এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

২৬ মে ২০২৬, ১১:৪৮ AM , আপডেট: ২৬ মে ২০২৬, ১২:০৮ PM
নাজমুল হাসান গোলজার, সহকারী অধ্যাপক

নাজমুল হাসান গোলজার, সহকারী অধ্যাপক © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

আমাদের সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটাই প্রধানতম উদ্দেশ্য, জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। এজন্য প্রয়োজন যথোপযুক্ত ও আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানব সমাজকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রকৃত দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যে প্রতিষ্ঠান হবে সমাজ ও জাতির অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অপসংস্কৃতি, অন্যায্যতা, অনধিকার, অনগ্রসরতার ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে অত্যুজ্জ্বল প্রভার জ্যোতি বিচ্ছুরণ করা এবং শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড হিসেবে সমাজকে তার প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে জাতিকে উন্নয়নের শিখরে প্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। আর এই আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চালিকা শক্তিই হচ্ছেন না আদর্শ শিক্ষক। আদর্শ শিক্ষকই জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারেন।

আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই ধরনের। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ও আদর্শ একই, জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সহ বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষাসংক্রান্ত সকল নিয়ম-নীতি, পরিপত্র, বিধি-বিধান, আদেশ, নির্দেশ ও নীতিমালা অনুসরণ করে শিক্ষা কর্মকাণ্ড যথাযথ পালন করছে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি থাকলেও কার্যত এখন এ ধরনের কমিটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির নামে ক্ষেত্র বিশেষে দায়িত্বপ্রাপ্তদের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। যদিও কমিটি প্রথার শুরুই হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় জমি, শিক্ষকদের বেতন ভাতা সহ অন্যান্য সব নিশ্চিত করা। দানশীলরাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানাতেন আর তারাই পরিচালনা করতেন; কিন্তু আয় ছাড়াও গত প্রায় ২ দশক ধরে এক শ্রেণির আমলা ও রাজনীতিকের প্রভাব নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই কমিটিকে। কমিটির সভাপতির হাতে শিক্ষকরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও বহু ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক সময় বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকরা সরকারের কাছ থেকে কোনো বেতন পেতেন না। পরবর্তী সময়ে এমপিও প্রথা চালুর মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা পাওয়া শুরু করেন। একই সাথে নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে টিউশন ফি-সহ অন্যান্য খাতের আয় দিয়েও তাদের বেতন-ভাতা নেওয়া অব্যাহত থাকে, যা প্রতিষ্ঠান অংশের বেতন নামে প্রচলিত রয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের আয় সমান নয়। প্রতিষ্ঠানের আয় কোষাগারে জমা দেওয়ার শর্তে, ২০০৬ সালের আগস্ট মাস থেকে সরকার কোষাগার থেকে মূল বেতন স্কেলের শতভাগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরিচালনা কমিটি, মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমিতির শিক্ষক নেতাদের বিরোধিতায় প্রতিষ্ঠানের আয় কোষাগারে জমার বিধান বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। পরে ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার শতভাগ বেতন-ভাতা কোষাগার থেকে দেওয়া শুরু করে।

শুধু বেতন-ভাতা নয়, মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের খরচই বহন করে সরকার। শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বই থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের চেয়ার টেবিল, বেঞ্চসহ আসবাবপত্র, শিক্ষা উপকরণ, নতুন নতুন ভবন তৈরি, পুরাতন ভবন সংস্কার, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের খরচ সবই বহন করে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের সিংহভাগই ব্যয় হয় এসব খাতে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে অযাচিত খবরদারির দায়িত্ব পরিচালনা কমিটির হাতে, সরকারি অর্থে প্রতিষ্ঠানের সবকিছু চললেও সরকারের হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নেই। শিক্ষাবিদরা বলছেন, যখন সরকার পুরো বেতন-ভাতা দিত না তখন শিক্ষকদের বেতনের টাকা সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য কমিটির দরকার ছিল। যেহেতু বর্তমানে বেতন ভাতা সহ সকল সুযোগ-সুবিধা সরকার দিচ্ছে, সেহেতু কমিটির কোনো প্রয়োজন নেই। 

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি রোধ ও স্বচ্ছতা আনতে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিংবডির শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা খর্ব করে তা এনটিআরসিএ ও জেলা প্রশাসক এর অধীনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ২০১৫ সালের এক পরিপত্র জারির মাধ্যমে এন্ট্রি লেভেল শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয় এনটিআরসিএ-কে। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ প্রধান পদে সরাসরি নিয়োগ বা সুপারিশ প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ওপর। যার প্রেক্ষিতে চলতি মাসে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ প্রধানদের লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন শিক্ষক নিয়োগ সংস্থা এনটিআরসিএ। সেই সাথে অতি অল্প সময়ের মধ্যে অতি স্বচ্ছতায় লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে এনটিআরসিএ। সম্মানিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ প্রধান যারা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, সকলেই ভাইভা পরীক্ষার জন্য অধীর আগ্রহে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ক্ষমতা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে ডিসির নেতৃত্বে গঠিত ৫ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ ও নিয়োগ প্রদানের বিধান করা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশিকা জারি করেছে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এখন ইএফটি এর মাধ্যমে সরাসরি তাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। এই ডিজিটাল পদ্ধতির ফলে প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন চলে আসায় জটিলতা ও ভোগান্তি কমেছে এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে। আগে এমপিও শিট ব্যাংক পর্যন্ত পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগতো এবং শিক্ষকদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হতো, যা এখন পুরোপুরি দূর হয়েছে। সনাতন পদ্ধতিতে বেতন ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে এমপিও শিটে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির স্বাক্ষর ছিল আবশ্যক; যতক্ষণ পর্যন্ত শিটে সভাপতি স্বাক্ষর না দিতেন ততক্ষণ পর্যন্ত বেতন-ভাতা ছাড় হতো না। ইএফটি চালু হওয়ায় এখন আর এ ধরনের ভোগান্তি শিক্ষক কর্মচারীদের পোহাতে হয় না।

প্রথমে ১৯৭৭ সালের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়, যা সর্বশেষ সংশোধন করা হয় ২০০৯ সালে। প্রবিধান অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির ১৬টি দায়িত্ব পালনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রদান নিশ্চিত করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে বর্তমানে অধিকাংশ পরিচালনা পর্ষদই এসব কাজের একটিও করে না। বরং প্রতিষ্ঠানে ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে বিভিন্ন নামে টাকা লুটপাট করে তহবিল শূন্য করার উদাহরণ রয়েছে। সংস্কারের কোনো কাজ না করেই টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়। 

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর। এই অধিদপ্তরের ৩০টি তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এর মধ্যে ২৮টি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের মূল কারণ গভর্নিংবডি বা ম্যানেজিং কমিটি। ঐ কমিটি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা পর্যন্ত নিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

যেহেতু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেন সরকার, নিয়োগ পরবর্তী সকল ধরনের ভাতা ও বেতন দেন সরকার, এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করেন সরকার। সেহেতু এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির কাজ কি?

সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কমিটি ছাড়া পরিচালিত হতে পারলে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো সরকারের টাকায় পরিচালিত হতে কোনো কমিটির প্রয়োজন আছে কি? দেশের স্বনামধন্য বড় বড় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে চলছে, সেই একই নিয়মে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চলতে পারে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সময়ের দাবি। তাই সময় এসেছে ভেবে দেখার বেসরকারি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে আদৌ ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা।

নাজমুল হাসান গোলজার
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
তেঁতুলঝোড়া কলেজ, সাভার, ঢাকা।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকার পাশের জেলায়, গভীরতা ১০ কিলোমিট…
  • ২৬ মে ২০২৬
ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকা
  • ২৬ মে ২০২৬
আনচেলত্তির অভিজ্ঞতায় বিশ্বমঞ্চে পুনরুত্থানের স্বপ্ন ব্রাজিল…
  • ২৬ মে ২০২৬
বাবাকে হারিয়েও থামেনি স্বপ্ন, স্কুল-কলেজের পর একই বিশ্ববিদ্…
  • ২৬ মে ২০২৬
ক্লাসরুম থেকে ফাইভ স্টার হোটেল: বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই হো…
  • ২৬ মে ২০২৬
ঈদের দিন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে পদযাত্রা করবেন শিক্ষ…
  • ২৬ মে ২০২৬