কেন কৃষি প্রকৌশল হতে পারে আপনার প্রথম পছন্দ?

০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:০৪ PM
মোস্তাফিজুর রহমান

মোস্তাফিজুর রহমান © টিডিসি সম্পাদিত

প্রকৌশল নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মনে পড়ে যায় গ্রামের সেই পুরনো দিনগুলো, যখন বাবা বলতেন, ‘বাবা, বিজ্ঞান আর শিল্পের মিলনে মানুষের জীবনটা সহজ হয়ে যায়।’ তখন আমি ছোট, বুঝতাম না ঠিকঠাক। কিন্তু আজ বুঝি, প্রকৌশল আসলে একটা জাদুকরী খেলা গণনা, সৃজনশীলতা আর উদ্ভাবনের মাঝে লুকিয়ে থাকে মানুষের শ্রম কমানোর রহস্য, সমাজের কল্যাণের পথ। 

সাধারণ প্রকৌশল আর কৃষি প্রকৌশলের মধ্যে যেন একটা নদীর মতো দূরত্ব, সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর। অন্যান্য প্রকৌশলী ধাতু, কংক্রিট বা যন্ত্রের সাথে খেলা করে, নির্জীব জিনিসের সাথে। কিন্তু কৃষি প্রকৌশল? আহা, এ তো অন্য কথা। এখানে যন্ত্রের সাথে মিশে যায় জীবনের ছন্দ উদ্ভিদের সবুজ পাতা, প্রাণীর নিঃশ্বাস, পশুসম্পদের হাঁটাচলা, কৃষির সেই জৈবিক জগৎ। 

এই মিলনেই কৃষি প্রকৌশল হয়ে ওঠে একটা মহান গল্পের নায়ক, সমগ্র প্রকৌশলের জগতে অনন্য। মানব সমাজে এর গুরুত্ব? বলব কী, এ তো খাদ্যের নিরাপত্তা, পরিবেশের রক্ষা, সমাজের স্থিরতা—যেন একটা নদী যা সবাইকে জীবন দেয়। কল্পনা করুন, যান্ত্রিকতার সাথে প্রকৃতির জীবন্ত স্পন্দন মিশে গেলে কী হয়? একটা সুন্দর সংযোগ, যা আমাদের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে, সমাজকে এগিয়ে নেয়।

02 (3)

বিশ্বজুড়ে কৃষি প্রকৌশলের ইতিহাস মানব সভ্যতার গভীরে প্রোথিত, যা প্রাচীন সভ্যতার সেচ ব্যবস্থা এবং সাধারণ কৃষি যন্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের উন্নত প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রথমদিকে এটি কেবল কৃষি কাজকে সহজতর করার জন্য ছিল, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯০০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি যান্ত্রিকতার বিভাগ গড়ে উঠে, এবং পরবর্তীকালে এটি জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত প্রকৌশল এবং বায়োসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করে। 

আজকের দিনে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন এবং সেন্সরের মতো প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়ে কৃষিকে একটি স্মার্ট এবং টেকসই রূপ দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর যাত্রা স্বাধীনতা-উত্তর যুগ থেকে শুরু, যখন কৃষি উন্নয়নের জন্য সেচ এবং যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে, যা কৃষি প্রকৌশলের ভিত্তি স্থাপন করে। আজ এটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসারিত হয়েছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই কৃষির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি প্রকৌশল নিয়ে এমন কিছু মজার কথা আছে, যা এটাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দাঁড় করায়, বিশেষ করে ২০২৫-এর চ্যালেঞ্জের আলোয়। এ তো শুধু যন্ত্র নয়, জীবনের প্রক্রিয়া—ফসলের বড় হওয়া, পশুর স্বাস্থ্য—যাতে মানুষের সৃজনশীল ছোঁয়া লাগে। ভবিষ্যতে এটা হবে নির্ভরযোগ্য ক্যারিয়ার, প্রযুক্তির ঝড়েও মানুষের ভূমিকা থাকবে অটুট। আগামী ১০০ বছরে চাকরির অভাব? না, না, এ তো খাদ্য, জীবন্ত সত্তা, পরিবেশের সাথে জড়ানো। 

উদাহরণ দেই, ‘প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার’ সুনির্দিষ্ট কৃষি আগামী কয়েক বছরে নেতৃত্ব দেবে কৃষি শিল্পে। ড্রোন, সেন্সর, এআই দিয়ে ফসল দেখা, জল-সারের সঠিক ব্যবহার বাংলাদেশে জমির কমতি, জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলায় বিপ্লব আনবে। আর ‘বায়োরিসোর্স সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং’ জৈব সম্পদের প্রকৌশল হবে প্রাকৃতিক সম্পদের ভবিষ্যৎ নায়ক। এটি বায়োইনার্জি, মাইক্রোবায়াল সেন্সর এবং টেকসই সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে নতুন মাত্রা দিবে, যা শিক্ষার্থীদের এই মহান পেশায় আকৃষ্ট করবে এবং তাদেরকে একটি অর্থপূর্ণ যাত্রায় নিয়ে যাবে।

বাংলাদেশে কৃষি প্রকৌশলের বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের জন্য কয়েকটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেমন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এই ডিগ্রি পেতে হলে শিক্ষার্থীদের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চার বছরের একটি গভীর কোর্সে যোগ দিতে হয়। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য কৃষি প্রকৌশলের ফ্যাকাল্টি খুব শিগগিরই শুরু করতে যাচ্ছে, যা এই ক্ষেত্রে আরও সুযোগ তৈরি করবে। 

04 (2)

এই শিক্ষা তাদের শিল্প, সরকারি এবং বেসরকারি খাতে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য করে তোলে, যেখানে তারা নীতি নির্ধারণ, প্রকল্প চালনা এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেয়। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে এই নেতৃত্বের গুরুত্ব অন্যান্য পেশার চেয়ে অনেক বেশি, কারণ এটি অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে যা বাস্তব জীবনে অন্য পেশাগুলোর চেয়ে অধিক প্রভাবশালী এবং সম্মানজনক।

এই ডিগ্রির অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তু অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং গভীর, যা শিক্ষার্থীদের প্রকৌশলের মৌলিক থেকে শুরু করে কৃষির বাস্তব প্রয়োগ পর্যন্ত নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, তারা ফ্লুইড মেকানিক্স (Fluid Mechanics) পড়বে, যা সেচ ব্যবস্থা এবং জলপ্রবাহের ডিজাইনের জন্য অপরিহার্য; সলিডওয়ার্কস (SolidWorks) মতো সফটওয়্যার শিখবে, যা কৃষি যন্ত্রপাতির 3D মডেলিং এবং ডিজাইনে ব্যবহৃত হয়; এবং পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং (Public Health Engineering) নিয়ে পড়াশোনা করবে, যা কৃষি পরিবেশে স্বাস্থ্য এবং স্যানিটেশনের সাথে যুক্ত। 

এই ডিগ্রিতে শিক্ষার্থীরা মেশিন ডিজাইনের মৌলিক থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন এবং পরিকল্পনা পর্যন্ত সবকিছু শিখে। প্রথমে তারা বেসিক প্রকৌশল নীতি যেমন থার্মোডায়নামিক্স বা মেকানিক্স শিখে, তারপর কৃষি যন্ত্রের ডিজাইন, যেমন ট্রাক্টর বা হারভেস্টার এর মডেল তৈরি করতে শিখে। এরপর বাস্তবায়নের ধাপে তারা প্রোটোটাইপ তৈরি করে এবং পরীক্ষা করে, যা তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা ভাবনা শেখায়। 

অবশেষে, পরিকল্পনার অংশে তারা কৃষি প্রকল্পের বাজেট, সময়সূচী এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে, যা তাদেরকে একটি সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এই যাত্রা শিক্ষার্থীদেরকে শূন্য থেকে শুরু করে একটি সম্পূর্ণ প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য করে তোলে, যা অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং পুরস্কারমূলক। এই বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রদান করে, যা তাদেরকে একটি সম্পূর্ণ প্রকৌশলী হিসেবে গড়ে তোলে।

একাডেমিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের সময়সূচী অত্যন্ত ব্যস্ত এবং চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে, যেখানে ক্লাসরুমের পড়াশোনা ছাড়াও ল্যাবরেটরি ওয়ার্ক, প্রজেক্ট এবং ফিল্ড ভিজিট অন্তর্ভুক্ত থাকে। তারা প্রায়ই ফিল্ড ওয়ার্কে যান, যেমন কৃষি জমিতে গিয়ে সেচ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা বা যন্ত্রপাতির বাস্তব ব্যবহার দেখা, যা তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তবতার সাথে যুক্ত করে। এছাড়া, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট এর মাধ্যমে তারা কৃষি শিল্প বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কয়েক সপ্তাহ বা মাস কাটান, যেখানে তারা প্রকৃত প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে এবং শিল্পের চ্যালেঞ্জ গুলো উপলব্ধি করেন। এই প্রক্রিয়া তাদেরকে একটি ব্যস্ত কিন্তু ফলপ্রসূ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে তোলে, যা ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারের জন্য অমূল্য।

03 (3)

কৃষি প্রকৌশলীদের চাকরির ক্ষেত্র শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। সাধারণ চাকরিগুলো যেমন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের পাশাপাশি, কিছু অনন্য ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে শুধুমাত্র এই শাখার স্নাতকরা অবদান রাখতে পারেন যেমন বায়োটেকনোলজি কোম্পানির জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফসল উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সংস্থায় জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প, বা বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন। 

বিশ্বজুড়ে তারা ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি, প্রিসিশন এগ্রিকালচার স্পেশালিস্ট বা বায়ো এনার্জি প্রকল্পে যোগ দিতে পারেন, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি টেকসই উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। একজন নতুন স্নাতকের জন্য এই যাত্রা অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং জীবনকালীন, কারণ এতে নিরন্তর উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে এবং রয়েছে বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলার আনন্দ।

তবে বাংলাদেশে এই ডিগ্রির কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন কিছু স্নাতকের দক্ষতার অভাবে সরকারি চাকরিতে সহজে প্রবেশ না করতে পারা, যদিও প্রচুর সুযোগ এবং সার্কুলার থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষণের মধ্যে কিছু অসঙ্গতির কারণে সরকার প্রয়োজনীয় পদগুলো পূরণ করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে, সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে ১৭৬ জন সহকারী কৃষি প্রকৌশলীর পদের জন্য প্রায় ১৫০০ আবেদনকারী ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ২০ জন নির্বাচিত হয়েছে। 

তাই শিক্ষার্থীদের নিজেদেরকে আরও দৃঢ় ভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে কোনো সুযোগ হাতছাড়া না হয়। এই পদগুলো কৌশলগত এবং নেতৃত্বমূলক, যেখানে তারা সমাজে অবদান রাখতে পারেন এবং সরকারি স্টেকহোল্ডারদের নেতৃত্ব দিতে পারেন। একটি সুস্থিত একাডেমিক ভিত্তি এবং উদ্যমের সাথে এটি সম্ভব, এবং এটি হতাশার কারণ নয় বরং উন্নতির সুযোগ।

শেষ কথায়, কৃষি প্রকৌশলের ভবিষ্যৎ অসীম সম্ভাবনাময়, কারণ এটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের এই বিষয়কে অন্যান্য উপলব্ধ শাখার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যদি তারা একটি উজ্জ্বল, গৌরবময় এবং অর্থপূর্ণ ক্যারিয়ার গড়তে চান। এতে যোগ দিয়ে তারা দেশের উন্নয়নে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবেন এবং একটি সার্থক জীবন যাপন করতে পারবেন।

লেখক: প্রভাষক, কৃষি প্রকৌশল বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

বিটিআরসি ভবনে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার সেই ৪৫ জন কারাগারে
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
দেশে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫ শতাধিক
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ভেনেজুয়েলায় ৫ মার্কিন …
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
পাকিস্তানে ইউটিউবার-সাংবাদিকসহ ৭ জনের ‘ডাবল’ যাবজ্জীবন কারা…
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
চবির ‘ডি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা আজ, প্রতি আসনে লড়বেন ৬০ জন …
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
‘একটি আইএমইআই নম্বরেই ৩ কোটি ৯১ লাখ স্মার্টফোন’
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
X
APPLY
NOW!