এনএসইউ’র সমাবর্তন
সমাবর্তনে অতিথিদের সঙ্গে ফটোসেশনে স্বর্ণপদক পাওয়া শিক্ষার্থীরা © টিডিসি
পেশায় ব্যাংকার মেহরাব মবিন ভূইয়াঁ। পেশাগত জীবন ছাড়াও সংসার আছে, আছে স্ত্রী-সন্তান। এ বছর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন তিনি। এতটুুকুই নয়, অর্জন করেছেন শিক্ষাজীবনের সেরা ফলাফল। মাস্টার্সে মোট সিজিপিএ ৪-এ ৪ পেয়েই উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি) এই অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সিআর আবরারের হাত থেকে চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক গ্রহণ করেছেন মেহরাব।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলার সময় মেহরাব মবিন ভূইয়াঁ বললেন, স্ত্রীর সহযোগিতা ছাড়া এতদূর আসা কোনোভাবেই সম্ভব হত না। তার ভাষায়— ‘অল ক্রেডিট গোজ টু হার।’
বুধবার দুপুরে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬তম সমাবর্তনের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলছিলেন তিনি। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে দুজন চ্যান্সেলর স্বর্ণ পদক পেয়েছেন। এ ছাড়া ভাইস চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক পেয়েছেন আরও ৮ শিক্ষার্থী। চ্যান্সেলরস স্বর্ণপদক পাওয়া অপর শিক্ষার্থী হলেন স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের স্নাতকের শিক্ষার্থী মাহিরা ইসলাম আশফি। সমাবর্তনে ‘ভ্যালিডিক্টোরিয়ান’ বা সবচেয়ে সেরা শিক্ষার্থীর সম্মানও পেয়েছেন তিনি।
ভাইস চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক পাওয়া ৮ শিক্ষার্থী হলেন ইংরেজি বিভাগের জেমিমা শারমিন লামিয়া, বিবিএর হুমাইরা আনজুম অর্চি, কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের রাশিক ইরাম চৌধুরী, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের তাসনিম জাহান, এক্সিকিউটিভ মাস্টার্স ইন পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স প্রোগ্রামের তাসবির রায়হান, এমবিএর নুসরাত জাহান লিপি, ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তাবাসসুম হায়দারী ও বায়োটেকনোলজির মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তাসমিম আবু সালেহ।
চ্যান্সেলরস স্বর্ণপদক পাওয়া মেহরাব মবিন ভূইয়াঁ অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, খুব ভাল লাগছে, কারণ আমি যখন ভর্তি হয়েছিলাম, তখন এরকম ভাবনাও ছিল না। তবে সময় গড়াতে গড়াতে এটা হয়ে গেছে। এটার পিছনে আমি বলব সবচেয়ে বড় কন্ট্রিবিউশন আমার স্ত্রীর। আমার ওয়াইফ আমার ‘পিচ্চি’দেরকে ম্যানেজ করার কারণে বাকি সময়গুলো আমি অফিস, পড়াশোনায় দিতে পেরেছি। সো, অল ক্রেডিট গোজ টু হার। আর যাদেরকে মেনশন না করলে হয় না, আমাদের ফ্যাকাল্টি যারা আছেন। তারা খুবই হেল্পফুল। উনাদের গাইডেন্স এবং মেন্টরশিপ ছাড়া এটা আসলে সম্ভব ছিল না। এ ছাড়া আমার যারা ব্যাচমেট ছিল, তারাও অনেক হেল্প করেছে। ওভারঅল সবার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, সত্যি করে বলি, আমি ছোটবেলায় ক্লাস এইট পর্যন্ত আমি পাস করতাম না। ফেইল করে গ্রেইস নিয়ে নিয়ে উঠতাম। এরপরে এরকম গোল্ড ম্যাডেল পাব, এটা যদি ব্যাচেলর কমপ্লিট হওয়ার পরেও কেউ বলত যে এই লিস্টে আমি থাকব, আমি জীবনেও বিশ্বাস করতাম না। সাফল্যের সূত্র জানতে চাইলে মেহরাব বলেন, অনেক হার্ডওয়ার্ক করতে হয়েছে, সময় মতো সবকিছু কাভার করতে অনেক নির্ঘুম রাত পার করতে হয়েছে। আর কিছুটা ভাগ্যের ব্যাপারও থাকে। আই ওয়াজ সো লাকি, তাই হয়ে গেছে।
সমাবর্তনের ‘ভ্যালিডিক্টোরিয়ান’ মাহিরা ইসলাম আশফি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অবশ্যই এটি অনেক বড় সম্মান। আমি অনেক খুশি যে আমি এই সম্মান পেয়েছি এবং সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছি। আমার সব অর্জনের জন্য আমি আমার মাকে ধন্যবাদ জানাই। সব ধরনের দুঃসময়ে মা আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে। যে কোনো সমস্যা থাকলে মা আমাকে হেল্প করেছে।
এমন কৃতিত্বের দিনে বাবাকে স্মরণ করে তিনি বলেন, আমার তৃতীয় সেমিস্টার শেষ হওয়ার পরে কভিডের সময়ে আমার বাবা মারা যান। তিনি আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার দুই দিন পর থেকেই আমাকে ক্লাস শুরু করতে হয়েছে। তবুও আমি ভেঙে পড়িনি। অনেক কষ্ট হয়েছে, তারপরেও আমি পজিটিভ থাকার চেষ্টা করেছি। আমি জানতাম, বাবা থাকলে অবশ্যই চাইতেন যাতে আমি ভেঙে না পড়ি। তিনি চাইতেন আমি অনেক শক্তি ও সাহস নিয়ে পড়ালেখায় এগিয়ে যাই এবং সবচেয়ে ভালটা অর্জন করি। বাবার উদ্দেশ্যে অনেক কিছুই বলার আছে। আমি নিশ্চিত বাবা এখানে থাকলে উনি কান্না করে দিতেন। উনি আমার যেকোনো অ্যাচিভমেন্টে কান্না করতেন। আমি নিশ্চিত তিনি অনেক গর্বিত হতেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
শিক্ষাজীবনে সাফল্যের জন্য করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আমি বলব, সাহস এবং আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। আর যদি অধ্যবসায় থাকে তাহলে অর্জন করা কঠিন কিছু না। নিজের উপর বিশ্বাস থাকতে হবে যে আমি এটা অর্জন করতে পারব।
ভাইস চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক পাওয়া এমবিএ শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান লিপি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আজকের অনুভূতিটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমি মনে করি এ দিনটা আমার চেয়ে আমার মা-বাবার জন্য স্পেশাল। আমার সব হার্ডওয়ার্কের ফল হিসেবে মনে হল সাফল্য অর্জন করেছি। এ দিনটার জন্য আমি অনেক কষ্ট করেছি। দিনশেষে আমি যে অর্জনটা করেছি এটা আমাদের ফ্যাকাল্টি মেম্বার, ভিসি স্যার, আমার মা-বাবা এবং ভাই-বোনদের উৎসর্গ করতে চাই। আশা করি, ভবিষ্যতেও আমি তাদের মুখ উজ্জ্বল করতে পারব।
তিনি বলেন, অনেক স্মৃতি। নর্থ সাউথে প্রেসার অনেক বেশি। অনেক নির্ঘুম রাত, অনেক অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, অনেক কিছুই ছিল। এরপরও কখনও আশা ছাড়িনি। আমি আন্ডারগ্র্যাড করেছি চট্টগ্রামে, এখানে মাস্টার্স করেছি। আমার এক্সপেকটেনশন এত বেশি ছিল না। তবে আমার আন্ডারগ্র্যাডের রেজাল্ট যেহেতু ভাল ছিল, শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি বেস্টটা দেওয়ার। দিনশেষে সেরাটা পেয়েছি, এটার জন্য আমি খুশি।
লিপির বাবা অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, আমার অনেক বেশি ভাল লাগছে। সবচেয়ে বেশি ভাল লাগছে আমার অর্ধাঙ্গীর জন্য। তিনি সবকিছু চেষ্টা করে আজকের দিনটা উপহার দিয়েছেন। আমি একজন প্রবাসী। আমার তিনটা ছেলে-মেয়েকে উনি মানুষের মত মানুষ করেছে। আমার বড় ছেলে ডাক্তার, মেজ ছেলে আইউবির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।
তিনি বলেন, সব মা-বাবাকে বলব, মেয়েদেরকে যেন একটু বেশি করে সাপোর্ট করেন। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় মেয়েরা সব সময় একটু দুর্বল থাকে। কিন্তু ছেলেমেয়ের মধ্যে পার্থক্য করার কিছু থাকে না। আল্লাহ যা-ই আপনাকে দিয়েছে, সেটাই আপনার বড় সম্পদ। সে সম্পদকে লালন করা আমাদের দায়িত্ব।