ঈদের ছুটি
নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন শিক্ষার্থীরা © টিডিসি ফটো
জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কারণে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) বন্ধ ঘোষণা হওয়ায়, শিক্ষার্থীরা ২০ দিনের লম্বা ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন শিক্ষার্থীরা। গত ৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় পবিত্র রমজান, শবে-ক্বদর, জুমাতুল বিদা, ঈদ-উল-ফিতর এবং মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে ৯ মার্চ হতে ২৬ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে।
বুটেক্সে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আসে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাদের অনেককেই পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে থাকতে হয়। সারা বছর ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট ও টিউশনের ব্যস্ততায় বাড়ি ফেরা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
এবারের ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি শিক্ষার্থীদের পরিবারের কাছে ফেরার, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর এবং প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার সুজোগ এনে দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ বর্ষে এসে ঈদকে ঘিরে বাড়ি ফেরার বিশেষ অনুভূতি প্রকাশ করে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ঈদের আগে ঘরে ফেরার ব্যাপারটা সবসময়ই অন্যরকম একটা ভালো লাগার অনুভূতি জাগাতো। তবে অপ্রিয় এক সত্যের কারণে এবার অনুভূতিটা মিশ্র। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, তাই এবারই হয়তোবা ঈদ উল ফিতরে এত লম্বা একটা ছুটি উপভোগ করতে যাচ্ছি। জানিনা এরপরের বছরগুলোয় কেমন যাবে আমাদের ঈদ। তাই চেষ্টা করবো ঈদে পরিবার পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে এবারের ঈদকে অনেক বেশি স্মরণীয় করে রাখতে।
ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বুটেক্সের ৫০তম ব্যাচের ফ্যাব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী হোসনে আকরাম সোহান বলেন, ‘পড়াশোনা ও ব্যস্ততার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময়ই পরিবার থেকে দূরে ঢাকায় থাকতে হয়। তাই ঈদ সামনে এলেই বাড়ি ফেরার অনুভূতিটা অন্যরকম আনন্দ নিয়ে আসে।’
তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে থেকেই মনে হয় আর কয়েকদিন পরই পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা হবে। মা-বাবা ও পরিবারের সবার সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর অপেক্ষাটা সত্যিই অন্যরকম। অনেকদিন পর বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের যাত্রাটাও তখন খুব আনন্দের মনে হয়। ঈদের দিন সকালে পরিবারের সবার সঙ্গে নামাজ পড়তে যাওয়া, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা এবং আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা— এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। ঢাকার ব্যস্ত জীবনে যেটা পাওয়া যায় না, ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেলে সেই পারিবারিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসা আবার অনুভব করা যায়।’
বুটেক্সের ৫১তম ব্যাচের টেক্সটাইল ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আরাফাত আহাম্মদ খান বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা আমার ক্ষেত্রে অন্তত দুই মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। যত ব্যস্ততাই থাকুক, মনে মনে দিন গুনতে থাকি কখন পরিবারের কাছে ফিরব। শহরের জীবনটা অনেক সময় খুব যান্ত্রিক মনে হয়। মানুষ পাশাপাশি থাকলেও যেন একে অপরের খোঁজ নেওয়ার সময় পায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ছোটোবেলা থেকেই গ্রামে বড় হয়েছি। নবম শ্রেণি থেকে ঢাকায় থাকলেও এখনো মনে হয় সুযোগ পেলে সব ছেড়ে আবার সেই গ্রামেই ফিরে যাই। ঈদের দিন গ্রামের চাচা, ভাই ও বড়দের সঙ্গে দেখা হয়, সবাই মিলে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাই। পুরো গ্রাম যেন এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়। নামাজ শেষে গোরস্তানে গিয়ে দাদা-দাদীর কবর জিয়ারত করি। আমার কাছে ঈদের ছুটি মানেই— আমার গ্রাম, স্মৃতি আর শিকড়ের সঙ্গে আবার নতুন করে যুক্ত হওয়ার সুযোগ।’
একই ব্যাচের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আছিম হোসেন রাসেল বলেন, ‘ঈদের সময় মনটা আগে আগে গ্রামে ছুটে যায়। টিকিট কাটার পর থেকেই শুরু হয় অপেক্ষার দিন-গোনা। হলের রুমে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে মনে পড়ে গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তা, সবুজ ধানের মাঠ আর সন্ধ্যার আজানের সুর। ট্রেন বা বাসের দীর্ঘ যাত্রা তখন আর ক্লান্তিকর মনে হয় না। কারণ জানি, গন্তব্যে আছে আমার পরিবার, আমার শেকড়।’
তিনি আরও বলেন, ‘দূর থেকে বাড়ির টিনের ছাউনি বা উঠানের গাছগুলো চোখে পড়লেই বুকটা ভরে যায়। দরজায় দাঁড়িয়ে মায়ের হাসিমাখা মুখ দেখা, বাবার স্নেহময় কণ্ঠে খোঁজ নেওয়া— এই মুহূর্তগুলোই যেন সারা বছরের প্রাপ্তি।’
৪৯তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাশফিক নিয়াজ বলেন, ‘শহরের কোলাহল ও ব্যস্ততা ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসা এক গভীর প্রশান্তি এনে দেয়। বাড়ির আঙিনায় মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রাণ, বাবা-মায়ের স্নেহ, ভাই-বোনদের সঙ্গে গল্প— সব মিলিয়ে ঈদ যেন নতুন করে জীবনকে ছুঁয়ে যায়।’
তিনি মনে করেন, ঈদ শুধু নতুন পোশাক বা উপহারের আনন্দ নয়। এটি এমন একটি অনুভূতি, যা পরিবারের সঙ্গে থাকলেই সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করা যায়। ঈদে বাড়ি ফেরা যেন নিজের শিকড়ের সঙ্গে আবার নতুন করে সংযোগ স্থাপন করার মতো।
উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের হল আগামী ২৭মার্চ খুলে দেয়া হবে এবং একাডেমিক কার্যক্রম ২৯মার্চ থেকে শুরু হবে।