ঢাকার ধামরাইয়ের ধর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়া সেই বাড়ীটি © সংগৃহীত
ঢাকার ধামরাইয়ে পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে বেড়াতে এসে এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন—এমন একটি ঘটনার খবরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের শিরোনামের বলা হয়, ‘স্বামীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ’। তবে সরেজমিন এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তাদের যে বক্তব্য ভাইরাল হওয়া খবরে যুক্ত করা হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে এসব বক্তব্যে গড়মিল দেখা গেছে। পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী নারী থানায় কোনো অভিযোগও করেননি।
এদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ জানুয়ারি ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকায় শান্তি মনি দাসের বাড়িতে ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি ১৯ জানুয়ারি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েকজন যুবক বাড়িটিতে হানা দিয়ে তাদের লাঞ্ছিত করেছেন। ধর্ষণের কোনও ঘটনা ঘটেনি বলে ভুক্তভোগী নিজেই জানিয়েছেন। তবে তাদের সঙ্গে থাকা মূল্যবান সামগ্রীসহ সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
রাত দেড়টার দিকে পাঁচজন এসে দরজা খুলতে বলে, দরজা খোলার পর আলো নিভিয়ে দিয়ে আমাদের মালামাল নিয়ে যায় এবং আমাকে মারধর করে। তবে আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ বা বেঁধে রাখার কোনো ঘটনা ঘটেনি—ভুক্তভোগী আব্দুর রাজ্জাক
সরজমিনে দেখা যায়, সাটুরিয়া-কাওয়ালীপাড়া সড়ক থেকে বাম দিকে কাঁচা রাস্তা ধরে প্রায় ২০০-৩০০ মিটার ভেতরে। সেখানে এক কক্ষের টিনের ঘরে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন শান্তি মনি দাস। বাড়ির পাশে রান্নাঘর, পেছনে টিউবওয়েল ও বাথরুম রয়েছে। ঘটনার দিন অতিথি আসায় তিনি ও তার মেয়ে ভাইয়ের বাড়িতে চলে যান। পরদিন তিনি ঘটনার কথা জানতে পারেন।
এছাড়াও প্রতিবেশীরা জানান, মধ্যরাতে ওই ঘরে মারধরের শব্দ পেয়ে পাশের বাড়ির গৃহবধূ শিল্পী মনি দাস সেখানে যান। তিনি বলেন, রাত একটার দিকে শব্দ শুনে গিয়ে কাউকে পাইনি, শুধু ওই নারী ও তার স্বামীকে ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তখন ওই নারী জানান, তার গহনা, টাকা ও মোবাইল ফোন নেওয়া হয়েছে। গাছে বেঁধে রাখা বা ধর্ষণের কোনো চিহ্ন তিনি দেখেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনা ৪–৫ মিনিটের মধ্যেই ঘটে।
যদিও ভুক্তভোগী দাবি করা ব্যক্তি জানান, ১৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে স্ত্রীর গহনা, টাকা ও মোবাইলফোন ছিনিয়ে নিয়ে গেছে পাঁচ অজ্ঞাত ব্যক্তি। খবর পেয়ে চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে যান প্রতিবেশী এক নারী এবং খবর পেয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছান পরিচিতরাও। তাদের কাছেও ভুক্তভোগীরা শুধু লুটপাটের কথাই বলেছেন। ধর্ষণ বা বেঁধে মারধরের বিবরণ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই সেখানে যান কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের চাচাতো ভাই বিকাশ চন্দ্র মনি দাস। তিনি বলেন, দেড়টার দিকে খবর পেয়ে গিয়ে দেখেন ওই নারী কান্নাকাটি করছেন। তখন তিনি জানান, প্রায় ১৭–১৮ হাজার টাকা, দুটি কানের দুল, একটি নাকফুল ও একটি চেইন নিয়ে গেছে চোরেরা। স্বামীকে মারধরের কথা বলা হলেও কাউকে গাছে বাঁধা বা অন্য কোনো আলামত তিনি দেখেননি।
বালিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মনি দাস বলেন, পরদিন সকালে তিনি লুটপাটের কথা শুনেছেন। তবে কেউ তার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেনি। তিনি বলেন আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে সেখানে ৪-৫ জন চাপাটি নিয়ে এসে তাদের স্বর্ণালংকার, টাকা, মোবাইল নিয়ে যায়, তবে কোন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি এবং ভুক্তভোগীরা এমন কিছু বলেননি।
এ বিষয়ে বন্ধু কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সন্ধ্যায় রাজ্জাক ও তার স্ত্রী রামরাবনে আসেন। নিজের বাড়িতে জায়গা না থাকায় বোনের বাড়িতে তাদের থাকতে দেন। রাত দেড়টার দিকে রাজ্জাক ফোন করে জানান, কয়েকজন এসে তাদের গহনা, টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে এবং তাকে মারধর করেছে। পরে বাসায় গিয়ে দেখি ভাবির চোখে পানি। কী হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার জিনিসপত্র নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, তাকে কোনো ভয় দেখানো হয়নি বা জোরজবরদস্তি করা হয়নি এবং তিনি শারীরিকভাবে ঠিক আছেন। শুধু তার জিনিসগুলো নিয়ে গেছে বলেই তিনি কান্নাকাটি করছিলেন। ধর্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নারী এমন কোনো ঘটনার কথা বলেননি বলে দাবি করেন তিনি।
তথ্যটি ভুলভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কীভাবে ছড়ানো হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই তথ্যটি ছড়িয়েছে শামিম নামের একজন স্থানীয় সাংবাদিক।’
এদিকে অনুসন্ধান টিম কথা বলে আব্দুর রাজ্জাকের সাথে তিনও একই কথা বলেন। তিনি জানান, রাত দেড়টার দিকে পাঁচজন এসে দরজা খুলতে বলে, আলো নিভিয়ে দিয়ে তাদের মালামাল নিয়ে যায় এবং তাকে মারধর করে। ধর্ষণ বা স্ত্রীকে বেঁধে রাখার কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন।
আরও পড়ুন: রিট খারিজ, নির্বাচন করতে পারবেন না মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী
পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্মস্থল থেকে পাওয়া তার ঠিকানার সূত্র ধরে মানিকগঞ্জের শিবালয়ের তেওতা এলাকার গ্রামের বাড়ির খোঁজ পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে রাজ্জাকের স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন তিনি ধামরাইয়ের রামরাবন গ্রামে যাননি।
এই বিষয়ে খোঁজ নিতে তার কর্মস্থল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডে (এনডিই) গিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত আব্দুর রাজ্জাক। এনডিই এর স্টোর ইনচার্জ অশীষ কুমার জানান, ওই ঘটনার পর থেকে অফিসে আসছেন না আব্দুর রাজ্জাক। তার ফোনও বন্ধ। সবশেষ পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি কাজে আসছেন না বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ধামরাই থানার ওসি মো. নাজমুল হুদা খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পালাক্রমে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে এখন পর্যন্ত ধর্ষণের কোনো প্রমাণ মেলেনি।
তিনি আরও বলেন, সংবাদমাধ্যমে উল্লেখিত এসআই হারাধন নামে কোনো কর্মকর্তা নেই। তবে ধামরাই থানার এসআই আরাধন চন্দ্র সাহা আছেন যিনি এ ঘটনায় কোনো বক্তব্য দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।’