সংসদে কোরআনের আয়াত নিয়ে বিতর্ক
বিএনপির এমপি আলমগীর ফরিদ © ভিডিও থেকে নেওয়া
জাতীয় সংসদে পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত ও এর ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ একটি আয়াত তেলাওয়াত করে প্রস্তাবিত বাজেট ও প্রধানমন্ত্রীর শোকর আদায় না করায় বিরোধীদলকে কঠিন আজাবের সম্মুখীন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন। একে কোরআনের আয়াত নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।
আজ বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের ১৪তম দিনে এই ঘটনা ঘটে।
এ সময় প্রস্তাবিত বাজেটকে ঐতিহাসিক বাজেট উল্লেখ করে এমপি আলমগীর ফরিদ বলেন, বাজেট ঘোষণার পর দেশের মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছিল। খালি আমাদের ডান পাশের লোকগুলো (বিরোধীদল) কেন মিছিল করেছিল, জানতে পারিনি। আমাদের কাছে এসে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে, মন্ত্রীর কাছে বাজেট চাইবে, রাস্তায় গিয়ে মিছিল করবে— সেই কারণে আমি একটি কোরআনের আয়াত বলতে চাই।
তিনি সূরা ইব্রাহীমের ৭ নম্বর আয়াত ‘লা-ইন শাকারতুম লা-আযীদান্নাকুম ওয়া লা-ইন কাফারতুম ইন্না আজাবি লাশাদীদ’ (অর্থ— যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বেশি নিয়ামত দেব; আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, তবে জেনে রাখো আমার শাস্তি নিশ্চয়ই কঠিন) তেলাওয়াত করেন। এরপর বলেন, শোকর করতে হবে জীবনের, শোকর করতে হবে বরাদ্দের, শোকর করতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের, শোকর করতে হবে মন্ত্রীদের। তারা শোকর করে না, কিন্তু অস্বীকার করে— সে জন্য তাদের জন্য লাশাদীদুল আজাব, তাদের কঠিন আজাবের সম্মুখীন করতে হবে।
এরপর তিনি সূরা আলে-ইমরানের ৫৪ নম্বর আয়াত ‘ওয়া মাকারু ওয়া মাকারাল্লাহু, ওয়াল্লাহু খাইরুল মা-কিরীন (অর্থ— তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আল্লাহও কৌশল করেছিলেন; মূলত আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী) তেলাওয়াত করেন। বলেন, তোমরা বলেছ, তোমরা বুঝেছ, তোমরাই কৌশলী, আপনারাই কৌশলী। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, আমি শ্রেষ্ঠ কৌশলী। আর যারা আমার সাথে কৌশল খাটায়, তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।
এ সময় পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, কোরআন-হাদিসের আয়াত এবং রাসুল (স.)-এর বানী আছে, এগুলো ঠাট্টা-বিদ্রুপের বিষয় না। এটা নিয়ে যদি ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়, আসলেই দুঃখজনক। ওনাদের প্রশংসা করলে আরও বাড়িয়ে দিবেন, আর প্রশংসা না করলে আমাদেরকে পেটাবেন, এরকম বোঝানো হচ্ছে নাকি? এটি ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাসুল (স.)-এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
শাহবাগ আন্দোলনের সময়ের একটি উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময়ে কোরআন-হাদিস নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছিল। সে সময়ে আমরা একটি চিঠি নিয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীর কাছে আমরা গেলাম। তিনি বললেন, তোমরা এখানে সূরা তাওবার একটি আয়াত যোগ করতে পারো না— কুল আবিল্লাহি ওয়া আয়াতিহী ওয়া রাসূলিহী কুনতুম তাসতাহজিউন (হে নবী, আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলের সাথেই উপহাস করছিলে?), এটা যদি তোমরা করো তাহলে তোমাদের অবস্থান হবে জাহান্নামে।
তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পবিত্র কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে কীনা— তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা হয়ে থাকলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দাঁড়িয়ে এমপি আলমগীর ফরিদকে সমর্থন করে বলেন, বিরোধীদলের পক্ষ থেকে যখন অভিযোগ আকারে বা যে কোনো আকারে বলা হবে যে একজন সংসদ সদস্য কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি প্রথমেই বলি, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ একজন মাওলানা। মাদ্রাসা পাস। আমার পাশের সিট। তিনি অন্তত এই উদ্দেশ্যে এটা বলেননি।
তিনি বলেন, লা-ইন শাকারতুম লা-আযীদান্নাকুম ওয়া লা-ইন কাফারতুম ইন্না আজাবি লাশাদীদ, যেটা উনি বলেছেন, সেটা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন। আমরা যদি আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি, আল্লাহ আমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেবেন। যদি শুকরিয়া আদায় না করি, আল্লাহ আজাব বাড়িয়ে দিতে পারেন। এখন এটা পলিটিক্যালি কেন বক্তব্য হবে? এটা দিয়ে কেন পয়েন্ট অব অর্ডারে পাঠানো হবে? এটা ঠিক হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, উনি বলেছেন, সৎ উদ্দেশ্যেই বলেছেন, আমরা যেন আল্লাহর শোকর গুজার করি। এটাকে আমার মনে হয়, পলিটিক্যালি মিসইন্টারপ্রিট করা ঠিক হবে না। আমরা ৯২ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার দেশে কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য যদি ভুলক্রমেও ইসলামের প্রতি অবমাননামূলক হয়, এটা আমরা নিন্দা করব। কিন্তু এভাবে পলিটিক্যালি ইউজ করা ঠিক হবে না।