লেখক ও গল্পকার আসিফ এন্তাজ রবি © সংগৃহীত
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গতকাল ইন্তেকাল করেছেন। তার বিয়োগে দল-মত নির্বিশেষে মর্মাহত ও আবেগে-আপ্লত হয়ে শোক জানাচ্ছেন সবাই, যেন তিনি সবার পরিবারের সদস্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিন বারের এই প্রধানমন্ত্রীকে যথাযোগ্য সম্মানের পরিবর্তে অপমান ও নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এসময়ে তিনি প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
তবে কালের পরিক্রমায় সে সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। যারা খালেদা জিয়া, তারেক রহমান কিংবা জিয়া পরিবারকে বঞ্চিতদের কাতারে রেখেছিলেন, তারাই এখন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সম্মানিত হয়েছেন খালেদা জিয়া এবং তার পরিবার। এই চক্রাকার বা বৃত্তাকার প্রতিস্থাপিত ঐতিহাসিক গল্পের বিশ্লেষণ করেছেন লেখক ও গল্পকার আসিফ এন্তাজ রবি।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিজ অ্যাকাউন্টে তিনি একটি পোস্টের মাধ্যমে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য আসিফ এন্তাজ রবির ফেসবুক পোস্টটি তুলে ধরা হল:
আপনাদের শোকের ধকল যদি কিছুটা কমে, তাহলে একটা সামান্য বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
আপনারা কি খেয়াল করেছেন, বৃত্তটা কীভাবে পূর্ণ হলো।
দুই বছর আগেও আমরা ধরে নিয়েছিলাম, বেগম জিয়ার একাকী মৃত্যু হবে। তার ছেলে বিদেশে বসে অসহায়ভাবে মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনবেন। চোখের জল আর চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া- তার আর কিছুই করার থাকবে না।
কিন্তু জীবন কত বিচিত্র দেখেন।
বিদেশে চিকিৎসা করতে না দেয়া, জেলে বন্দী রাখা, বাসা থেকে উচ্ছেদ করা, অপমান করা- এতকিছু সত্ত্বের বেগম জিয়ার ধৈর্য্য এবং একাগ্রতার কাছে ইতিহাস নত হলো। শেখ হাসিনা বিদায় নিলেন। যে অপমান তিনি অহরহ সবাইকে করতেন, বাংলার কোটি মানুষ তাকে সেই অপমান কড়ায় গন্ডায় ফিরিয়ে দিয়ে, এক প্রকার ধাওয়া দিয়ে, চল্লিশ মিনিট সময় বেঁধে দিয়ে দেশ ছাড়া করলো।
বেগম জিয়া নীরবে এবং পরিমিতভাবে জনতার বিজয় উদযাপন করলেন, জনতার সাথে। সেই বহুল প্রতীক্ষিত বিদেশে চিকিৎসাও হলো।
যে বড় পুত্র ১৬ বছর আগে- হুইল চেয়ারে করে দেশ ছেড়েছিলেন, সেই পুত্রই তাকে এয়ারপোর্টে বরণ করলেন, নিজে গাড়ি চালিয়ে মাকে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। পারিবারিক মিলনের একটা স্বর্গীয় দৃশ্য রচিত হলো।
তারপর পুত্র ফিরলো মায়ের কাছে। যে বেগম জিয়ার মৃত্যু হবার কথা ছিলো একাকী, নিকট পরিবারহীন অবস্থায়। সেখানে পুরো উল্টো ঘটনা ঘটলো। পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য আর বেগম জিয়ার সত্যিকারের যে পরিবার, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ দাঁড়িয়ে রইলেন তার শয্যাপাশে। বেগম জিয়া বিদায় নিলেন। অথবা বিদায় আসলে তিনি নিলেন না, আরও গভীরভাবে প্রোথিত হলেন- বাংলাদেশের ইতিহাসের। বাংলার মানুষের হৃদয়ে।
তিনি যখন নিপীড়িত হচ্ছিলেন, তখন গণমাধ্যম ছিলো পরাধীন অথবা স্বেচ্ছায় নতজানু। বেগম জিয়ার বিদায়কালে দেখে গেলেন, গণমাধ্যম স্বাধীন। প্রথম আলো পত্রিকা তার লাল সূর্য কালো করে ফেললো। এবং স্বতস্ফুর্তভাবে মানুষ তাকে নিয়ে নির্ভয়ে লিখছে। ভালো, মন্দ, আলোচনা, সমালোচনা। সবকিছুই।
মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেলেন, এক বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে অন্তত একটি নির্বাচন হবার সম্ভাবনা আছে। যে সম্ভাবনার নির্বাচন বাংলাদেশকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
বাংলায় যেটাকে বলে অন্তেস্টিক্রিয়া, ইংরেজিতে ফুনেরাল, সেই ফুনেরালে আসছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বেগম জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে। যখন দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত শীতল। ইতিহাসের সবচেয়ে ঠাণ্ডা সময় পার করছে প্রতিবেশি এই দুই রাষ্ট্র।
ঠিক সেই ভারতে এখন অবস্থান করছেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক আশ্রয়ে। সেদিন একটা টক শো-তে দেখলাম, ভারতের কোনো এক অখ্যাত রাজনীতিবিদ বলছেন, আচ্ছা, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বের করে দেয়া যায় না? বিনা সিক্রি সেই রাজনীতিবিদকে উত্তর দিলেন, না না। ওটা খারাপ দেখা যাবে।
ঠিক সেই ভারতের প্রতাপশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ছুটে আসতে হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।
আরও পড়ুন: দলের বিভক্তি এড়াতে বিএনপি চেয়ারপার্সন পদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছিলেন খালেদা জিয়া
বেগম জিয়ার জানাজা হবে মানিকমিয়া এভিনিউ। আমরা যেটাকে খাস বাংলায় বলি -সংসদ ভবন এলাকা। যে এলাকায় শায়িত আছেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এবং আওয়ামীলীগ সরকার একটা উদ্যোগ নিয়েছিলো, জিয়াউর রহমানের গোটা কবরটিকেও উচ্ছেদ করার। সেই কবরেই খুব সম্ভবত ইতিহাসের আরেকটি বৃহত্তম জানাজার মধ্যে বেগম জিয়া শেষ আশ্রয় নেবেন।
মানুষের মধ্যে যদি আদর্শ থাকে, তাহলে তাকে ধ্বংস করা যায় না। বেগম খালেদা জিয়া সেই সত্যটা আবারো প্রমাণ করে গেলেন। তাঁকে ধ্বংস করার জন্য এমন কোনো কাণ্ড নেই, যেটা করা হয় নি। অথচ আজকের বাংলাদেশে পুবেপশ্চিমেউত্তরদক্ষিণে যেখানে তাকাবেন, বেগম জিয়াকেই দেখবেন। তিনি আরও বেশি জেকে বসলেন আমাদের মধ্যে।
আরেকটা ব্যাপার। ৫ আগস্টে জনতার নিরষ্কুশ বিজয়ের পর বেগম জিয়াকে একটি কটুবাক্য, ঘৃণামালা এবং বিদ্বেষ উৎপাদন করতে দেখা যায় নি। অথচ আমাদের ইতিহাস বলে, আমরা জয়ী হবার পর পরাজিত যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করি। বিশেষ করে সেই পরাজিত পক্ষের কাছে আমার যদি নাজেহালের ঘটনা থাকে।
এমনকি তাকে যখন অনবরত খোঁচানো হচ্ছিলো, তখনও তিনি তার ডিসেন্সি হারান নি। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতির মূল মন্ত্র হচ্ছে, বিদ্বেষ আর কটুবাক্য।
নিপীড়নে এবং বিজয়ে- দুটো ক্ষেত্রেই বেগম জিয়া দেখিয়ে গেলেন, ভদ্রভাবে রাজনীতি করা সম্ভব। এবং তাতেই প্রকৃত জয় আসে।
আজ বাংলাদেশ এমন একটা সময়ে যখন লাখ লাখ তরুণ রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে। নেতৃত্ব নিচ্ছে। এই তরুণদের বলবো, বেগম জিয়ার কাছ থেকে পারলে একটি জিনিস শেখো। কথা ও বাক্যে পরিমিত বোধ আনো। ধৈর্য্য ধরতে শেখো। সবুর করতে শেখো। এবং আপোষ না করতে শেখো।
আপোষ না সংগ্রাম? সংগ্রাম সংগ্রাম। এই স্লোগানটি বেগম জিয়া কোনোদিন মুখে উচ্চারণ করেন নি। অথচ তিনিই জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেলেন, আপোষ না সংগ্রাম? সংগ্রাম, সংগ্রাম। আমৃত্যু সংগ্রাম।
তার এই নীরব উচ্চারণ এতটাই শক্তিশালী যে, তার শারীরিক মৃত্যু ঘটেছে কিন্তু তার আদর্শের মৃত্যু ঘটে নি।
তিনি এতই প্রভাবশালী যে, তার মৃত্যু হলো, কিন্তু তিনি আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে জীবন সঞ্চার করলেন।
ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।