ঈদ স্মৃতি: বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের গল্পে হারানো রেওয়াজ ফেরানোর স্বপ্ন ও বাস্তবতা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা © সংগৃহীত

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েই যেন বদলে যাচ্ছে ঈদের রং, রীতি আর অনুভূতি। একসময় যে ঈদ মানেই ছিলো গ্রামে ফেরার টান, চাঁদ দেখার হুড়োহুড়ি, সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অবধি জেগে থেকে সবাই মিলে হাতে মেহেদী দেওয়া, ভোরবেলায় আবার দ্রুত বিছানা ছাড়ার তড়িঘড়ি, সবার থেকে লুকিয়ে রাখা নতুন জামার গন্ধ, আতর কিংবা অন্য সুঘ্রাণ গায়ে মাখা, এরপর গ্রামীণ আঙিনায় বন্ধুদের সাথে কোলাকুলি, বন্ধুদের মাঝে ঈদ কার্ড বিলি, কড়কড়ে নতুন টাকার সালামী পাওয়া; এরপর সেই টাকার গন্ধ নেওয়া; বাড়িতে সেমাই-ফিরনি, পোলাও-কোরমার ঘ্রাণ পেয়ে খাবারের জন্য ছুটে যাওয়া; পুরো বাড়ি জুড়ে হৈচৈ, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনের ভিড়। কিন্তু কালের আবর্তে এসব কিছুই যেন প্রায় হারাতে বসেছে বর্তমান এই প্রজন্ম। 

আধুনিকতার ছোঁয়া, ব্যস্ততার ছাপ আর নগরজীবনের অভ্যস্ততা ও চাপে ঈদের অনেক পুরোনো রেওয়াজ আজ কেবল স্মৃতি। তবুও সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আধুনিক জনজীবনে অভ্যস্ত তরুণরা আজও স্বপ্ন দেখে প্রিয়জনদের সাথে একটি সুন্দর, আনন্দপূর্ণ ও সম্প্রীতির ঈদ উদযাপন করার। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও ঈদের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় সম্পর্ক, স্মৃতি, যত্ন এবং ভালোবাসায়; আর হারিয়ে যেতে বসা এই রেওয়াজগুলোকে পুনর্জীবিত করার দায়িত্বও কিন্তু এই প্রজন্মেরই- যা ঈদ আনন্দে পুনরায় যোগ করতে পারে অনন্য এক মাত্রা.... এমনটিই মনে করছেন দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)- এর ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী খায়রুন্নাহার মিথি বলেন, ‘দীর্ঘ এক মাস রমাদানের পর আসে ঈদ-উল-ফিতর যা ছোটবেলায় ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব। পুরো পরিবার একত্রিত হওয়া, নামাজ শেষে দাদা-দাদুর সঙ্গে বসে খাওয়া দাওয়া- সব মিলিয়ে ঈদ ছিল আনন্দের এক পরিপূর্ণ দিন। নতুন জামা লুকিয়ে রাখা, চাঁদ দেখার উচ্ছ্বাস, মেহেদি দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে সেমাই-পায়েশ খেতে খেতে সালামি সংগ্রহ- এসবই ছিল শৈশবের ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’

‘তবে বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই উচ্ছ্বাস কিছুটা সীমিত হয়ে এসেছে। প্রিয়জনদের অনুপস্থিতি, চাঁদ দেখার আগ্রহ কমে যাওয়া এবং অনেক কিছুই এখন অনলাইনে সীমাবদ্ধ। তবুও ঈদের আনন্দ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি- সকালে মা’কে সাহায্য করা, সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, প্রিয়জনদের ভিডিও কলে কাছে পাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো- এসব ছোট ছোট মুহূর্তেই এখন ধরা দেয় ঈদের আনন্দ।’

তিনি বলেন, ‘এখনো ক্যাম্পাসে ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতা হয়নি, তবে একবার ফাঁকা ক্যাম্পাসে ঈদ কেমন কাটে- তা দেখার ইচ্ছা রয়ে গেছে। আর পুরোনো রেওয়াজের শূণ্যতা ঘুচাতে আমরা নতুন করে আবার ওসবের চল (প্রচলন) শুরু করতে পারি -এটি নি:সন্দেহে ঈদে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে এবং একইসাথে উদযাপন হবে আনন্দের।’

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)-এর ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষার্থী আয়েশা ফারিহা বলেন, ‘ছোটবেলার ঈদ আসার আগেই ঈদকে কেন্দ্র করে কতো ভাবনা...! কেমন ডিজাইনের মেহেদী দিবো, কোথায় ঘুরতে যাবো, ঈদের দিন কোন জামাটা আগে পড়বো, কার কার বাসায় যাবো, সালাম দিলে সালামি পাবো আরো কতো কি...! ছোটবেলায় ঈদ কার্ডকে কেন্দ্র করেও ছিলো এক বিশেষ উম্মদনা, কার্ডের দোকান দেয়া, কে কেমন কার্ড পেলো, কয়টা পেলো তা নিয়ে রীতিমতন ট্রেনের গতিতে গল্প চলতো। এছাড়াও চাঁদ দেখা তো আছেই।’

‘বড় হবার পর ছোটবেলার সবই যেন এখন রূপকথার মত মনে হয়। এখন আগের মতন তেমন উচ্ছ্বস কাজ করে না, কয়টা জামা কিনবো, কোথায় ঘুরতে যাবো, মেহেদী দিবো কি না এসব নিয়েও আর চিন্তা হয় না বরং চিন্তা হয় ঈদের পরে ভার্সিটি খুললেই সিটি, মিড, টিউশন আবার যান্ত্রিক জীবন।’

আয়েশা বলেন, ‘তখনকার আর এখনকার সময়ের ঈদ উদযাপনে ভিন্নতা থাকলেও সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, তখনকার ঈদে বাবা নামের মানুষটা ছিলো আর এখন সে মানুষটা নেই। তাই হয়তো ঈদ নিয়ে তেমন একটা উচ্ছাস কাজ করে না আর। তবে আম্মুর হাতের সেই পায়েশ, নানান পদের রান্না, চাঁদ দেখা -এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই এখনও ঈদের অনুভূতিটুকু বাঁচিয়ে রাখে। সময় হয়তো বদলেছে কিন্তু আমেজ- আমাদের হাত ধরেই তো তার জন্ম হয়!’

আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে আজ উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর

শৈশবের ঈদ স্মৃতি উল্লেখ করে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি)- এর ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘ছোটবেলার ঈদ মানেই ছিল একরাশ উচ্ছ্বাস, অজানা এক আনন্দের ঢেউ। ঈদের চাঁদ দেখতেই যেন বুকের ভেতর ঢাক-ঢোল বাজতে শুরু করত। নতুন জামা, জুতা, সেমাইয়ের মিষ্টি সুবাস সব মিলিয়ে এক অন্যরকম জাদু। আগে ঈদের দিন খুব ভোরে মা ঘুম থেকে ওঠার আগেই তাকে ডাক দিয়ে উঠিয়ে দিতাম সকাল বেলা সবার আগে বন্ধুদের নিয়ে নতুন জামা পড়ে ঈদগাহ মাঠে চলে যেতাম।’

‘তবে সময়ের সাথে সাথে আজ যেন সব বদলে গেছে। এখন বছর ঘুরে ঈদ আসে কিন্তু ক্যালেন্ডারের তারিখ যেমন পালটে যায় তেমন ঠিক সেই আগের উত্তেজনাও আর কাজ করে না। সেই আগের মত এখন আর বাবার সাথে গিয়ে জামাকাপড় কেনা হয় না, কেননা এখন আমি বড় হয়ে গেছি। ঈদের দিন নামাজে যাই, কোলাকুলিও হয়, কিন্তু কোথায় যেন একটা শূণ্যতা থেকেই যায়। বারবার মন চায় যদি আবার সেই ছোটবেলায় ফিরে যেতে পারতাম তাহলে কতই না ভালো হত। ঈদের সেই পুরোনো আমেজ যেন আমাদের হাত ধরেই থমকে গেল, আধুনিকায়নের সমান্তরালে টেক্কা দিয়েই আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে আবার ঈদের সেই আমেজ, রেওয়াজগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)- এর ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মারশিপ হোসেনের ভাষ্যমতে, ‘ছোটবেলার ঈদ আর এখনকার ঈদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা হলো অনুভূতিতে। তখন ঈদ মানেই ছিল নিখাদ আনন্দ নতুন জামা লুকিয়ে রাখা, চাঁদ দেখা, সবাই মিলে মেহেদী দেওয়ার হিরিক, আর চাঁদ রাতে বাজি ফোটানোর উত্তেজনা। সকালে নতুন জামা পরে মিষ্টি মুখে নামাজে যাওয়া, তারপর বন্ধুদের সাথে  বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেমাই-পায়েশ খাওয়া আর সালামি নেওয়া, এর সবই ছিল ঈদের মূল আকর্ষণ। অন্যদিকে বর্তমানে ঈদ হয়ে গেছে বেশ সীমাবদ্ধ- মোবাইল, ব্যস্ততা আর ব্যক্তিগত পরিসরে। 
 
তিনি বলেন, ‘স্মৃতিচারণে ঈদে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে চাঁদ রাতের সময়টা। নানা-নানী, দাদা-দাদীর গল্প , আর বন্ধুদের সাথে শেষ মুহূর্তের আড্ডা। ছাত্রজীবনে এখনো ক্যাম্পাসে ঈদ কাটানোর সৌভাগ্য না হলেও দেখেছি  বন্ধুদের একসাথে নামাজ পড়তে, হলের আড্ডা, আর পরিবারের কথা মনে করতে। সত্যি বলতে, এখন রীতি-রেওয়াজ যেমন ঈদ কার্ড দেওয়া বা নতুন টাকার সালামি দেওয়ার  ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যা ঈদের ঐতিহ্যকে বেশ দুর্বল করে দিয়েছে বলে মনে হয়!’

আর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)- এর ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী  আনিষা আফনান মনে করেন, ‘ছোটবেলার ঈদ ছিল অনেক বেশি আনন্দময় ও প্রাণবন্ত। ঈদের সকালে আব্বুর সাথে ঈদগাহে যাওয়া, নামাজের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করে দুষ্টুমি করা, নামাজ শেষে বেলুন, খেলনা কিনে বাসায় আসা, ভাইবোনদের সাথে একসাথে সময় কাটানো-এসবই ছিল ছোটবেলার সুন্দর স্মৃতি। তখন ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল পরিবারের সবাই মিলে একসাথে ঈদ উদযাপন করা।’

অন্যদিকে এখনকার ঈদে আগের মতো সেই সরল আনন্দ ও একসাথে সময় কাটানোর সুযোগ কমে গেছে। বড় হওয়ার সাথে সাথে ব্যস্ততা ও দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় ঈদের অনুভূতিও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ক্যাম্পাসে ঈদ কাটানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই, কারণ সবসময় পরিবারের সাথেই ঈদ উদযাপন করা হয়েছে।'

উল্লেখ্য তরুণ শিক্ষার্থীরা মনে করেন-সময়ের স্রোতে ঈদের ঐতিহ্যে পুরোনো রেওয়াজ, আর প্রিয় মুখগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হলেও এসবের প্রতি আবেগ এখনো জীবন্ত। তাদের মতে- পরিবর্তিত সময়ে ভিন্ন রূপে হলেও সম্পর্ক, স্মৃতি আর ভালোবাসার মধ্যেই টিকে আছে ঈদের আসল সৌন্দর্য।

যে পাঁচ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হলো ট্রাম্পের
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
এইচএসসির ফলাফলে ধস, শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরাতে মাইকিং
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
দুই যুগেও মেলেনি এমপিও, ঋণের চাপে সর্বস্বান্ত হয়ে প্রাণ গেল…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের ছেলেকে ছুরিকাঘাত
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
হামের টিকা নিয়ে তদন্ত করছে সরকার
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জায়গা দখল করে ছাত্রদল নেতার অবৈধ দোকান, নিউজ করায় সাংবাদিকে…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950