ্র্যাড লেভেলে একটু বেশি হয়, ওদেরকে একটু কন্ট্রোলে রাখার জন্য। কারণ ওরা মাত্র ১৮ বছর পার করে আসে। পোস্টগ্র্যাজুয়েশনে সবাই রেসপন্সিবল, কিন্তু আন্ডারগ্র্যাডের শিক্ষার্থীরা তো অনেকেই রেসপন্সিবল থাকে না। তখন কিছুটা ডমিনেন্সি দেখাতে চান শিক্ষকদের কেউ কেউ।

tdc (29)
ঢামেকের সাবেক ছাত্র সজীব দত্ত

এ ছাড়া সামগ্রিকভাবেই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটেছে বলে মনে করেন এই চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞ। সাম্প্রতিক ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক পরিস্থিতিকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এমন পরিস্থিতি এড়াতে শিক্ষা প্রশাসনের কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে বলেও মনে করেন ডা. বিজয় কুমার পাল। তিনি বলেন, দেশে আমরা অনেকগুলো জিনিস প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, যেমন ‘টিচার ইভালুয়েশন ফর্ম’। বিশ্বের সব জায়গায় শিক্ষককে মূল্যায়নের একটা পদ্ধতি থাকে। আমরা বেস্ট টিচারকে রিওয়ার্ডের ব্যবস্থাও করি না। ধরতে গেলে সবকিছু রাজনৈতিক বিবেচনায় দেখা হয়। আমরা যদি এগুলো ডেভেলপ করতে পারি, তাহলে টিচারের যদি কোন ঘাটতি থাকে, তখন তাকে প্রোপার ট্রেনিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসা যায়। আবার কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেও পরিবর্তন করা যায়।

‘পরীক্ষা পদ্ধতি’ অনুসরণ নিয়েও প্রশ্ন
সেন্ট্রাল মেডিকেলের ছাত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় একটি বিষয়ে পাঁচবার অংশগ্রহণ করেও উত্তীর্ণ না হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে বলে তার সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে খুব সহজেই একজন শিক্ষার্থীকে অকৃতকার্য করা কিংবা তার প্রতি অসম আচরণ করা শিক্ষকের পক্ষে কঠিন। কারণ পূর্বে পরীক্ষা পদ্ধতি ‘সাবজেক্টিভ’ থাকলেও সেটা এখন ‘অবজেক্টিভ’ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: ‘ভুয়া ডাক্তার তৈরির কারখানা’ বন্ধের হুঁশিয়ারি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর

বর্তমানে এমবিবিএসের পেশাগত (প্রফেশনাল) পরীক্ষায় একাধিক প্রক্রিয়া রয়েছে। এর মধ্যে মৌখিক পরীক্ষায় অবজেক্টিভ স্ট্রাকচারড প্র্যাকটিক্যাল ইভ্যালুয়েশন (অস্পি) ও স্ট্রাকচারড ওরাল এক্সামিনেশন (এসওই) বা টেবিল ভাইভা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এসওই-র ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী তার পছন্দমত কার্ড তুলে নিয়ে নির্ধারিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন। মূলত লিখিত পরীক্ষায় কোনো শিক্ষক একা পরীক্ষা গ্রহণ করেন না, আবার অস্পিতে একটি টিম গঠন করা হয়, আর এসওইতে থাকেন দুজন শিক্ষক। এসব পদ্ধতির ফলে কোনো শিক্ষকের পক্ষ থেকে ইচ্ছামত প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। ফলে চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ডা. বিজয় কুমার পাল বলছেন, অর্পিতা নওশিনের অকৃতকার্য হওয়ার গুরুতর অভিযোগের আরও কিছু দিক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কিছু কিছু শিক্ষক পাবেন যাদের ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। হয়ত অনেক বেশি উপদেশমূলক পদ্ধতিতে টিচিং করাচ্ছেন, সেখানে ডমিনেন্সি থাকছে, যা টিচার-স্টুডেন্ট রিলেশনশিপকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটা আন্ডারগ্র্যাড লেভেলে একটু বেশি হয়, ওদেরকে একটু কন্ট্রোলে রাখার জন্য। কারণ ওরা মাত্র ১৮ বছর পার করে আসে। পোস্টগ্র্যাজুয়েশনে সবাই রেসপন্সিবল, কিন্তু আন্ডারগ্র্যাডের শিক্ষার্থীরা তো অনেকেই রেসপন্সিবল থাকে না। তখন কিছুটা ডমিনেন্সি দেখাতে চান শিক্ষকদের কেউ কেউ— ডা. বিজয় কুমার পাল, চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)

তিনি বলেন, মেডিকেলের বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি আগের তুলনায় উন্নত। এই পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ইচ্ছে করলেই কাউকে ফেইল করা যায় না। এর ফলে প্রতিবারই একজন শিক্ষার্থী ফেইল করছেন, সেটা যেমন খারাপ, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা যায় না। তবে এখানে একটা জিনিস ভাবতে হবে, সেটা হচ্ছে অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম (মূল্যায়ন পদ্ধতি) যেটা আছে, সেই অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেমটা আসলেই ফলো করা হচ্ছে কি—না।

প্রতিকারের উপায় আছে, জানেন না শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষায় ফেইল করানোর পাশাপাশি এমন হুমকি-ধামকির কারণে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় তাদের মনে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসবের কোনো প্রতিকারও মেলে না। তবে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা এবং অসম আচরণ বা এ ধরনের বিভিন্ন অভিযোগ-অনুযোগের প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. গোলাম মাসুদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা আছে শিক্ষার্থীদের মানসিক সাপোর্ট দেওয়ার জন্য সাইকিয়াট্রির শিক্ষকদের নিয়ে একটা কমিটি গঠনের। এটি সব মেডিকেলেই থাকার কথা। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মানসিক রোগ যে হবে তাও না, যেকোনো ঘটনাই ঘটতে পারে। এসব ক্ষেত্রে বুস্টআপের জন্য একটা মেন্টাল সাপোর্ট গ্রুপ থাকে সব জায়গায়। আমাদেরও কমিটি আছে, আমরা মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েদের সাইকিয়াট্রিস্টের অপিনিয়ন নিতে বলি।

তবে ঢাকার চারটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও একটি ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারটিতেই এ ধরনের কোনো কেন্দ্র মেডিকেলে থাকার বিষয়টি তারা জানেন না। বিশেষ করে ঢাকা ও মুগদা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, এমন কোনো কেন্দ্র তাদের মেডিকেলে নেই। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, একটি সেন্টার আগে থাকলেও এখন সচল নেই। আর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা জানেন যে সেখানে একটি মানসিক সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে।

662358262_1490604356043981_8886791295271239381_n
খুলনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং সেন্টার’

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নূর আহমেদ গিয়াসউদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কারণে কিছুটা মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। পড়ালেখা, ফিনান্সিয়াল সাপোর্টের অভাব, এই অভাবের কারণে অতিরিক্ত পরিশ্রম, পার্সোনাল লাইফের রিলেশনশিপ ইস্যু এবং যেহেতু মেডিকেল বা ডেন্টালের বিষয়গুলো অন্যান্য বিষয় থেকে অপেক্ষাকৃত কঠিন, এসবের ফলশ্রুতিতে তাদের মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টির যে বিষয়টা, শিক্ষকদের মধ্যে সবার আচরণ যে সমানভাবে ভালো সেরকম হয়তো বলা নাও যেতে পারে। অনেকের আচরণে সমস্যা থাকতে পারে। তবে আমার মনে হয় এক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিকারের পথটাও খোলা রাখতে হবে। যেকোন ভাবে যদি তারা অসম আচরণের শিকার হয়, সেক্ষেত্রে তারা যদি সমস্যাবোধ করে— তারা বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকদের নজরে আনতে পারে। এর বাইরেও অনেক মেডিকেল কলেজেই এখন তাদের মানসিক এবং শারীরিক বিভিন্ন চাপ মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন কমিটি তৈরি করা আছে। প্রয়োজনবোধে তারা তাদের যদি কোন অসম আচরণ করা হয়ে থাকে এর জন্য এই কমিটিগুলোর কাছেও যেতে পারে। অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে।

আরও পড়ুন: ঢাবি অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলো নিজেদের অধীনে আনতে চায় বিএমইউ

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নূর আহমেদ গিয়াসউদ্দিন বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে হাইকোর্টের একটা রুল ছিল যে তাদের মানসিক সহায়তার জন্য কমিটি গঠন করতে হবে। এরকম কমিটি আমাদের ঢাকা মেডিকেলেও আছে এবং বাইরের অধিকাংশ মেডিকেল কলেজে আছে। এখানে গ্যাপটা হতে পারে যে হয়ত স্টুডেন্টরা এটা জানে না। এর বাইরেও ট্রেডিশনালি তারা তাদের যে কোনো মানসিক চাপের ব্যাপারে মানসিক রোগ বিভাগে আসতেই পারে। তা ছাড়া এই বিষয়ে তাদের সচেতনতা যাতে বৃদ্ধি পায় সেটা নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে।

শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ে নেই ‘ছাত্র-শিক্ষক আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়ন’
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য শিক্ষার পাঠ্যসূচি প্রণয়ন এবং পেশাজীবী স্বাস্থ্য শিক্ষক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করে সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন (সিএমই)। প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনস্ত। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিএমইর প্রশিক্ষণে ছাত্র-শিক্ষক আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়ন বিষয়ক কোনো আলোচনা নেই। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কীভাবে ‘ডিল’ করবেন, সেটিও প্রশিক্ষণে থাকে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশনের (সিএমই) পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. মাজহারুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন এটি ডিল করে না। এটা স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিল করার কথা। সিএমই বিশেষ করে এডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং দেয়। তবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষকদের মানসিক উন্নতির জন্য কিছু ট্রেনিং দেওয়ার কথা ভাবছে। অধিদপ্তর যদি মনে করে তাহলে সিএমই এমন ট্রেনিং দিতে পারে।

tdc (31)
মেডিকেলের কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন (সিএমই)

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অর্পিতা নওশিনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় আমরা খুব দ্রুতই তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটি কাজ করছে। আশা করি সময়ের মধ্যেই আমরা প্রতিবেদন পাব। এই ঘটনার পর কিছু বিষয়ে আমরা নতুন করে চিন্তা করছি। যেমন শিক্ষার্থীদের এই ধরনের প্রবণতাগুলো যেন সঠিকভাবে এড্রেস করা যায়, সেটার জন্য আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। প্রথমত ‘স্টুডেন্ট সাপোর্ট সেন্টার’ নামে একটা সেন্টারের পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে, মন্ত্রণালয় পাঠিয়ে অনুমোদন পেলে আমরা তখন সিদ্ধান্ত দিয়ে দিব।

মেডিকেলের বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি আগের তুলনায় উন্নত। এই পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ইচ্ছে করলেই কাউকে ফেইল করা যায় না। এর ফলে প্রতিবারই একজন শিক্ষার্থী ফেইল করছেন, সেটা যেমন খারাপ, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা যায় না। তবে এখানে একটা জিনিস ভাবতে হবে, সেটা হচ্ছে অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম (মূল্যায়ন পদ্ধতি) যেটা আছে, সেই অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেমটা আসলেই ফলো করা হচ্ছে কি না— ডা. বিজয় কুমার পাল, চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)

তিনি বলেন, এই বছর থেকে শিক্ষার্থীরা ফার্স্ট ইয়ারে যখন ক্লাস শুরু করবে, প্রথম দুই-এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের জন্য একটা স্পেশাল ক্লাস অর্গানাইজ করব, যেখানে এই সমস্ত বিষয়গুলো এবং এগুলো ঘটলে কি করতে হবে বা কী করলে এই ধরনের পরিস্থিতি এভয়েড করা যায় এবং কীভাবে রিপোর্ট করতে হবে— এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি।

মেডিকেল শিক্ষার সর্বো স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, অনেক সময় আমরা মনে করি যে আমি ওর ভালোর জন্য ওকে একটু কষ্ট দেই, বা একটু পীড়া দিলে ও পড়াশোনা করতে আগ্রহী হবে; এটা অনেক সময় কাজ করে, কিন্তু করতে গিয়ে কখন আমরা সীমা অতিক্রম করে ফেলি সেটা হয়ত অনেক সময় খেয়াল করা যায় না। এই কারণে শিক্ষকদের মধ্যে এই বিষয়ে একটা সচেতনতা তৈরি এবং তাদের কাউন্সেলিংয়ের জন্য আমরা একটা উদ্যোগ নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কর্মকৌশল ঠিক করতে এই এক সপ্তাহের মধ্যেই কর্মশালার আয়োজন করব। এসব কাজ হলে আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোতে এই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি যে কোন ধরনের অন্যায় আচরণ, এটা আমরা আরো অনেক ইনশল্লাহ কমিয়ে ফেলতে পারব।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা এনস…
  • ০৮ এপ্রিল ২০২৬
যুক্তরাজ্যের বিসিআইয়ের সদস্য পদ পেল বাংলাদেশ ব্যাংক
  • ০৮ এপ্রিল ২০২৬
ছাত্রীদের ফুটবল খেলার ভিডিও ধারণ নিয়ে বিএনপি নেতার ছেলের তু…
  • ০৮ এপ্রিল ২০২৬
কোনদিন অনলাইন ক্লাস, কোনদিন অফলাইন—পরিকল্পনা জানালেন শিক্ষা…
  • ০৮ এপ্রিল ২০২৬
শিক্ষকদের বৈশাখী ভাতার ১৮১ কোটি টাকা ছাড়, পাবেন যেদিন
  • ০৮ এপ্রিল ২০২৬
বিসিবি নির্বাচন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনকে জবাব দ…
  • ০৮ এপ্রিল ২০২৬
close