নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ
নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের সপ্তম ব ্যাচের শিক্ষার্থীদের র্যাগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতাদের বিরুদ্ধে/লোগো © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
সিনিয়রদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখায় নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের সদ্য দ্বিতীয় বর্ষে ওঠা ২৬ শিক্ষার্থীকে রাতভর র্যাগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্তরা শাখা ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত। গত ২৩ এপ্রিল মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেলের ছাদে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ প্রশাসন।
ভুক্তভোগীরা মেডিকেল কলেজটির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ও সপ্তম ব্যাচের ছাত্র। জানা গেছে, গত ২৩ এপ্রিল দিবাগত রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ওই ২৬ শিক্ষার্থীকে র্যাগ দেওয়া হয়। এমনকি অসুস্থ ব্যক্তিকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে আসা হয় র্যাগ দেওয়া জন্য। এ ঘটনায় অপর এক শিক্ষার্থীও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এ ঘটনায় মূল অভিযুক্তরা হলেন— ৫ম ব্যাচের মুহতাসিম আহমেদ ও ৬ষ্ঠ ব্যাচের ছাত্র আওয়াব বিন আজহার। ঘটনার সময় আরও উপস্থিত ছিলেন চতুর্থ ব্যাচের সাফওয়ান বিন সাজ্জাদ জুন্নুন এবং ৬ষ্ঠ ব্যাচের মোমিনুল ইসলাম রিয়াদ, লাবিব মুশফিক, রাতুল হাসান বিশ্বাস ও বিশাল সাহা। এর মধ্যে সাফওয়ান বিন সাজ্জাদ জুন্নুন শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক। আর মূল অভিযুক্ত মুহতাসিম আহমেদ ও আওয়াব বিন আজহার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
শিক্ষার্থীরা একটা অভিযোগ দিয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার একাডেমিক কাউন্সিলে মিটিংয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজও শুরু করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে কমিটির সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে— অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল হাসান, অধ্যক্ষ, নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ
এদিকে র্যাগিংয়ের ঘটনায় গত ২৫ এপ্রিল অধ্যক্ষ বরাবর একটি অভিযোগপত্র দেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। এতে ভুক্তভোগী সকলের সই রয়েছে। পরে গতকাল মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) মেডিকেলের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এনাটমি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির আহমেদ পললকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে অধ্যক্ষের কক্ষে শিক্ষার্থীকে ছাত্রদল নেতার চড়-থাপ্পড়, চেয়ার ছুড়ে মারধর
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেডিকেল কলেজটির তৃতীয় ব্যাচের দুজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বেশ ভাল সম্পর্ক থাকায় তাদেরকে এই র্যাগ দেওয়া হয়েছে। এ সময় বেশ শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন করা হয়। অসুস্থ বোধ করলেও আকাশকে (ছদ্মনাম) জোর করে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আর রাসেল (ছদ্মনাম) নামে আরেক ভুক্তভোগী নির্যাতনের সময় অসুস্থতার কথা জানালে তার ‘পিরিয়ড হয়েছে’ বলে উপহাস করা হয়। এক পর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি বেশ কয়েকবার বমি করতে থাকেন।
অধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া অভিযোগপত্রেও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগপত্রে বলা হয়, আমাদের নেমেক-৭ ব্যাচের ২৬ জন ছাত্রকে রাত ১১টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত ছাদে দাঁড় করিয়ে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করে। এই সময়ের মধ্যে আমাদের সাথে অনেক ন্যাক্কারজনক ও অমানবিক ঘটনা ঘটে। আমাদের একজন সহপাঠী গুরুতরভাবে অসুস্থ হওয়ার পরও তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, এতে তার অবস্থার অবনতি হয় এবং সে অনেকবার বমি করে। আরেকজন সহপাঠী অসুস্থ থাকার পরেও তাকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে ছাদে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে ঘণ্টাখানেক হেনস্তা করা হয়।
আরও পড়ুন: ভাল নেই হাফেজে কোরআন হামিদুর, মস্তিষ্ক থেকে জটিলতা কিডনিতেও
এতে আরও বলা হয়, আমাদের ব্যায়াম করতে বাধ্য করা হয় এবং অশ্লীল শব্দ করতে বাধ্য করা হয়। আওয়াব বিন আজহার নির্দেশ দেয় যে— এত জোরে এই শব্দ করতে হবে যেন ছাত্রী হোস্টেল থেকে শোনা যায়। অশ্লীল শব্দ উচ্চারণে বাধ্য করার পাশাপাশি আওয়াব বিন আজহার তার ভিডিও ধারণ করে। আমাদের ব্যাচমেটকে বিনা অপরাধে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন মুহতাসিম আহমেদ। তিনি প্রফে ফেল করানো এবং কোনো রকম সাহায্য না করার হুমকিও দেন। একই সাথে আমাদের ব্যাচের মেয়েদের ওয়ার্ডে পা রাখতে দেবে না, এমনকি দুজন মেয়েকে পার্সোনালি দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ছাদে জোরপূর্বক প্রায় ঘণ্টাখানেক হাত সোজা করে ওপরে তুলে রাখতে বলা হয়। সব মিলিয়ে ৬ ঘণ্টা দাঁড় করে রাখা হয় তাদের। আওয়াব বিন আজহার তার জীবন নিয়ে পরোয়া করে না বলে মন্তব্য করেন। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া অভিযোগপত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মূল অভিযুক্ত ৫ম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুহতাসিম আহমেদের মুঠোফোনে কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া গেছে। ৬ষ্ঠ ব্যাচের ছাত্র ও আহ্বায়ক কমিটির আরেক সদস্য আওয়াব বিন আজহার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনাটি অনেক দিন আগের।’ তবে বিস্তারিত জানতে চাইলে পরে কথা বলবেন বলে কল কেটে দেন। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে জানতে চতুর্থ ব্যাচের ছাত্র ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাফওয়ান বিন সাজ্জাদ জুন্নুনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলে তিনিও রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল হাসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীরা একটা অভিযোগ দিয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার একাডেমিক কাউন্সিলে মিটিংয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজও শুরু করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে কমিটির সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।