মোহন খোন্দকার © টিডিসি ছবি
শিক্ষকের মূল দায়িত্ব ছাত্রকে জ্ঞানের রস আস্বাদনে সাহায্য করা। তাকে সঠিক ও সুন্দরের পথ দেখানো। শিক্ষককে এজন্যই বলা হয় জাতির নির্মাতা। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। আজ শিক্ষককে দেখি রাজনীতির মাঠে; কখনোবা কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন অথবা তাদের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন। এজন্যই শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক বর্তমানে রাজনৈতিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। আমরা এটা কি আশা করেছিলাম?
যে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, জ্ঞান অন্বেষণমূলক সংগঠন থাকার কথা ছিল, তা এখন রাজনীতির আখড়াখানা বলা চলে। আমরা বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা শিক্ষক রাজনীতির জন্য বিভিন্ন সংগঠন কি প্রমাণ করে না, বাঙালি শিক্ষা নয়, রাজনীতি-প্রিয় জাতিতে পরিণত হচ্ছে? আর তা গড়ার মূল কারিগর আমরা। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনীতির এক একটা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যে শিক্ষক একাডেমিক রিসার্চ, থিসিসের মাধ্যমে একটি দেশের সমস্যা, সমস্যার প্রতিকারে পলিসি মেকিং করবে, তাকে আজ দেখা যায় রাজনীতির মাঝে। এরকম হলে একটা জাতি কি করে উন্নতি লাভ করতে পারে?
বর্তমানে আমরা শিক্ষককে নানাভাবে লাঞ্ছিত হতে দেখি। তার পিছনের কারণ অনুসন্ধান করলে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে শিক্ষক রাজনীতি। আপনি যদি দেখেন, একজন শিক্ষক যখন রাজনীতিতে যুক্ত হয়, তখন তাকে অবশ্যাম্ভী তার দল বা রাজনৈতিক ইস্যুকে প্রধান্য দিতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো, কেন দিতে হয়? আসলে আপনি কোনো একটা দলের মতাদর্শী হলে আপনাকে তার কথা শুনতে হবে বা চলতে হবে; অথবা নিজ জীবনের বিপর্যয় আবশ্যাম্ভী।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অনেক শিক্ষককে হয়তো তার রাজনৈতিক দল করার কারণে সরকারের পক্ষে কথা বলতে হয়েছে। যার ফলে, তাদের যদিও ভালো গুণ থাকুক বা সে যদিও শিক্ষার্থীবান্ধব হন, তবুও সে জেন জি বর্তমান প্রজন্মের সামনে মুখ দেখাতে পারছে না; তাকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো একজন শিক্ষক হারানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ছোবলে আক্রান্ত। এখানে মূল ফ্যাক্টর কি? এটি শিক্ষক রাজনীতি। আজ শিক্ষক রাজনীতি শিক্ষকের নিজ সম্মান বিসর্জনের জন্য দায়ী, এবং তা শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও রাষ্ট্রের চরম ক্ষতি করছে।
উন্নত বিশ্বে শিক্ষক রাজনীতি বলতে বোঝায় শিক্ষা, শিক্ষকতা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক। যেখানে শিক্ষকরা শ্রমিক সংগঠন, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান, সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং শিক্ষা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে শিক্ষক রাজনীতি মানে নিজের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা, নিজের প্রভাব বজায় রাখে, ক্যাম্পাসে নিজ দলীয় ব্যক্তিবর্গদের সার্বিক উন্নয়নে সাহায্য করা।
২০২৪-এর আন্দোলনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ কলেজের প্রধানরা পদত্যাগ করেছেন। এর কারণ কি স্পষ্ট করে না শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতির ছোবল? একজন শিক্ষক, যে শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছে ভালো কাজের, আজ সে জাতির কাঠগড়ায়। অন্যদিকে, শিক্ষক রাজনীতির ফলে অনেক শিক্ষক তাদের প্রাপ্ত প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এরই সাথে একাডেমিক যে শিক্ষা পরিবেশ, তা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সো, আমরা বলতে পারি, "Political awareness is necessary, but political dependence is harmful."
আমরা যদি বাইরের দেশগুলোতে দেখি, শিক্ষককে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়। এর কারণ কি হতে পারে? একটা দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বা উচ্চ পদস্থ কর্মকতা সবাই কিন্তু কোনো না কোনো শিক্ষকেরই শিক্ষার্থী। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমাদের দেশে একজন শিক্ষক নিজ দায়িত্ব ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে যার ফলে শিক্ষার্থীরা এ সকল শিক্ষকদেরকে ব্যায়াস্ট হিসেবে ধরছেন। এবং তারা অসম্মানিত হচ্ছেন।
ইংরেজি এক রিসার্চ পেপার থেকে নেওয়া জন ম্যাকোলোর মতে, ‘শিক্ষক ইউনিয়ন (বা বিকল্পভাবে ‘শিক্ষা ইউনিয়ন’) হলো শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষা কর্মীদের সম্মিলিত স্বার্থ রক্ষা ও অগ্রগতির জন্য গঠিত সংগঠন।’ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যে শিক্ষক ইউনিয়ন রয়েছে, তারা শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে থাকে। এদিকে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমরা উন্নত বিশ্বের লেখাপড়ার ধরণকে কপি করতে প্রস্তুত, তবে তাদের একটি ভালো গুণ আমরা মেনে নিতে প্রস্তুত নই।
উন্নত বিশ্বে শিক্ষক রাজনীতি বলতে বোঝায় শিক্ষা, শিক্ষকতা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক। যেখানে শিক্ষকরা শ্রমিক সংগঠন, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান, সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং শিক্ষা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। (Özdemir, 2018; Ginsburg, 1997; Myers, 2009)। অন্যদিকে, বাংলাদেশে শিক্ষক রাজনীতি মানে নিজের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা, নিজের প্রভাব বজায় রাখে, ক্যাম্পাসে নিজ দলীয় ব্যক্তিবর্গদের সার্বিক উন্নয়নে সাহায্য করা।
ম্যাকোলোর মতে, ‘শিক্ষক ইউনিয়ন (বা বিকল্পভাবে ‘শিক্ষা ইউনিয়ন’) হলো শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষা কর্মীদের সম্মিলিত স্বার্থ রক্ষা ও অগ্রগতির জন্য গঠিত সংগঠন।’ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যে শিক্ষক ইউনিয়ন রয়েছে, তারা শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে থাকে।
অন্যদিকে, একাডেমিক স্বাধীনতা বলতে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক চাপ বা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই গবেষণা, শিক্ষা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বোঝায় (American Academy of Arts and Sciences, 2023)। উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হলো সমালোচনামূলক চিন্তা (critical thinking), নাগরিক সচেতনতা এবং স্বাধীন মত প্রকাশের বিকাশ (MIT University, 2021)।
সুন্দর শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস গড়তে ক্যাম্পাসে শিক্ষক রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। একইসাথে কোনো শিক্ষকের পলিটিকাল আইডওলজি থাকলেও, তা যেন শিক্ষাকে প্রভাবিত না করতে পারে, সেদিকে মনিটরিং ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষকের যোগ্যতা যাচাই করা উচিত, যেমন তার প্রকাশনা, রিসার্চ এবং একাডেমিক দক্ষতা। বিশ্ববিদ্যালয় যদি জ্ঞানের মুক্ত মঞ্চ হয়, তবে শিক্ষককে হতে হবে সেই মঞ্চের নিরপেক্ষ পথপ্রদর্শক; কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নয়।
লেখক: মোহন খোন্দকার, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।