বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা: ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা

১৩ মে ২০২৬, ০৬:২২ PM
ড. জিয়াউর রহমান

ড. জিয়াউর রহমান © সংগৃহীত

উদ্ভাবনমুখী বিজ্ঞানচর্চায় বাংলাদেশের নাম বিশ্বদরবারে পরিচিত করতে যেসব বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, বিজ্ঞান-অনুরাগী, রাজনীতিবিদ ও বিজ্ঞানমনস্ক সাহিত্যিক যুগে যুগে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন, তাঁদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। একইসঙ্গে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ সকল ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ও আত্মোৎসর্গকারী বীর সন্তানদের, যাঁদের সাহস, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ।

মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিজ্ঞান সবসময়ই জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা অব্যাহতভাবে চলে আসছে। কণাদ, বৌধায়ন, সুশ্রুত, আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, মহাবীর, বরাহমিহির এবং দ্বিতীয় ভাস্কর প্রমুখ পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় অসামান্য অবদান রেখে বিশ্বসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। শূন্যের ব্যবহার, দশমিক পদ্ধতির ব্যবহার, গ্রহের গতি নির্ণয়সহ নানাবিধ গবেষণা মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

মধ্যযুগে মুসলিম শাসকরাও বিজ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করেন। হুমায়ুন দিল্লিতে মানমন্দির স্থাপনের উদ্যোগ নেন, যা মির্জা উলুগ বেগ-এর জ্যোতির্বিদ্যা গবেষণায় অনুপ্রাণিত ছিল। তাজমহল, লাল কেল্লা ও হুমায়ুনের সমাধির মতো স্থাপনাগুলোর নির্মাণে উন্নত জ্যামিতি, স্থাপত্যবিদ্যা ও পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার প্রয়োগ দেখা যায়। একইভাবে শালিমার গার্ডেন ও তাজমহলের জলব্যবস্থাপনায় হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উৎকৃষ্ট ব্যবহার সেই সময়ের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সাক্ষ্য বহন করে।

ঐতিহাসিকভাবে মুঘল আমলে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। সুবাহ বাংলা ছিল সেই অর্থনৈতিক শক্তির প্রাণকেন্দ্র। ফরাসি পরিব্রাজক ফ্রেনকোস বারনিয়ার এর বিবরণে উঠে এসেছে, মুঘল সাম্রাজ্যের বিপুল আয়ের একটি বড় অংশই আসত বাংলা থেকে। বাংলার মসলিন, জামদানি, কৃষি ও আদি শিল্প ইউরোপীয় বণিকদের আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বাংলার শিল্প, অর্থনীতি ও জ্ঞানচর্চাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর শোষণমূলক নীতির ফলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। তবে প্রতিকূলতা কখনোই এ অঞ্চলের মানুষের জ্ঞানচর্চাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে অনস্বীকার্য। আল বাত্তানী সৌর বছরের দৈর্ঘ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ণয় করেন।  গিয়াসউদ্দিন জামশেদ পাই-এর মান দশমিকের পর বহু ঘর পর্যন্ত নির্ণয় করেন। আব্বাস ইবনে ফিরনাস উড্ডয়নের প্রাথমিক প্রচেষ্টা চালান এবং জাবির ইবনে হাইয়ান রসায়ন বিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে ইউরোপে তাঁদের বহু গ্রন্থ অনূদিত হয় এবং আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশে সেগুলো গভীর প্রভাব ফেলে।

বাংলার বিজ্ঞানীরাও বিশ্ববিজ্ঞানে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। জগদীশ চন্দ্র বসু বেতার তরঙ্গ ও উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করেন।প্রফুল্ল চন্দ্র রায় আধুনিক রসায়ন গবেষণার পথিকৃৎ হিসেবে বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠা করেন। সত্যন্দ্রনাথ বসু এর গবেষণা ‘বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান’ ও ‘বোসন’ ধারণার জন্ম দেয়, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। মেঘনাদ সাহার ‘সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ’ নক্ষত্র বিশ্লেষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

স্বাধীন বাংলাদেশেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থেমে নেই। শাহ এম ফারুক কলেরা জীবাণুর কার্যপ্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে পাটের জিনোম উন্মোচিত হয়, যা কৃষি ও বায়োটেকনোলজিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। ফজলুর রহমান খান ‘টিউব স্ট্রাকচার’ ধারণার মাধ্যমে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণে বিপ্লব ঘটান। মুবারক আহমদ খান পাট থেকে পরিবেশবান্ধব ‘সোনালি ব্যাগ’ উদ্ভাবন করে প্লাস্টিক দূষণ রোধে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। জামাল নজরুল ইসলাম মহাবিশ্ব, ব্ল্যাক হোল ও কসমোলজি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। শাল খানের খান অ্যাকাডেমি বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল শিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে, আর জাওয়াদ করীম-এর সহ-প্রতিষ্ঠিত ইউটিউব জ্ঞান ও সৃজনশীলতার বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

আজকের তরুণ প্রজন্মও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করছে। আহমদ জাওয়াদ চৌধুরী বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। একইভাবে আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আইসিপিসি-তে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এসব অর্জন প্রমাণ করে— বাংলাদেশের তরুণ সমাজ মেধা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বিশ্বমানের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও গবেষণাভিত্তিক আয়োজনগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটায়। এসব আয়োজন তরুণদের বাস্তব জীবনের সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করে এবং গবেষণার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। বিজ্ঞান ও গণিতের সমন্বিত চর্চা শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায় এবং জ্ঞানকে আরও কার্যকর করে তোলে।

তবে বিজ্ঞানচর্চা কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সত্যনিষ্ঠা, সততা, দলগত কাজের মানসিকতা, অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবকল্যাণের চিন্তা একজন প্রকৃত বিজ্ঞানীর অন্যতম গুণ। বিজ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সমাজকল্যাণে ব্যবহৃত হয়।

অতএব, বিজ্ঞান মেলা শুধু প্রকল্প প্রদর্শনের একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের উচিত বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করা, নিয়মিত অধ্যয়ন ও গবেষণায় মনোনিবেশ করা এবং মানবকল্যাণের আদর্শ ধারণ করে ভবিষ্যতে দেশ ও বিশ্বের উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। উদ্ভাবনভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে।

ড. জিয়াউর রহমান, অধ্যাপক, ইনফেকশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষকের মারধরে জ্ঞান হারাল ছাত্র, বাড়িতে জানালে পরীক্ষায় ফ…
  • ১৩ মে ২০২৬
শিক্ষকদের বকেয়া বেতন নিয়ে চিঠি, যা বলছে মন্ত্রণালয়
  • ১৩ মে ২০২৬
যে উপাচার্যের প্রশাসন নেই
  • ১৩ মে ২০২৬
তারকা ফুটবলারকে ছাড়াই বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা সুইডেনের
  • ১৩ মে ২০২৬
অপরিপক্ক আম বিক্রির হিড়িক: বাইরে চকচকে খোসা, ভেতরে কাঁচা
  • ১৩ মে ২০২৬
চার শতাধিক চিকিৎসককে নিয়ে এলএসবির ম্যারাথন
  • ১৩ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9