জিরুনা ত্রিপুরা © টিডিসি ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জিরুনা ত্রিপুরা। তবে নির্বাচনের দিন নিজ নির্বাচনী এলাকায় তিনি ভোট দিতে পারবেন না। জেলা নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, তিনি খাগড়াছড়ি জেলার ভোটার নন; তার ভোটার নিবন্ধন চট্টগ্রাম জেলায়। ফলে প্রার্থী হিসেবে খাগড়াছড়িতে নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে অন্য জেলায়। বিষয়টি সামনে আসার পর স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জিরুনা ত্রিপুরা চট্টগ্রাম জেলার ভোটার। আইন অনুযায়ী তিনি যে এলাকায় ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত, কেবল সেখানেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। ফলে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনে প্রার্থী হলেও তিনি এখানে ভোট দিতে পারবেন না।’ তিনি আরও জানান, চাইলে নির্বাচনের দিন জিরুনা ত্রিপুরা চট্টগ্রামে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারবেন, তবে খাগড়াছড়িতে নয়।
নির্বাচন আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি যেকোনো সংসদীয় আসন থেকে প্রার্থী হতে পারেন। তবে ভোট দিতে হলে তাকে সেই কেন্দ্রে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত থাকতে হয়। অর্থাৎ প্রার্থী হওয়া ও ভোটার হওয়া দুটি আলাদা বিষয়। এ কারণেই খাগড়াছড়ির ভোটার না হয়েও খাগড়াছড়ি আসনে প্রার্থী হওয়া আইনসম্মত হলেও স্থানীয়ভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তার নেই।
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে জিরুনা ত্রিপুরাকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছুদিন সক্রিয়ভাবে কাজ করলেও পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। জেলা পরিষদের সদস্যরা তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর থেকেই তিনি খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসেন। তার সমর্থকদের দাবি, বিষয়টি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল। তবে সমালোচকরা প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়ও তাকে জটিলতার মুখে পড়তে হয়। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের অন্তত ১ শতাংশ সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দিতে হয়। খাগড়াছড়ি আসনে মোট ভোটার প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ। সে হিসেবে প্রয়োজন ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ভোটারের সমর্থনপত্র। কিন্তু প্রাথমিকভাবে তিনি জমা দেন প্রায় ছয় শতাধিক ভোটারের নামের তালিকা, যা নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। ফলে যাচাই-বাছাই শেষে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। আপিলের পর বিশেষ বিবেচনায় তার প্রার্থিতা বহাল রাখা হয়। এতে করে মনোনয়নসংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে থাকার সুযোগ পান।
এ বিষয়ে জিরুনা ত্রিপুরার বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো প্রার্থী নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটার না হওয়া ভোটারদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় বিষয়টি ভোটার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে তার সমর্থকদের বক্তব্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং প্রার্থী হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তাই এটি আইনগতভাবে বৈধ।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ, মনোনয়ন বাতিল ও আপিলের পর প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া—সব মিলিয়ে জিরুনা ত্রিপুরার রাজনৈতিক পথচলা ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোট দিতে না পারার বিষয়টি। এখন দেখার বিষয়, এসব আলোচনা ও বিতর্কের পর খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের ভোটাররা তাকে কতটা সমর্থন দেন। শেষ পর্যন্ত রায় দেবে ভোটাররাই।