সরকারের প্রতিশ্রুতি ও শিক্ষা বাজেট

২০ মে ২০২৬, ০১:২৯ PM
আব্দুল্লাহ যোবায়ের

আব্দুল্লাহ যোবায়ের © সংগৃহীত

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্নে শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল শক্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশে শিক্ষা খাত কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি। বিভিন্ন সরকার শিক্ষাবান্ধব প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব বাজেট, সুশাসন ও কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি সেই অঙ্গীকারকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

বর্তমান জাতীয়তাবাদী সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং শিক্ষায় ৪৩টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ধারণ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ শিক্ষা নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। 

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে শিক্ষা খাতে ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয় করা প্রয়োজন, সেখানে এই বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল।
সরকারকে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা যেমন প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য, তেমনি সকল কাজে জবাবদেহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সরকারের প্রকৃত অগ্রাধিকার তার বক্তব্যে নয়, তার বাজেটে প্রতিফলিত হয়। শিক্ষা যদি সত্যিই জাতীয় অগ্রাধিকার হয়, তবে তার প্রতিফলন হতে হবে বরাদ্দ, সংস্কার ও বাস্তবায়নে।

গত কয়েক দশকে শিক্ষা বাজেটের ক্রমহ্রাসমান হার গভীর উদ্বেগের বিষয়। ২০১৮ সালে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২১ সালে ২ দশমিক ০৯ এবং ২০২৩ সালে নেমে আসে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশে। এই পতন শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি জাতির অগ্রাধিকারের বিচ্যুতির প্রতীক। বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে শিক্ষা খাত দলীয়করণ, দুর্নীতি ও অদূরদর্শিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এখন প্রয়োজন সাহসী, বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।

প্রথমত, আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমপক্ষে জিডিপির ৪ শতাংশে উন্নীত করার একটি সুস্পষ্ট ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে এবং পরবর্তী দুই অর্থবছরের মধ্যে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বড় বড় ভবন নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান বাড়ে না; শিক্ষার প্রাণ হলো দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক। তাই সকল স্তরের শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, আকর্ষণীয় পদোন্নতি কাঠামো, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। যদি মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে চাই, তবে শিক্ষকতাকে একটি সম্মানজনক ও প্রতিযোগিতামূলক পেশায় পরিণত করতে হবে।

একইসাথে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বন্ধ করতে হবে। গত দেড় দশকে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং শিক্ষা অধিদপ্তরগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। “কোটা না মেধা, মেধা, মেধা”—এই সামাজিক আকাঙ্ক্ষা শিক্ষাক্ষেত্রেও বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন স্বাধীন ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, কার্যকর মূল্যায়ন কাঠামো এবং শক্তিশালী জবাবদিহিতা। শিক্ষা প্রশাসনকে দলীয় আনুগত্যের জায়গা নয়, বরং পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, শিক্ষকদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে অবকাঠামোর তুলনায় শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ অত্যন্ত কম। ফলে শিক্ষার্থীরা দক্ষতাভিত্তিক ও সৃজনশীল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পেশাগত উন্নয়ন (CPD), আধুনিক ডিজিটাল প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিক্ষক বিনিময় কর্মসূচি এবং গবেষণাভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের এমন শিক্ষক প্রয়োজন, যারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা গড়ে তুলতে সক্ষম।

চতুর্থত, শিক্ষাক্রমে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত পরীক্ষানির্ভর এবং বাস্তবজীবনবিচ্ছিন্ন। ফলে দেশের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পেও বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে আউটকাম ও দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম  প্রণয়ন জরুরি। নতুন প্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান, উদ্যোক্তা মানসিকতা, হাতে-কলমে দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে শিক্ষার মূলধারায় আনতে হবে। মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা হতে হবে কর্মমুখী ও জীবনমুখী।

পঞ্চমত, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠন সম্ভব নয়। পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা ভাতা, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাকাল্টি বিনিময় কার্যক্রম চালু করতে হবে। পাশাপাশি দেশের কয়েকটি পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে ধাপে ধাপে “রিসার্চ ইউনিভার্সিটি” হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

উচ্চশিক্ষায় আরেকটি বড় সংকট হলো আবাসন সমস্যা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেক শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়, যা তাদের শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নতুন হল নির্মাণ, বিদ্যমান আবাসিক হল সংস্কার, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আবাসন এবং স্বল্পব্যয়ে শিক্ষার্থী হাউজিং প্রকল্প চালু করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ক্লাসরুম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ও মানবিক পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে।

ষষ্ঠত, শিক্ষাঙ্গনে সুশাসন ও একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হওয়ার বদলে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সহিংসতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছে। ভিসি ও প্রোভিসি নিয়োগে দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে মেধা, গবেষণা ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং গবেষণা ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।

সপ্তমত, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নকে আরও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মমুখী দক্ষতার সমন্বয় জরুরি। প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল এবং প্রতিটি জেলায় আধুনিক পলিটেকনিক স্থাপনের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব দক্ষতা অর্জন করে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে।

অষ্টমত, দুর্গম অঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। দেশের বহু শিশু এখনও বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারে না যোগাযোগ সমস্যা, শিক্ষক সংকট ও দারিদ্র্যের কারণে। এসব অঞ্চলে আবাসিক স্কুল, ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা, মোবাইল শিক্ষকতা কার্যক্রম, বিশেষ ভাতা ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। শিক্ষা যেন ভৌগোলিক বৈষম্যের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

নবমত, ভাষা শিক্ষা ও বৈশ্বিক দক্ষতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, মান্দারিনসহ আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ভাষাগত দক্ষতা অপরিহার্য। এজন্য জাতীয়ভাবে ভাষা দক্ষতা যাচাই ও আন্তর্জাতিক মানের সনদ প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দশমত, শিক্ষায় সমতা, পুষ্টি ও শিক্ষার্থী সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের বিনামূল্যে ইউনিফর্ম ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের খাবার ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে এই কর্মসূচি প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সহায়ক হয়।

সবশেষে, শিক্ষা খাতে প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নের নামে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং জনগণের করের অর্থের পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যে আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন সম্ভাবনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো শিক্ষা। তাই সরকারের প্রতি আহ্বান, প্রতিশ্রুতি যেন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা যেন বাজেট, নীতি ও বাস্তবায়নে প্রতিফলিত হয়। কারণ শিক্ষা নিয়ে আপস মানে জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে আপস।

আব্দুল্লাহ যোবায়ের 
শিক্ষক ও গবেষক

৭৬ জন থেকে পৌনে ৩ লাখ, ২৫ বছরে জিপিএ-৫ এর উত্থান-পতন
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটির হাতে গেলে ৬ লাখ শিক্ষক…
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
চলতি বছরে এসএসসি ফল প্রকাশে ভাঙছে ২০ বছরের রেকর্ড
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের…
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
এসএসসির ফল প্রকাশ সকাল ১০টায়, জানা যাবে তিন উপায়ে
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
অশ্রুসিক্ত চোখে বাবাকে শেষ বিদায় জানালেন মেসি
  • ১০ আগস্ট ২০২৬