সাদ্দাম থেকে মাদুরো—কোন কোন দেশের শাসকদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিল যুক্তরাষ্ট্র

০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৩ AM
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও © সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন সেনাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বিশ্ব রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিগত কয়েক দশকে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা কার্যত নজিরবিহীন, এটি অনেককে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কিংবা পানামার ম্যানুয়েল নোরিয়েগার পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সাদ্দাম ও লাদেনের ভাগ্যের কথা স্মরণ করছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইতিহাসের দিকে তাকালে মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি মিল খুঁজে পায় ১৯৮৯ সালে পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করার ঘটনার সঙ্গে। মাদুরোর মতোই নোরিয়েগার বিরুদ্ধেও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। নোরিয়েগা গ্রেফতারের পর পানামার সেনাবাহিনী আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

পানামায় হামলার নেপথ্যে সে সময়কার মার্কিন প্রশাসনের দাবি ছিল, পানামায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের উপর হামলা এবং সে দেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ। এই কারণ দেখিয়েই হামলা চালানো হয় এবং নোরিয়েগাকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে ক্ষমতায় আসেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা নোরিয়েগা। প্রেসিডেন্ট আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন তিনি। অনেকের মতে, তার আমেরিকাবিরোধী অবস্থানই শেষ পর্যন্ত তাকে মার্কিন রোষের মুখে ফেলে।

নোরিয়েগার পরিণতিও ছিল কঠিন। ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি আমেরিকার কারাগারে বন্দি ছিলেন। পরে অন্য একটি মামলায় বিচার মুখোমুখি করতে তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। এক বছর সেখানে থাকার পর তাঁকে ফের পানামায় ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানেই কারাগারে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন: ইরানে চলমান অস্থিরতা নিয়ে মুখ খুললেন আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী

তবে মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি নোরিয়েগার গ্রেফতারের থেকেও অনেক বেশি আলোচ্য। কারণ, কোনও দেশের রাজধানী থেকে সরাসরি সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক আটক করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। একাংশের মতে, এই ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা যায় ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিযানের, যখন গুহায় লুকিয়ে থাকা সাদ্দাম হোসেনকে আটক করা হয়।

২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিকরিত শহরের একটি গুহা থেকে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দামকে গ্রেফতার করে মার্কিন বাহিনী। তবে তখন ইরাকের সঙ্গে আমেরিকার সরাসরি যুদ্ধ চলছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, ইরাক বিধ্বংসী অস্ত্র মজুত করছে এবং তা দিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই জর্জ বুশ প্রশাসন সামরিক অভিযান শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাদ্দামকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

২০১০ সালের শুরুতে আরব বসন্তের ঢেউয়ে যখন তিউনিসিয়ার জাইন আল-আবিদিন বেন আলী ও মিসরে হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে লিবিয়ার বেনগাজি শহরে। গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তিনি সহিংস পথ বেছে নিলে তাঁর ওপর পশ্চিমাদের চাপ বাড়তে থাকে। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর জাতিসংঘ গাদ্দাফিবিরোধী 'ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল' (এনটিসি)-কে সমর্থন দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো এতে সরাসরি মদদ জোগায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) সমর্থনে এনটিসি লিবিয়ায় আক্রমণ শুরু করে। ২০১১ সালের ২৩ আগস্ট তারা ত্রিপোলিতে গাদ্দাফির সদর দপ্তর আল-আজিজিয়া কম্পাউন্ড দখল করে। এরপর ২০ অক্টোবর সিয়ার্ত শহরে ফ্রান্সের বিমান হামলায় গাদ্দাফির গাড়িবহর বিধ্বস্ত হলে তিনি একটি পাইপের ভেতরে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তাঁকে বের করে আনার পর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে লিবিয়ার এই একসময়ের প্রভাবশালী নেতার মৃত্যু হয়। আল-জাজিরার ভিডিওতে তখন দেখা গিয়েছিল, রক্তাক্ত গাদ্দাফির মরদেহ মাটিতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহীরা।

আরও পড়ুন: ব্রুকলিনের বন্দিশিবিরে নেওয়া হচ্ছে মাদুরোকে, খোঁজ নেই স্ত্রীর

এছাড়া ২০২২ সালের হন্ডুরাসের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। সে বছর ফেব্রুয়ারিতে হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হার্নান্দেজকে তার নিজ বাসভবন থেকে আটক করা হয়। সেই অভিযানে মার্কিন বাহিনীর পাশাপাশি হন্ডুরাস সেনাবাহিনীও অংশ নেয়। তবে হার্নান্দেজ সে সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন না; পদত্যাগের কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে আটক করা হয়। মাদক ব্যবসার অভিযোগে তাকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং দোষী সাব্যস্ত করে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তার পরিণতি সাদ্দাম বা নোরিয়েগার মতো হয়নি। গত ১ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশেষ ক্ষমতাবলে তাকে ক্ষমা করে দেন।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েক দিন ধরেই আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সম্পর্ক তীব্র টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে তেলের ট্যাঙ্কারের চলাচলের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ভেনেজুয়েলা সীমান্তে কোনও তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। সেই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা সরকারকে ‘জঙ্গি গোষ্ঠী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। মাদুরোর প্রেসিডেন্ট পদটির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ চুরি করে মাদক ব্যবসা ও জঙ্গি কার্যকলাপে অর্থায়ন করা হচ্ছে। যদিও ভেনেজুয়েলা এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে। এই পটভূমিতেই শনিবার মধ্যরাতে কারাকাসে মার্কিন হানা চালানো হয়। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পামেলা বন্ডি সরাসরি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন।

এখন প্রশ্ন—মাদুরো ও তার স্ত্রীর ভবিষ্যৎ কী? পামেলা বন্ডি জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই তাদের আমেরিকার বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। শনিবার সন্ধ্যায় (ভারতীয় সময়) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, মাদুরো দম্পতিকে যুদ্ধজাহাজে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন ফৌজদারি আইনে মামলা চলতে পারে। মার্কিন সিনেটর মাইক লি জানিয়েছেন, মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো নিশ্চিত করেছেন যে মাদুরো দম্পতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার কার্যক্রম শুরু করা হবে। শুধু মাদক পাচারের অভিযোগই নয়, দুর্নীতি ও অবৈধ সরকার পরিচালনার অভিযোগও আনা হয়েছে মাদুরোর বিরুদ্ধে।

তবে মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, সেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন সরকার গঠনের পথ তৈরি হতে পারে। একাংশের মতে, বিরোধী নেত্রী ও নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো হতে পারেন নতুন নেতৃত্বের মুখ। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত—যাকে পরাজিত করেই মাদুরো প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: আনন্দ বাজার, রয়র্টাস, বিবিসি বাংলা

‘ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ধরেছি’ পোস্ট দেয়া সেই ঢাবি ছাত্রশক্তির…
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
রোজা রাখতে অক্ষম ব্যক্তি কত টাকা ফিদইয়া দেবেন?
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
অপবিত্র অবস্থায় সেহরি খাওয়া যাবে কিনা?
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
দুই শর্ত মানলে শবে কদরের মর্যাদা পাবে মুমিন
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
ছয় ঘণ্টা পর ইসরায়েলে ফের মিসাইল ছুড়ল ইরান
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
ঈদের আগে-পরে ৬ দিন মহাসড়কে ট্রাক-লরি চলাচল বন্ধ
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
22 April, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081