নবনিযুক্ত উপাচার্য ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন © টিডিসি ফটো
প্রতিষ্ঠার দুই দশকে ৮ জন উপাচার্য পেয়েছে ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এবারই প্রথম কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উপাচার্য পেলো বিশ্ববিদ্যালয়টি। ফলে শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্রিক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
গত ১৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন। পরে শনিবার (১৬ মে) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর যোগদানের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এএইচএম কামাল বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন ধরনের ডিসিপ্লিন থাকে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা এবং ব্যবসায় প্রশাসন, সব অনুষদকে সমন্বয় করেই এগোতে হয়। তবে উপাচার্য হিসেবে বিজ্ঞানভিত্তিক একজন ব্যক্তিকে পাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক দিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও বিজ্ঞানের কিছু পিওর সাবজেক্টের ঘাটতি রয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ফার্মেসি বিভাগ চালুর প্রক্রিয়াও চলমান। নবনিযুক্ত উপাচার্যের যোগদানের পর আমরা আশা করছি, গবেষণা কার্যক্রম, ল্যাব সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোতে আরও গুরুত্বারোপ করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিজ্ঞান অনুষদ থেকে একজন উপাচার্য পাওয়াটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের বিষয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ অনেকটাই অবহেলিত ছিল। বিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি মৌলিক বিভাগ এখনও চালু হয়নি, পাশাপাশি এসব বিষয়ে অতীতে কার্যকর উদ্যোগও খুব একটা দেখা যায়নি। নবনিযুক্ত উপাচার্য আমাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় বিষয়গুলো নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। আমরা আশাবাদী, বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণায় অধিক গুরুত্বারোপ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের পাশাপাশি একাডেমিক অবস্থানও আরও শক্তিশালী হবে।
জানা যায়, নবনিযুক্ত উপাচার্য ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড ডিভিশন অব বায়োটেকনোলজি থেকে বায়োটেকনোলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষকতা জীবনে নিজ বিভাগেই ২০১৫ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নভেম্বরে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে যোগদান করেন।
গবেষক হিসেবেও তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্বনামধন্য জার্নালে তাঁর ৫৩টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০টি। গবেষণায় তাঁর সাইটেশন ১ হাজার ৮৫৩, এইচ-ইনডেক্স ১৮ এবং গবেষণা আগ্রহ স্কোর ১ হাজার ৫৪৫। উদ্ভিদবিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স ও ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স প্রদত্ত ‘ইয়াং সায়েন্টিস্ট গোল্ড মেডেল-২০১০’ অর্জন করেন। এছাড়া ভারতের দ্য অর্কিড সোসাইটি থেকে ‘ঊষা বিজ মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড-২০১৯’ লাভ করেন।
উল্লেখ্য, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম উপাচার্য ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম. শামসুর রহমান। তিনি ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২য় উপাচার্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সৈয়দ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে কর্মরত ছিলেন। ৩য় উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক খোন্দকার আশরাফ হোসেন মাত্র দেড় মাস দায়িত্ব পালন করে ইন্তেকাল করেন। এরপর ৪র্থ উপাচার্য ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক মোহীত উল আলম, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালে ৬ষ্ঠ উপাচার্যের দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে হয় তাঁকে।
এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ৭ম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম। সর্বশেষ তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে ২০২৬ সালের ১৪ মে নিয়োগ দেওয়া হয় অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেনকে।