মহিবুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত
সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই আজকাল কিছু শব্দগুচ্ছ বারবার চোখে পড়ে স্ত্রীকে হত্যা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, পরকীয়ার সন্দেহে স্ত্রীকে খুন, স্বামীর হাতে খুন। শব্দগুলো এতবার ফিরে আসে যে একসময় পাঠকের মনেও তৈরি হয় একধরনের অসাড়তা, যেন এসব ঘটনা আবহাওয়ার খবরের মতোই নিয়মিত, প্রত্যাশিত এবং প্রায় স্বাভাবিক।
অথচ প্রতিটি সংবাদের আড়ালে একটি সংসার ভেঙে পড়ে, একটি শিশু তার নিরাপদ পৃথিবী হারায়, একটি পরিবার চিরদিনের জন্য বহন করে একটি ক্ষত। প্রশ্ন হলো, ঘরের ভেতরের এই সহিংসতা থামছে না কেন? বরং কেন বারবার ফিরে আসছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু অপরাধের বিবরণ যথেষ্ট নয়। দরকার সমাজবিজ্ঞানের চোখ। কারণ পারিবারিক সহিংসতা কেবল কোনো ব্যক্তির রাগ, মানসিক অস্থিরতা কিংবা পারিবারিক কলহের ফল নয় বরং এর পেছনে কাজ করে ক্ষমতা, অসমতা, সামাজিকীকরণ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক কাঠামো।
সংখ্যার আড়ালে যে মানুষগুলো
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের জরিপে দেশের নারীদের ওপর সঙ্গীর সহিংসতার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী হিসাব করলে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় ৭০ শতাংশ নারী সঙ্গীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং গত এক বছরেই এই হার ৪১ শতাংশ। দেশীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করলে সংখ্যাটি আরও ভয়াবহ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংকলিত তথ্যেও একই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। স্বামীর হাতে নারীর হত্যাকাণ্ড, যৌতুকের কারণে হত্যা ও নির্যাতন সব মিলিয়ে চিত্রটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ দেয় না।
এই সংখ্যাগুলোকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে মূল ঘটনাটিই আড়ালে পড়ে যায়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন। একজন নারী, যিনি হয়তো বহুদিন নির্যাতন সহ্য করেছেন; একটি সন্তান, যে হয়তো ঘরের ভেতর সহিংসতা দেখে বড় হয়েছে; একটি পরিবার, যার জীবনে একটি হত্যাকাণ্ডের পর আর কিছুই আগের মতো থাকে না।
পিতৃতন্ত্র: সহিংসতার কাঠামোগত ভিত্তি
সমাজবিজ্ঞানী সিলভিয়া ওয়ালবি দেখিয়েছেন, পিতৃতন্ত্র পরিবার, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নারীর ওপর অসম ক্ষমতা তৈরি ও বজায় রাখে। বাংলাদেশের পারিবারিক বাস্তবতায় এর প্রকাশ দেখা যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সীমিত ভূমিকা, গৃহস্থালি শ্রমের অবমূল্যায়ন এবং পুরুষের কর্তৃত্বের সামাজিক স্বীকৃতিতে।
রিচার্ড ই. ডোবাশ ও রাসেল পি. ডোবাশের গবেষণাও দেখিয়েছে, পারিবারিক সহিংসতাকে শুধু ব্যক্তিগত রাগ বা মানসিক সমস্যার ফল হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার একটি সামাজিকভাবে শেখা আচরণ। অর্থাৎ, “সে রেগে গিয়ে মেরেছে” এটি তাৎক্ষণিক কারণ হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের সামাজিক কাঠামো ব্যাখ্যা করে না।
নারীর ক্ষমতায়ন এবং পুরুষতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া
গত দেড় দশকে বাংলাদেশের নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্স অর্থনীতি নারী ক্রমশ উপার্জনক্ষম হয়ে উঠছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার কাঠামো সবসময় একই গতিতে বদলায়নি।
উইলিয়াম গুডের রিসোর্স থিওরি অব ফ্যামিলি ভায়োলেন্স অনুযায়ী, পরিবারের ক্ষমতার ভারসাম্যে অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক সম্পদের ভূমিকা রয়েছে। আর নারীর অবস্থানের পরিবর্তন যখন পুরোনো ক্ষমতার সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করে, তখন কিছু ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ দেখা দিতে পারে।
এখানেই আসে ব্যাকল্যাশ ইফেক্ট। নারীর স্বাধীনতা নিজে সহিংসতার কারণ নয়; বরং নারীর পরিবর্তিত অবস্থানকে মেনে নিতে না পারা পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোই কখনো প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে।
তাই নারীর ক্ষমতায়ন শুধু নারীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বিষয় নয়; এটি পুরুষত্ব, কর্তৃত্ব ও পারিবারিক সম্পর্কের পুরোনো ধারণাগুলোকেও পুনর্বিবেচনার দাবি জানায়।
ঘরের ভেতর সহিংসতার চক্র
মনোবিজ্ঞানী লেনোর ওয়াকারের সাইকেল অব ভায়োলেন্স এবং আলবার্ট বান্দুরার সামাজিক শিক্ষা তত্ত্ব দেখায়, সহিংসতা অনেক সময় একটি চক্রের মতো পুনরাবৃত্ত হয় এবং সামাজিকভাবে শেখা আচরণ হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আরও দেখুন: বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট নিয়োগ, আবেদন করতে পারবেন ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও
একটি সহিংস সম্পর্কে প্রথমে তৈরি হয় উত্তেজনা, ছোটখাটো ঝগড়া, সন্দেহ, অপমান এবং নীরব রাগ। ভুক্তভোগী তখন প্রতিটি আচরণ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন, যেন কোনোভাবেই পরিস্থিতি খারাপ না হয়। এরপর আসে সহিংসতার বিস্ফোরণ। মারধর, হুমকি, অপমান কিংবা অন্য কোনো ধরনের নির্যাতন ঘটতে পারে।
তারপর আসে ক্ষমা, অনুশোচনা ও পুনর্মিলনের পর্ব। নির্যাতনকারী ক্ষমা চান, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন, কখনো উপহার দেন। সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ভুক্তভোগীর মনে হয়, হয়তো এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কিছুদিন পর আবার উত্তেজনা জমতে শুরু করে। চক্রটি পুনরায় ঘুরে যায়। বাইরের মানুষের চোখে এই সম্পর্ক অনেক সময় স্বাভাবিক দাম্পত্যের মতোই মনে হয়। কারণ তারা দেখে শুধু ভালো সময়ের অংশটি। তারা দেখে না সেই ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার পর কী ঘটে। আর সময়ের সঙ্গে এই চক্র আরও ঘন ঘন ও তীব্র হতে পারে আবার কখনো গুরুতর আঘাত, এমনকি মৃত্যুতেও পৌঁছাতে পারে।
সংসারের ব্যাপার-এই নীরবতাই কি সহিংসতার আশ্রয়?
নারীবাদী সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, ব্যক্তিগত বিষয়ই রাজনৈতিক দ্য পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল। অর্থাৎ, ঘরের ভেতরের ব্যক্তিগত বলে মনে হওয়া ঘটনাগুলোর পেছনেও বৃহত্তর সামাজিক ক্ষমতা ও বৈষম্যের কাঠামো কাজ করতে পারে।
আমরা পরিবারকে প্রায়ই একটি ব্যক্তিগত পরিসর হিসেবে দেখি। তাই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভেতরের সহিংসতাকেও অনেক সময় বলা হয় সংসারের ব্যাপার, বাইরে বলার দরকার নেই, মানিয়ে নাও। কিন্তু এই কথাগুলো নিরীহ নয়। এগুলো ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে শেখায় এবং অপরাধীকে জবাবদিহিতার বাইরে রাখে।
এ কারণেই জরিপে সহিংসতার যে বিপুল চিত্র পাওয়া যায়, তার তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা অনেক কম। এই ব্যবধান অন্তত ইঙ্গিত দেয় যে পারিবারিক সহিংসতার একটি বড় অংশ এখনো সামাজিক নীরবতার আড়ালে থেকে যায়।
পরিবার কি সত্যিই শুধু স্থিতিশীলতার প্রতিষ্ঠান?
কাঠামোগত কার্যকারণবাদ পরিবারকে সমাজের স্থিতিশীলতা ও সামাজিকীকরণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে। কিন্তু নারীবাদী সমাজবিজ্ঞান প্রশ্ন তোলে এই স্থিতিশীলতা কার স্বার্থে?
যদি পরিবারের স্বাভাবিক ভূমিকা বলতে নারীর নীরবতা, গৃহস্থালি শ্রম এবং পুরুষের কর্তৃত্বকে বোঝানো হয়, তাহলে সেই ভারসাম্য আসলে বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখে।
আজ নারীরা যখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মাধ্যমে পুরোনো ভূমিকার সীমা অতিক্রম করছেন, তখন সেই পুরোনো ভারসাম্যে ফাটল ধরছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি নতুন সমতার ভারসাম্য তৈরি করতে পারছি?
সহিংসতা কি সত্যিই বাড়ছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায় যে বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা কি সত্যিই বেড়েছে, নাকি আগে যা লুকানো থাকত, এখন তা বেশি প্রকাশ্যে আসছে?
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দুটোই একই সঙ্গে সত্য হতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, নারী অধিকার সংগঠনের সক্রিয়তা এবং আইনি সচেতনতার কারণে আগে চাপা পড়ে থাকা অনেক ঘটনা এখন সামনে আসছে। একই সঙ্গে দ্রুত সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন, মূল্যবোধের রূপান্তর এবং পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সংঘাতও নতুন ধরনের উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
দুরখেইমের অ্যানোমি ধারণা ব্যবহার করে বলা যায়, আমরা এমন এক সামাজিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পুরোনো নিয়ম ও ভূমিকার ধারণাগুলো ভেঙে পড়ছে, কিন্তু নতুন সমতার নিয়ম এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সমাধান শুধু আইনে নয়
পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ করতে আইন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু শুধু আইন যথেষ্ট নয়। কারণ আইন অপরাধের শাস্তি দিতে পারে; কিন্তু সহিংসতার সামাজিক সংস্কৃতি বদলাতে পারে না যদি না শিক্ষা, পরিবার, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিও বদলায়।
শিক্ষাব্যবস্থায় ছোটবেলা থেকেই লিঙ্গসমতা ও অহিংস সংঘাত নিরসনের শিক্ষা দিতে হবে। গণমাধ্যমে এমন বিকল্প পুরুষত্বের বয়ান তৈরি করতে হবে, যেখানে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের বদলে সহমর্মিতা, দায়িত্বশীলতা ও সমতাকে পুরুষত্বের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হবে।
আরও দেখুন: নববধূ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে লাশ হয়ে ফিরলেন রিনা আক্তার
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে পুরুষকেও শেখাতে হবে এবং নারীর স্বাধীনতাও তাঁর কর্তৃত্বের পরাজয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পরিবারকে ব্যক্তিগত বলে আইনের ও সামাজিক জবাবদিহিতার বাইরে রাখা যাবে না।
শেষ কথা: পরিসংখ্যানের ভেতরের মানুষ
সমাজবিজ্ঞানের কাজ কেবল কাঠামো ব্যাখ্যা করা নয়; সেই কাঠামোর ভেতরে বন্দি মানুষগুলোর কণ্ঠও দৃশ্যমান করা।
প্রতিটি পরিসংখ্যানের আড়ালে একজন নারী আছেন, যিনি হয়তো আজ সকালেও ভেবেছিলেন কাল সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি সন্তান, যে সহিংসতার সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হচ্ছে। সে হয়তো একদিন সেই আচরণ পুনরুৎপাদন করবে; আবার সচেতনতা ও সহায়তা পেলে সেই চক্র ভাঙার প্রথম প্রজন্মও হতে পারে।
তত্ত্ব আমাদের কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু কাঠামো পরিবর্তনের সংকল্প আসে বিবেক থেকে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যে নীরব যুদ্ধ চলছে, তার সমাপ্তি টানতে হলে আইন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে একই সুরে বাঁধতে হবে। কারণ ঘরের দরজা বন্ধ করে কোনো সহিংসতাকে ব্যক্তিগত বলা গেলেও তার ক্ষত কখনো ব্যক্তিগত থাকে না। নইলে আগামী দিনের সংবাদপত্রেও একই শিরোনাম ফিরে আসবে আর শুধু নামটা বদলে যাবে।
মহিবুল ইসলাম
প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নোবিপ্রবি
[email protected]