সহশিক্ষা কার্যক্রম গড়ে তোলে ‘পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন’

১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩১ PM
জয় পাল অর্ঘ

জয় পাল অর্ঘ © টিডিসি সম্পাদিত

কখনো কী ভেবেছেন বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী বের হয়, কিন্তু পরবর্তীতে কেন তারা ক্যারিয়ার ফিল্ডে আটকে যায়? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সাথে অন্যান্য উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে এত তফাত কেন? এর পিছনে কারণ অনেক।

আমরা যদি বাংলাদেশে বিভিন্ন পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নজর দিই তাহলে খুবই সাধারণ দৃশ্য দেখতে পাই। ক্লাসের পঠন-পাঠন শেষ হলেই শিক্ষার্থীরা বাসায় বা হলে ফিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাচ্ছে, কেউবা নোট মুখস্থ করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় অ্যাকাডেমিক সাফল্যকে কেন্দ্র করে এমন চাপ তৈরি হয়েছে যে, শিক্ষার্থীরা মনে করতে শুরু করেছে, ভালো সিজিপিএ-ই সব। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আজকের বৈশ্বিক চাকরির বাজার, গবেষণা ক্ষেত্র কিংবা উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব জায়গাতেই ডিগ্রির পাশাপাশি যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে– তা হলো: দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা। আর এখানেই সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তার কথা চলে আসে।

সহশিক্ষা কার্যক্রম এর মাধ্যমে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী, নিজের ব্যাক্তিত্ব এবং ভাবমূর্তিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারেন। যদি এক সংখ্যাটাকে একাডেমিক জীবন ধরা হয়, তাহলে এর পরে যতগুলো শূণ্য বসানো যাবে শিক্ষাজীবনে ততো বেশি অর্জন সম্ভব। এখানে এই শূণ্যগুলোই হচ্ছে বিভিন্ন নন-অ্যাকাডেমিক দক্ষতা অর্জন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেয়ালের বাইরে যে বাস্তবতা খুবই কঠিন। ক্লাসরুমে শেখানো হয় তত্ত্ব, পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা, লেকচারের নীতিমালা।

কিন্তু বাইরে অপেক্ষা করে আরেকটি পৃথক পৃথিবী, যেখানে প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, দলগত কাজ, কথাবার্তার দক্ষতা, মতবিরোধ সামলানোর ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং নিজের আত্মবিশ্বাস। বর্তমান সময়ের নিয়োগদাতারা তাই জোর দিচ্ছেন অভিজ্ঞতাভিত্তিক দক্ষতার ওপর। বহু প্রতিষ্ঠানই এখন বলছে, কাজ শেখানো যাবে, কিন্তু চরিত্র, পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্ব শেখানো যায় না, এগুলো নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আসে।

এখন প্রশ্ন হলো সেই অভিজ্ঞতা কোথায় তৈরি হবে? শুধু ক্লাসরুমে? নিশ্চয়ই কেবল ক্লাসরুমে নয়। ক্লাসরুমের বাইরের দক্ষতাগুলো নিজেকে নিজেরই আয়ত্তে আনতে হয়। সহশিক্ষা কার্যক্রম এখানে নেতৃত্বের স্কুল হিসেবে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাব-হোক বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিতর্ক ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, ফটোগ্রাফি, সি.আর.সি. অথবা বাঁধন-মূলত একেকটি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এখানে আছে পরিকল্পনা, বাজেট, আলোচনার টেবিল, সংকট, সমাধান এবং চাপ সামলে এগিয়ে যাওয়ার অনুশীলন।

একজন ক্লাব প্রেসিডেন্ট বা ইভেন্ট কো-অর্ডিনেটর যখন একটি প্রোগ্রাম সফলভাবে পরিচালনা করেন, তখন তার প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কোনো লেকচার থিয়েটারে শেখানো সম্ভব নয়। তিনি রপ্ত করেন মানুষকে সংগঠিত করা, সময় ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কোন পরিস্থিতিতে কোন সিদ্ধান্ত জরুরি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-বিশ্বাস তৈরি করা। এসব দক্ষতাই কর্মক্ষেত্রে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে এবং এগিয়ে রাখে।

যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি-আমাদের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা পড়াশোনায় অসাধারণ, তাদের সিজিপিএ অনেক ভালো। কিন্তু নিজের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক ভাইভায়, চাকরির সাক্ষাৎকারে, স্কলারশিপের ভাইভায়, বা কোনো যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে।

বিতর্ক, পাবলিক স্পিকিং, সেমিনার আয়োজন, প্যানেল ডিসকাশনে অংশগ্রহণ এসব কার্যক্রম যোগাযোগ দক্ষতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এগুলো শুধু কথা বলার শিক্ষা নয়, বরং যুক্তি গুছিয়ে বলা, ভাষার শুদ্ধতা বজায় রাখা এবং শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কৌশলও। এখনকার যুগে এটি শুধু একটি স্কিল নয়, বরং এটি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পাওয়ার ব্যাংক। নেটওয়ার্কিং, যা চাকরি বা উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দেয়, সেখানেও আমাদের রয়েছে দূর্বলতা।

অনেক শিক্ষার্থী এমন সুযোগের মুখোমুখি হয়, যা ক্লাসরুমের বাইরে থাকলে কখনো সম্ভব হতো না। সেমিনার, ওয়ার্কশপ, স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার, প্রতিযোগিতা এসব জায়গায় পরিচিত হওয়া মানুষই ভবিষ্যতে হতে পারে গবেষণা সুপারভাইজার, রেফারেন্স দাতা কিংবা চাকরির রিকমেন্ডার। কো-কারিকুলাম শিক্ষার্থীকে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সেই বাস্তব মঞ্চটি দেয়, যেখানে ভবিষ্যতের দরজাগুলো খুলে যায়। চাপ ব্যবস্থাপনা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস-যা ক্লাসরুম শেখাতে পারে না সেটাও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে রপ্ত করা যায়।

একটি ইভেন্ট আয়োজনের দিনটি সবসময় নিখুঁত হয় না। অতিথির দেরি, স্পন্সর জনিত সমস্যা, বাজেটের ঘাটতি, হঠাৎ প্রযুক্তিগত জটিলতা সবকিছু মিলিয়ে এটা একটা চ্যালেঞ্জ। যে শিক্ষার্থী এসব সামাল দিতে পারে, সে ভবিষ্যতে যেকোনো পেশাগত চাপ সামলাতে সক্ষম হয়। এ কারণেই অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে কো-কারিকুলাম বা সার্ভিস লার্নিংয়ে যুক্ত করে।

ডিগ্রি নয়-পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। শুধু সিজিপিএ-তে সীমাবদ্ধ থাকা শিক্ষার্থীরা যখন গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরির বাজারে নামে, তখন অনেকে বুঝতে পারে যে, ডিগ্রি আছে কিন্তু দক্ষতা নেই। এটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। অ্যাকাডেমিক এবং কো-কারিকুলাম এই দুই মিলেই তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাজীবন। তাই আমাদের প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর উচিত নিজের সিজিপিএ ঠিক রাখার পাশাপাশি বাকি দক্ষতা গুলো অর্জন করে নেওয়া। এখন সময়ের দাবি-অ্যাকাডেমিক এবং অ্যাক্টিভিটির সমন্বয়।

বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে একজন প্রার্থীর কাছে, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান যে গুণগুলো আশা করে তন্মধ্যে অন্যতম হলো: টিমওয়ার্ক, ক্রিটিক্যাল থিংকিং, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং নেটওয়ার্কিং। এই সবকিছুই কো-কারিকুলার কার্যক্রমের মাধ্যমে তৈরি হয়। ক্লাসরুম তা দিতে পারে না-তবে ভিত্তি গড়ে দেয়। আর সেই ভিত্তিকে শক্তিশালী করে অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব অনুশীলন। সবশেষে যদি বলতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানে কেবল ক্লাস, লেকচার ও সিজিপিএ নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সংজ্ঞা বদলে গেছে। এখন শিক্ষা শুধুই বইয়ের জ্ঞান নয়; বরং মানুষের সঙ্গে কাজ করা, সমাজকে বোঝা, নিজের সক্ষমতাকে বড় করে দেখা এবং চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে শেখা।

তাই সময় এসেছে ছাত্রদের নিজেদের কাছে এই প্রশ্ন তোলার ‘আমি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করছি, নাকি নিজেকে একজন দক্ষ মানুষ হিসেবে তৈরি করছি?’ যারা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে, তারা জানে যে, শুধু ক্লাসরুম নয় বরং এর সাথে সহশিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয় গড়ে তোলে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। তাই সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একজন শিক্ষার্থীর উচিত হবে, নিজের অ্যাকাডেমিক লাইফ ঠিক রাখার পাশাপাশি বাকি দক্ষতাগুলোও নিজের করে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শক্ত ভীত মজবুত করা।


লেখক: শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ,
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: jparghophr26@gmail.com

 

নির্বাচনে গুজব প্রতিরোধে সহযোগিতা করবে জাতিসংঘ
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
বহু নির্যাতন সহ্য করলেও খালেদা জিয়া কখনো অভিযোগ করেননি: বার…
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
ফের ছাত্রশিবির মেডিকেল জোনের সভাপতি ডা. যায়েদ, সেক্রেটারি ড…
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
আসছে নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম, নেতৃত্বে কারা ?
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
শৈত্যপ্রবাহ নিয়ে দুঃসংবাদ দিল আবহাওয়া অধিদপ্তর
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
শাকসু বন্ধ করার অপপ্রয়াস ছাত্র সমাজ মেনে নেবে না: ইসিকে ডাক…
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9