আতিকুর রহমান বাবু © টিডিসি ছবি
গত রবিবার (১৫ মার্চ) দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে কর্মরত ১৯ হাজার ৩৮১ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়েছে। মোট প্রায় ১০ কোটি টাকার এই সহায়তা সংশ্লিষ্ট মেয়র ও প্রশাসকদের মাধ্যমে কর্মীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নিঃসন্দেহে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চতুর্থ শ্রেণির এমন কর্মীদের প্রতি সরাসরি সহানুভূতি ও স্বীকৃতির এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই উদ্যোগের পরিধি কেন এত সীমিত?
পরিচ্ছন্নতা কর্মী কি কেবল সিটি করপোরেশনেই সীমাবদ্ধ? দেশের ৩৩০টি পৌরসভায় আনুমানিক ২০ হাজার, ৪,৫৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদে আরও আনুমানিক দশ হাজারের বেশি, এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বন্দর ও ঘাটসহ নানা সরকার ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য পরিচ্ছন্নতা কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাইরে রেখে কেবল সিটি করপোরেশনের কর্মীদের জন্যই এই সহায়তা বরাদ্দ করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, বেতন ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকেও সিটি করপোরেশনের কর্মীরাই তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
তাহলে এই নির্বাচন কি নিছক মানবিক বিবেচনায়, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো হিসাব? রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রায় ১৮ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি এমন এক নির্বাচনে জয় পেয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছিল না। সহজ জয় মনে হলেও, বাস্তবে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। ভোটের ব্যবধানও ছিল তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি। একই সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্ররাজনীতিতে শিবিরের কারণে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এছাড়া বিএনপির মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজকর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার-প্রসার ও ন্যারেটিভে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে বিএনপি।
এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন, হতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। ধারণা করা হচ্ছে, এই নির্বাচনে বিএনপিকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হতে পারে। বিরোধী দলগুলো তাদের হেভিওয়েট প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ফলে কয়েকটি সিটি করপোরেশন হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এমন বাস্তবতায়, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের এই আর্থিক সহায়তা কি কেবল কল্যাণমূলক উদ্যোগ, নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বিনিয়োগ? কারণ, এই প্রায় ২০ হাজার কর্মী শুধু উপকারভোগীই নন, বরং তারা প্রত্যেকে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের ভোটার এবং সমাজের নিম্ন আয়ের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। শহরাঞ্চলে নিম্ন আয়ের মানুষরা সাধারণত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে সামাজিক প্রভাব ও মতামত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি ছোট সুবিধাও তাদের কাছে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যা ভোটের আচরণে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি যেখানে প্রার্থী, নীতি ও পারফরম্যান্স বিবেচনায় ভোট দেয়, সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের একটি অংশ অনেক সময় সরাসরি প্রাপ্ত সুবিধার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এই সহায়তা শুধু ব্যক্তিগত উপকারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সামাজিকভাবে প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সেই হিসেবে, প্রায় ১০ কোটি টাকার এই উদ্যোগকে নিছক অনুদান না দেখে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগও তৈরি হয়। অতএব, এই উদ্যোগের মানবিক দিক যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা অমূলক নয়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কল্যাণমূলক পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক কৌশল অনেক সময় একই সুতোয় গাঁথা থাকে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি