ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি © সংগৃহীত
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে কিছুদিন ধরে ইরানজুড়ে চলমান ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ মুখে ‘ঐক্যের’ আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শুধু তাই নয়, এ সহিংস বিক্ষোভে ইন্ধনদাতা বিদেশি শত্রুদের বিরুদ্ধে সতর্ক করে তা কঠোরভাবে দমনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে খামেনি বিক্ষোভের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেন। আর দেশটির সরকারও এ বিক্ষোভকে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শত্রুদের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করছে। তিনি বলেন, দাঙ্গাকারীরা সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে এবং তেহরান ‘বিদেশিদের ভাড়াটে’ হিসেবে কাজ করা কাউকে সহ্য করবে না। তিনি ট্রাম্পের হাত ‘ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত’ বলেও মন্তব্য করেন।
বিদেশভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৪৮ জন বিক্ষোভকারী।
যদিও প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং রাষ্ট্রকে ‘প্রকৃত’ অভিযোগগুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন, তবে অন্য মহলগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে যে, প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। তাদের দাবি, এই বিক্ষোভ ‘বিদেশি শত্রুদের’ সমর্থন পাচ্ছে।
শুক্রবার ইরানি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানায়, বেলুচ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জাহেদান শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়, এতে কয়েকজন আহত হন। শুক্রবারের নামাজ শেষে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমেছিলেন।
জানা যায়, অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যখন ইরানের মুদ্রা রিয়ালের তীব্র দরপতনে ক্ষুব্ধ হয়ে তেহরানের ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামেন।
বিক্ষোভ দমন করতে সরকার গত বৃহস্পতিবার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। শুক্রবারও এই ব্ল্যাকআউট অব্যাহত থাকে। পাশাপাশি ফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল ছিল এবং দেশ থেকে ও দেশে আসা–যাওয়ার সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
ইন্টারনেট স্বাধীনতা পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস শুক্রবার নিশ্চিত করেছে, এই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছে এবং সংযোগ মারাত্মকভাবে সীমিত রয়েছে।
তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও, আন্দোলনকারীরা অনলাইনে ভিডিও পোস্ট করতে সক্ষম হন। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানী তেহরান ও অন্যান্য এলাকায় রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের মাঝে আগুন জ্বালিয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা।
শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সন্ত্রাসী এজেন্টরা’ আগুন লাগিয়েছে এবং সহিংসতা উসকে দিয়েছে। তারা ‘হতাহতের’ কথাও বলেছে, তবে বিস্তারিত জানায়নি।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার হুমকি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে দেবে না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইরানকে খুব শক্তভাবে জানানো হয়েছে—যদি তারা এটা করে, তাহলে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে।’
অন্যদিকে, শুক্রবার ইরানের স্বঘোষিত ‘ক্রাউন প্রিন্স’ রেজা পাহলভি—১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
তিনি লেখেন, ‘আমি জনগণকে তাদের স্বাধীনতার জন্য রাস্তায় নামতে এবং সংখ্যার জোরে নিরাপত্তা বাহিনীকে পরাস্ত করতে আহ্বান জানিয়েছি। গত বৃহস্পতিবার রাতেই তারা তা করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই অপরাধী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপনার হুমকি শাসকগোষ্ঠীর গুন্ডাদেরও কিছুটা পিছিয়ে রেখেছে। কিন্তু সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষ আবার রাস্তায় নামবে। আমি আপনার সহায়তা চাই।’
ট্রাম্প এর আগে ওয়াশিংটনের আশপাশে বসবাসরত পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তেহরানের সরকার ভেঙে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র এখনই কোনো বিকল্প নেতৃত্বকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত নয়।
ইরানের ভেতরে পাহলভির কতটা সমর্থন রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক হোলি ডাগরেস অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, বিক্ষোভের ডাক দিয়ে তিনি আন্দোলনের ‘মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন’।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ইরানিরা ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের লক্ষ্যে বিক্ষোভে নামার আহ্বানকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করছেন।’
তিনি বলেন, ‘এ কারণেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে—যাতে বিশ্ব এই বিক্ষোভ দেখতে না পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এতে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার সুযোগও তৈরি হয়েছে।’
রাষ্ট্রীয় টিভিতে দেওয়া ভাষণে খামেনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা ‘অন্য একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে নিজেদের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে’—এখানে তিনি ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করেন।
ভাষণের সময় দর্শকদের কণ্ঠে শোনা যায়, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যু হোক!’
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা।