মাসুদ রানা পাটোয়ারী © টিডিসি ফটো
মালয়েশিয়া আর চীন সফর দিয়ে শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফর। সাম্প্রতিক দুই দেশের সফর বাংলাদেশের কূটনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বিএনপি সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে পরিচালিত এই সফরে জনশক্তি রপ্তানি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রযুক্তি, তরুণদের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলপ্রসূ এই সফরে সরকারের প্রত্যাশা, এই দুই সফরের ফলাফল বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
মালয়েশিয়া সফর: শ্রমবাজার, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্র। বর্তমানে সেখানে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সরকারিভাবে বা কম খরচে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ৩৩ দফার যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো দক্ষ খাতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে, যা ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সফরের অন্যতম অর্জন হলো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে অগ্রগতি। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও কৃষিপণ্য মালয়েশিয়ার বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান পাবে এবং রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। এ সময় দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়। উচ্চশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে।
প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিল্পখাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের জন্য মালয়েশিয়ার প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাস, আজিয়াটা ও এয়ারএশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, বিমান পরিবহন ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যবসায়িক মহলের ধারণা, এর মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে।
চীন সফর: বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কৌশলগত সহযোগিতা
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যান। সফরে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে কূটনীতিক সহায়তা বৃদ্ধির জন্য নানামুখী আলোচনা করেন৷ নতুন চুক্তি, উন্নয়ন সহযোগীতাসহ রাষ্ট্রকে আধুনিয়ান করতে চীন সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
সফরের শুরুতে তিনি দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। পরে বেইজিংয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সফরে দুই দেশের মধ্যে দুটি চুক্তি, ১৩টি সমঝোতা স্মারকসহ মোট ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ এ সফর থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা, সহজ শর্তের ঋণ ও অনুদানের প্রত্যাশা করছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়নসহ একাধিক মেগা প্রকল্পে অর্থায়নের অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বেইজিংয়ে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন এবং চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন।
কৃষি, শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংবাদ ও তথ্য বিনিময়সহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে। আলোচনায় তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য ২৪টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার বিষয়েও আলোচনা এগিয়েছে।
অর্থনীতি ও কূটনীতিতে সম্ভাবনার নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে চীন সফর। সরকারের মূল্যায়নে, মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে চীন সফর দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং শিল্পায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম এই বৈদেশিক সফরের ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ ও কৌশলগত গুরুত্বও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারের আশা, সফরের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৪২ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক গতিশীলতা সৃষ্টি হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ।