জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মাদক সেবন করতে গেলে জাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. জাবেরসহ অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থীকে হাতেনাতে আটক করেন আবাসিক শিক্ষার্থী, © সংগৃহীত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছাত্রদল নেতা মো. জাবেরের নেতৃত্বে হলের ছাদে মদ ও গাঁজা সেবনের ঘটনায় ছয় মাস পার হলেও এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হাতেনাতে ধরা পড়া, ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ এবং অভিযুক্তদের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পরও বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ হলের বি ব্লকের ছাদে মাদকসেবনের একটি আসর বসানোর সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. জাবেরসহ অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থীকে হাতেনাতে আটক করেন আবাসিক শিক্ষার্থী, হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হলের ছাদে র্যাগিংয়ের খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, পানির ট্যাংকের ওপর বসে একটি দল বাংলা মদ, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য নিয়ে আসর বসিয়েছে। উপস্থিত প্রতিনিধিরা তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা মারমুখী হয়ে ওঠে এবং উপস্থিত শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে হুমকি দেয়। এমনকি ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক জাকসু প্রতিনিধিকেও ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনায় জড়িত হিসেবে শনাক্ত হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—আদিত্য (আইবিএ ৪৭), প্রথম (আইবিএ ৫১), জাবির (আইবিএ ৫১), তৌহিদ (আইবিএ ৫০), জিহাদ (আইবিএ ৫০), লাবিব (আইবিএ ৫২), সাখাওয়াত (আইবিএ ৫৩), রেজওয়ান (আইবিএ ৫১), নোমান (আইবিএ ৫০), প্রসেনজিৎ (আইবিএ ৫০) ও সামির (আইবিএ ৪৯)। এছাড়াও আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন, যাদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তদের মধ্যে অধিকাংশই ওই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন না; অন্য হল থেকে এসে মাদকসেবনে অংশ নেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে বিষয়টি জানানো হলে সংশ্লিষ্টদের পরিচয় ও ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করতে বলা হয়। পরে হল প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডির নির্দেশে মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয় এবং তা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী, মাদকসেবন ও শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো ঘটনায় দোষ প্রমাণিত হলে সতর্কীকরণ, সাময়িক বহিষ্কার বা স্থায়ী বহিষ্কার পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময়েও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
এবিষয়ে প্রক্টর অফিস সূত্রে জানা যায়, তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছিল শৃঙ্খলা কমিটির বোর্ডে। পরে শৃঙ্খলা কমিটি সিদ্ধান্তের জন্য সিন্ডিকেটে প্রেরণ করেছে।
এদিকে সিন্ডিকেট মেম্বার সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থী হওয়ায় তাদের সবাই আত্মপক্ষ সমর্থনের চিঠি যথাযথ ভাবে না পাওয়ায় পুনরায় আবার তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এবিষয়ে বর্তমান অগ্রগতির বিষয়ে কোন তথ্য দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল সংসদের ভিপি সিফাতুল্লাহ বলেন, ‘একটি বহুল আলোচিত ঘটনায় দীর্ঘদিন বিচারহীনতা চলতে থাকলে তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো ক্যাম্পাসে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
এবিষয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের আবাসিক শিক্ষক ও ওই ঘটনায় গঠিত হওয়া তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ঐ সময় আমরা তদন্তের একটা রিপোর্টে জমা দিয়েছিলাম তবে এখানে অনেকগুলো হলের শিক্ষার্থী থাকায় অধিককতর তদন্তের জন্য প্রক্টর অফিস থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রক্টর স্যার এ বিষয়ে বলতে পারবেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম বলেন, ‘আগামী রবিবার সিন্ডিকেট মিটিং রয়েছে। সেখানে বিষয়টি তোলা হবে। সভার সিদ্ধান্তের পর বিস্তারিত জানানো যাবে।’
এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানকে কল করলেও পাওয়া যায়নি ।