ফেসবুক গ্রুপ এবং পোস্টের স্ক্রিনশট © সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জয়জয়কার। অনেকেই এই সামাজিক মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছেন জীবনসঙ্গী, কেউবা হয়েছেন প্রতারণার শিকার। আবার বিভিন্ন অপরাধেরও অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে এটি। এসব অপরাধে যুক্ত হইয়েছে বিভিন্ন দেশের অনেক চক্র। সাইবার দুর্বৃত্তদের বড় একটি প্রতারণার ফাঁদ ফেসবুকে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও ঘনিষ্ঠ এবং পরিচিতজনের ছদ্মবেশে ফেসবুককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অনলাইন অপরাধচক্র। যেখানে শিশু ও কিশোরীদের ছবি ব্যবহার করে সংগঠিতভাবে যৌন নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।
এই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহে। হয়ত আজ রাতেও বাংলাদেশের কোথাও কোনো এক কিশোরীর ছবি একটি ফেসবুক গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার সদস্য সংখ্যা ৭৮ হাজার ২৯৮। ছবিটি কোনো পাবলিক পোস্ট থেকে সংগ্রহ করে আপলোড করা হয়েছে। মেয়েটি হয়ত জানেই না যে, কোনো বিয়েবাড়ি, স্কুল অনুষ্ঠান বা পারিবারিক মধ্যাহ্নভোজে তোলা তার সাধারণ একটি ছবি এখন হাজারো মানুষের কামনার বিষয়বস্তু। সেখানে সদস্যরা আলোচনা করছে, মেয়েটি যৌন শোষণের উপযোগী বয়সে পৌঁছেছে কি না, এমনকি তাকে কক্সবাজারের কোনো হোটেলে নেওয়া যায় কি না এমন প্রশ্নও উঠছে। বিশ্বের বৃহত্তম সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন লক্ষ্যবস্তু বানানোর এই ভয়াবহ কর্মকাণ্ড কোনো কাল্পনিক গল্প নয়; এটি বাংলাদেশে বর্তমানে চলমান এক বীভৎস বাস্তবতা।
‘M দিয়ে শুরু হয়’ এমন একটি পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটেও অজ্ঞান নারীদের ভিডিও শেয়ার করার একটি বড় ‘সাব-কালচার’ তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রায় ২০ হাজারের বেশি ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো ৫০ হাজারেরও বেশিবার দেখা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাইটটিতে ৬ কোটি ২০ লাখেরও বেশি বার ভিজিট করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এমন আরও কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে। যার মধ্যে একটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৬৯ হাজার ৬৩৭, অন্য আরেকটিতে ২৪ হাজার ৭৮৯। এছাড়াও ফেসবুকে এমন অসংখ্য গ্রুপ রয়েছে যার সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে শুরু করে লক্ষাধিক। এসব গ্রুপে ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ‘কচি’ কোড নামে অভিহিত করা হয়। এগুলো গোপন নয়; উন্মুক্ত, সার্চযোগ্য এবং যে কেউ সহজেই এতে প্রবেশ করতে পারে। এই গ্রুপগুলোর অনেকগুলোতে কভার ফটোতে দেওয়া থাকে স্কুল ইউনিফর্ম পরা মেয়েদের ছবি। এমনকি এআই ব্যবহার করে শিশুদের আপত্তিকর ছবি তৈরি করে সেখানে শেয়ার করা হয়। গ্রুপগুলোর কাজ মূলত সদস্যদের ইনবক্স বা বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড ম্যাসেজিং অ্যাপে নিয়ে যাওয়া, যেখানে শিশুদের ওপর আরও ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের তথ্য ও ভিডিও আদান-প্রদান করা হয়।
এই ধরনের একটি গ্রুপে পোস্ট করা একটি শিশুর ‘ডিপফেক’ ছবিতেই ৭৬টির বেশি শোষণমূলক মন্তব্য জমা পড়েছিল। এসব গ্রুপের বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে সদস্যদের নিয়মিত ব্যক্তিগত ইনবক্স এবং এনক্রিপ্টেড ম্যাসেজিং প্ল্যাটফর্মের (যেমন— টেলিগ্রাম) দিকে চালিত করা হয়। এটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, যার মাধ্যমে অতি ভয়ংকর কন্টেন্টগুলোকে প্রকাশ্য প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে এমন গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কিছু গ্রুপ ইতিমধ্যে ডিলিট করা হলেও, প্রতিদিন সেগুলোর জায়গায় আরও ডজন ডজন নতুন গ্রুপ তৈরি হচ্ছে।
%20-%202026-04-23T215348-751.jpg)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বিচ্ছিন্ন অপরাধীদের কোনো সমষ্টি নয়; বরং একটি সংগঠিত সামাজিক পরিবেশ, যেখানে বিকৃত যৌন কল্পনা, অপরাধপ্রবণতা, পারস্পরিক উৎসাহ, প্রতিশোধের মানসিকতা এবং গভীর হতাশা একত্রিত হয়ে আরও ভয়াবহ ও বিপজ্জনক একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে।
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ১৭৫টি ধর্ষণ এবং ১৪১টি শিশু নির্যাতনের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক লোকলজ্জা ও পারিবারিক চাপের কারণে প্রকৃত ঘটনার বড় একটি অংশই আড়ালে থেকে যায়। ফলে নথিবদ্ধ এই সংখ্যাটি মূল সমস্যার সামান্য অংশ মাত্র। ২০২৫ সালের মার্চে ইউনিসেফ এ ধরনের ঘটনার বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
২০২৬ সালের ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে একটি ‘রেপ একাডেমি’ বা অনলাইন নেটওয়ার্কের কথা উঠে আসে। এতে দেখা যায়, পুরুষরা তাদের স্ত্রী বা সঙ্গীদের অজ্ঞান করে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে এবং অন্যদের একই কাজ শেখায়। ২০২৪ সালে ফ্রান্সে ডমিনিক পেলিকট’র বিচারের মাধ্যমে এক ভয়াবহ অপরাধ জগত বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়। প্রায় এক দশক ধরে নিজের স্ত্রীকে মাদক খাইয়ে অজ্ঞান করে ধর্ষণ করা এবং অনলাইনে অন্যদের সেই পৈশাচিকতায় আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনা স্তম্ভিত করেছিল বিশ্বকে। যদিও সেই সময় তার ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আধুনিক ইন্টারনেটের অন্ধকার অলিগলিতে সেই বিকৃত মানসিকতার ‘কমিউনিটি’ এখনো সক্রিয় রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশেও ঠিক একই ধরণের একটি অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, যার মূল লক্ষ্যবস্তু কোমলমতি শিশুরা। পার্থক্য শুধু এই যে, বাংলাদেশে এটি প্রকাশ্য দিবালোকে চললেও এখন পর্যন্ত এসব গ্রুপের কোনো অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বা পরিচালকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির মেলেনি।
আরেক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘M দিয়ে শুরু হয়’ এমন একটি পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটে অজ্ঞান নারীদের ভিডিও শেয়ার করার একটি বড় ‘সাব-কালচার’ তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রায় ২০ হাজারের বেশি ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো ৫০ হাজারেরও বেশিবার দেখা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাইটটিতে ৬ কোটি ২০ লাখেরও বেশি বার ভিজিট করা হয়েছে। যদিও এই সংখ্যাটি মোট পেজ ভিজিট বা ক্লিকের সংখ্যা নির্দেশ করে, একক সক্রিয় ব্যবহারকারী নয়; তবুও এটি সমস্যার ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
%20-%202026-04-23T203729-733.jpg)
অপরাধের এই শিকড় আরও গভীরে বিস্তৃত হয়েছে ম্যাসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে। ‘Zzz’ নামের একটি গোপন গ্রুপে প্রায় এক হাজার সক্রিয় সদস্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে কেবল ভিডিও শেয়ারিং নয়, বরং অপরাধ করার সরাসরি প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম বিক্রি করা হত। প্রতি বোতল অজ্ঞান করার ওষুধ ১৭৫ ডলারে বিক্রি এবং মাত্র ২০ ডলারের বিনিময়ে ‘লাইভ ধর্ষণ’ সম্প্রচারের মত নৃশংস কর্মকাণ্ড সেখানে পরিচালিত হত। এই চক্রের সাথে জড়িত থাকার দায়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে পোল্যান্ড থেকে পিওতর নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফরাসি আইনপ্রণেতা সান্দ্রিন জোসো এই ধরণের প্ল্যাটফর্মগুলোকে ‘সহিংসতার স্কুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আতঙ্কের বিষয় হল, অপরাধের এই বৈশ্বিক কাঠামো বাংলাদেশে আলাদাভাবে আমদানি করতে হয়নি। দেশেই নিজস্ব প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে অনুরূপ শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। তবে বিদেশের তুলনায় এখানকার চিত্র আরও ভয়াবহ, কারণ দেশীয় এই গ্রুপগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তু কোমলমতি শিশুরা।
আরও পড়ুন: চাঁদা না পেয়ে রাজশাহীতে কলেজ শিক্ষিকাকে বেধড়ক মারধর বিএনপি নেতার
‘চাহিদা ও যোগানের চক্র’কে এসব গ্রুপের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং ব্যাপক শেয়ারিংয়ের কারণে এসব কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে অপরাধ হিসেবে নয়, বরং সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো সমাজে একবার এমন অপরাধ ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গেড়ে বসলে তা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন। অপরাধী মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যখন তারা অন্যদের মধ্যে নিজেদের মত চারিত্রিক মিল খুঁজে পায়, তখন তারা আরও বড় পরিসরে নিজেদের বিকৃতি প্রকাশ করতে সাহস পায়। এভাবেই এই কমিউনিটি বড় হতে থাকে।’
এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছেন রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বলেন, কিছু সদস্য প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এমনটা করে; অনেকে আবার অনলাইনে সস্তা জনপ্রিয়তা বা ভিউ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আবার অনেকের মধ্যে এই ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানটুকুও নেই, এসব বিষয়বস্তু শেয়ার করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
তিনি দেশে সমন্বিত অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য এবং নজরদারি কাঠামোর চরম অভাবকেও দায়ী করেছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা ব্যবহার করে অপরাধের হটস্পট চিহ্নিত করে অভিযান চালানো হলেও বাংলাদেশে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে রাষ্ট্র মূলত কেবল হেডলাইন হওয়া বা আলোচিত ঘটনার পেছনে ছুটছে, আর নেপথ্যে অপরাধ বিস্তারের এই বিশাল কাঠামোটি নির্বিঘ্নে বড় হয়ে চলেছে বলে জানান এই সহকারী অধ্যাপক।
অন্যদিকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, যারা এসব কন্টেন্ট দেখে, শেয়ার করে বা প্রতিবাদ করে না তাদের সবার নীরব সমর্থনেই অপরাধচক্রকে শক্তিশালী হচ্ছে।
%20-%202026-04-23T203724-901.jpg)
তিনি বলেন, এসব নেটওয়ার্ক কেবল শোষণমূলক কন্টেন্ট তৈরি করা ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না; বরং যারা এসব কন্টেন্ট দেখছে, শেয়ার করছে এবং রিপোর্ট করছে না তাদের প্রত্যেকের অংশগ্রহণই এই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে। প্রতিটি নীরব বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ এ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে এবং প্রসারিত হতে সহায়তা করে।
ড. তানিয়া হক বলেন, ‘এটি উৎপাদন, প্রচলন এবং ভোগ এই তিনটির একটি স্ব-চালিত চক্র তৈরি করে, যা সমন্বিত ও সক্রিয় হস্তক্ষেপ ছাড়া দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে।’
এদিকে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ ৩০৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ১৭৫টি ধর্ষণ এবং ১৪১টি শিশু নির্যাতনের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক লোকলজ্জা ও পারিবারিক চাপের কারণে প্রকৃত ঘটনার বড় একটি অংশই আড়ালে থেকে যায়। ফলে নথিবদ্ধ এই সংখ্যাটি মূল সমস্যার সামান্য অংশ মাত্র। ২০২৫ সালের মার্চে ইউনিসেফ এ ধরনের ঘটনার বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
গত মার্চে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টার পর তার গলা কেটে হত্যা করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটি সাহায্য পাওয়ার আশায় হাঁটতে পারলেও পরদিন হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এই বীভৎসতাই বলে দেয় আমাদের শিশুরা কতটা অনিরাপদ অবস্থায় আছে।
এ বিষয়ে আইনজীবী ফারান মো. আরাফ বলেন, ‘শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ দণ্ডনীয় হলেও সাইবারস্পেসে অনেক ক্ষেত্রেই তা আইনের আওতার বাইরে থাকে। ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে পোশাক পরিহিত শিশুর ছবি অন্তর্ভুক্ত নয়।’
আরও পড়ুন: ১০ বছর পর তনু হত্যার প্রথম আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার
বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ ইউনিট সিআইডির সাইবার ক্রাইম অ্যানালিস্ট মঞ্জুর শরীফ বলেন, মেটা (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) বা অন্যান্য বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সাথে বাংলাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক না থাকায় তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া বা কন্টেন্ট ডিলিট করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স ২০২৫ কার্যকর হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা কয়েক রকম সাইবার অপরাধ দেখে থাকি। তার মধ্যে অনেক সময় দেখা যায় তরুণ-তরুণী দুইজন প্রেম করেছে, তাদের মধ্যে হয়তো কিছু নগ্ন ছবি আদান প্রদান হয়েছে; এক পর্যায়ে তাদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে, তখন এই ছবি ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেইল করে।
%20-%202026-04-23T203718-773.jpg)
তিনি বলেন, এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু গ্রুপ আছে যারা শিশু থেকে শুরু করে তরুণীদের কোনো অনুষ্ঠানের ছবি অথবা কোনো ফেসবুক একাউন্টের ছবি নিয়ে সেইটা এআই দিয়ে ফেইক অশ্লীল ছবি তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এমন চক্রের কয়েকটি সদস্যকে আমরা ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছি। অনেক সময় আমাদের ফেসবুক মনিটরিং করার সুযোগ থাকে না। তাই সাইবার অপরাধগুলো দমন করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই ধরনের অপরাধের প্রমাণ পেলে অবশ্যই আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব গ্রুপ পরিচালনাকারী ব্যক্তিরা প্রকাশ্যেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, কারণ তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষমতা যেসব প্রতিষ্ঠানের আছে, তারা সেই ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করছে না। কিন্তু এই বাস্তবতা স্থির নয় এটি বদলানো সম্ভব, এবং বদলাতেই হবে।
কারণ এই লেখা পড়ার সময়েও সেই গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় রয়েছে। এডমিনরা এখনও কন্টেন্ট পোস্ট করছে। আজ রাতেই বাংলাদেশের কোথাও কোনো শিশুর ছবি— যা হয়ত কোনো বিয়ে, স্কুলের ক্রীড়া অনুষ্ঠান বা পারিবারিক আয়োজনে তোলা হাজার হাজার মানুষের কাছে তার ‘উপলভ্যতা’ যাচাইয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সে কিছুই জানে না, সে কোনো সম্মতিও দেয়নি। অথচ সে অজান্তেই অপেক্ষা করছে তার দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কবে সিদ্ধান্ত নেবে যে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার মত মূল্যবান মনে করা হচ্ছে। জবাবদিহিতা শুরু হলে লজ্জার ভার পাল্টে যায়। বাংলাদেশ আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এদিকে প্রতিদিন এসব গ্রুপে নতুন কন্টেন্ট যুক্ত হচ্ছে এবং হাজারো মানুষ এতে সক্রিয়। তবুও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্র কি সময়মত পদক্ষেপ নেবে, নাকি আরও অনেক শিশু নীরবে এই শোষণের শিকার হবে।
উল্লেখ্য, এই লেখাটি সব পুরুষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের খেরোখাতা নয়। এটি সেসব প্রতিষ্ঠান, আইন প্রণয়নকারী সংস্থা, বিচারিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানের কাছে উত্থাপিত দাবি— যাদের কাছে প্রমাণ, বিশেষজ্ঞ মতামত, অপরাধের পরিসংখ্যান, ইউনিসেফের বিবৃতি এবং রাজনৈতিক সুযোগ সবই ছিল; তবুও তারা এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি।