ভোলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য © সংগৃহীত
'বাংলাদেশের দ্বীপের রানী' বা 'কুইন আইল্যান্ড অফ বাংলাদেশ' খ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। যা অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। ভোলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কোন প্রকৃতিপ্রেমীকে তার বিমোহিত করবে। মেঘনা, তেতুলিয়া ও ইলিশা নদীবেষ্টিত এই দ্বীপজেলা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা ভোলা জেলার মনপুরা, চর কুকরীমুকরী, তুলাতলী এবং অন্যান্য দ্বীপ ও চর যেন প্রকৃতির এক একটি স্বর্গ রাজ্য। ভোলার এই দ্বীপগুলোতে বিস্তীর্ণ সবুজ বন, কেওড়া বন, সোনালি বালুকাবেলা এবং সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জলরাশি মিশ্রণ একটি একটি স্বপ্নীল দৃশ্য তৈরি করে। নৈসর্গিক এই দ্বীপ জেলা ভোলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই নয় খনিজ সম্পদেও সমৃদ্ধ, যা শুধু এই জেলার নয়, সমগ্র দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শীত ভোলার প্রকৃতি যেন নতুন করে নিজেকে মেলে ধরে। কুয়াশায় মোড়ানো ভোর, নদীর বুকে ভাসমান ধূসরতা আর নরম রোদের আলিঙ্গনে চর ও গ্রামগুলো হয়ে ওঠে আরও শান্ত, আরও সংযত। শীতের সময় এই জেলার সৌন্দর্য অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়।
শীতের সকালে ভোলার নদীগুলোকে আলাদা করে চেনা যায়। মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার বুকে ভাসমান কুয়াশা যেন প্রকৃতির আঁকা সাদা ক্যানভাস। দূরের চরগুলো আবছা হয়ে মিলিয়ে যায় আকাশের সঙ্গে। সূর্য ধীরে ধীরে উঠলে কুয়াশার পর্দা সরে, আর ভোলার প্রকৃতি প্রকাশ পায় তার নিজস্ব সৌন্দর্যে। শীতকালে ভোলার চরাঞ্চলগুলোও হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা অনেক চর এই সময় দৃশ্যমান হয়, যেখানে খোলা প্রান্তর, সবুজ ঘাস আর গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল রূপ পর্যটকদের টানে।
শীতের সময় মনপুরা, চর কুকরী মুকরী , তারুয়া সমুদ্র সৈকত ও তুলাতলী পর্যটকদের জন্য এক নৈসর্গিক গন্তব্যে পরিণত হয়। নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরগুলো শীতের কোমল রোদে আরও বিস্তৃত ও মনোরম হয়ে ওঠে। এসব চরজুড়ে গড়ে ওঠা কেওড়া বন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও শীতকালে দূরদূরান্ত থেকে আসা অতিথি পাখির বিচরণ চরের পরিবেশে যোগ করে প্রাণের সঞ্চার। তাদের কোলাহলে নীরব চরগুলো হয়ে ওঠে জীবন্ত। পাশাপাশি নদীর তীরে ও চরে লাল কাঁকড়ার স্বাভাবিক বিচরণ নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে চোখে পড়ে। শীতের সকালে মেঘনা, তেতুলিয়া নদীতে জেলেদের পাল তোলা নৌকা ভেসে যাওয়ার সৌন্দর্য যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
শীতকাল ভোলায় পর্যটনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়। চরাঞ্চলের খোলা প্রান্তর, নদীর সৌন্দর্য, গ্রামীণ জীবন ও শীতের মনোরম আবহাওয়া সহজেই পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। তাই শীতের সময় এই দ্বীপের রানীর সৌন্দর্য উপভোগ করত বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পর্যটক আসে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ছাপিয়ে এখানে মানুষ খুঁজে পায় প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের স্বাদ। এভাবেই শীতের ভোলা কেবল একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়, বরং প্রকৃতি ও জীবনের সহজ সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার এক অনন্য ঠিকানা হয়ে ওঠে।
ভোলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে দ্বীপজেলার পর্যটন শিল্প এখনও ভালো করে বিকশিত হতে পারে নি। পর্যাপ্ত হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সড়ক ও নৌপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকের আগমন সীমিত। ভোলা জেলার সাথে অন্যান্য জেলার সড়ক পথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম নেই। বহুদিন ধরে এই এলাকার মানুষ ভোলা-বরিশাল সেতুর জন্য লড়াই করে চলেছে। ভোলা-বরিশাল সেতুর বাস্তবায়ন হলে শুধু ভোলার অর্থনৈতিক উন্নয়নই বৃদ্ধি পাবে না, বরং দ্বীপজেলা এবং চরাঞ্চলের পর্যটন শিল্পেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।
দেবশ্রী দেবনাথ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়