মো. ইউসুফ © টিডিসি সম্পাদিত ছবি
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন, ৯০ এর স্বৈরাচারী আন্দোলন ও ২৪ এর ফ্যাসিবাদী আন্দোলন সর্বক্ষেত্রে জিয়া পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে জিয়া পরিবার এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চ বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এখানে কোনো রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা নয়, এর মধ্য দিয়ে একটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ, পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার এবং জনগণের প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের মঞ্চ এমন বহু মুহূর্তের সাক্ষী, যা দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই ইতিহাসে একটি বিশেষ অধ্যায় তৈরি হয়েছে জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে ঘিরে। একই পরিবারের তিন সদস্য, তিন ভিন্ন সময়, তিন ভিন্ন আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। কিন্তু প্রত্যেকেই জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের কথা বলেছেন। ফলে তাঁদের বক্তব্যগুলো পাশাপাশি রাখলে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের আন্তর্জাতিক উপস্থিতিই দেখা যায় না, বরং বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রচিন্তা, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক অবস্থানও কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের মঞ্চে জিয়া পরিবারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে তাঁর সেই ভাষণ আজও সংরক্ষিত রয়েছে। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পরের বাংলাদেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও উন্নয়নের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থানও ছিল বড় প্রশ্ন। সেই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান তাঁর বক্তব্যে ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা এবং উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। জাতিসংঘের নথিতে তাঁর বক্তব্যে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও উঠে আসে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যে সদ্য স্বাধীন হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। স্বনির্ভর উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা, শান্তি ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এ কারণে জিয়াউর রহমানের জাতিসংঘ ভাষণ বাংলাদেশের প্রাথমিক পররাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে জাতিসংঘে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি শুধু ১৯৯৩ সালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ স্মারক অধিবেশনেও তিনি বক্তব্য দেন।
সেই বক্তব্যে জাতিসংঘের সংস্কার, ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা এবং গঙ্গার পানি-বণ্টনসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। জাতিসংঘের তৎকালীন নথিতে ফারাক্কা ও গঙ্গার পানি-বণ্টনকে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুতর প্রশ্ন হিসেবে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬০তম সাধারণ অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কেও খালেদা জিয়া বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যে দারিদ্র্য দূরীকরণ, উন্নয়ন, আইনের শাসন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং বিশ্বশান্তির মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।অর্থাৎ খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ পর্বে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বক্তব্য আরও বিস্তৃত হয়। দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি পানি, আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সংস্কার, শান্তি, নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যবিমোচন আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
তার চার দশক পর নতুন অধ্যায় শুরু করেন জিয়া পরিবারের উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় তাঁর প্রথম ভাষণ দেন। ভাষণের শুরুতেই তারেক রহমান তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা বেগম খালেদা জিয়ার জাতিসংঘের এই মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার কথা স্মরণ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, একই প্ল্যাটফর্মে তাঁর বাবা ও মা বাংলাদেশের জনগণের হয়ে কথা বলেছেন এবং একই ধারায় তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনগণের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরতে দাঁড়িয়েছেন। এখানেই তৈরি হয় ইতিহাসের একটি প্রতীকী সংযোগ ১৯৮০, ১৯৯৩ এবং ২০২৬। তিনটি বছর তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের সূত্রটি একই পরিবারের তিন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছে। তারেক রহমানের ২০২৬ সালের ভাষণে বৈশ্বিক সংঘাত, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির মতো আন্তর্জাতিক সমস্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের কথা উঠে আসে। সংঘাতের সমাধানে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং শান্তির পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
ফিলিস্তিন প্রশ্নেও তিনি বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল রোহিঙ্গা সংকট।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তিনি নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার দাবি তুলে ধরে। দেশের পরিবেশ, পানি ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তিনি জানান।
জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের জাতিসংঘের বক্তব্যকে পাশাপাশি রাখলে সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের সামনে ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠন, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন। জিয়াউর রহমান সেই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন। ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকে বাংলাদেশের আলোচনায় যুক্ত হয় গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক আইন, পানি, দারিদ্র্যবিমোচন, জাতিসংঘ সংস্কার, শান্তি ও উন্নয়নের বিষয়। খালেদা জিয়ার বিভিন্ন বক্তব্যে এসব বিষয়ের প্রতিফলন দেখা যায়।
আর ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের বক্তব্যে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শান্তি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন মাত্রা।এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি তিনটি ভাষণকে একই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা যায় না। ১৯৮০ সালের বিশ্ব ছিল শীতল যুদ্ধের বাস্তবতায় আবদ্ধ। ১৯৯০-এর দশকের বিশ্বে সোভিয়েত-পরবর্তী নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছিলৌআর ২০২৬ সালের বিশ্ব সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বহুমুখী ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই তিন সময়ের বক্তব্যে বিষয়গত পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। তবুও এই ধারাবাহিকতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একই পরিবারের তিন সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৮০ থেকে ২০২৬ প্রায় সাড়ে চার দশকের ব্যবধানে তিনটি রাজনৈতিক প্রজন্ম বিশ্বসভায় বাংলাদেশের কথা বলেছে।
আরও একটি সমসাময়িক ঘটনা এই অধ্যায়কে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মনোনীত ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দিয়েছেন এবং একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ইতিহাসে এটিও একটি উল্লেখযোগ্য সমাপতন।
ইতিহাসের মূল্য শুধু ঘটনায় নয়, ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায়। জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের বক্তব্য থেকে খালেদা জিয়ার একাধিক জাতিসংঘ উপস্থিতি এবং ২০২৬ সালে তারেক রহমানের বক্তব্য এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায় তৈরি করেছে তবে জাতিসংঘের মঞ্চে কোনো ব্যক্তির উপস্থিতিকে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখলে বৃহত্তর ইতিহাসটি আড়ালে পড়ে যায়।
মূল বিষয় হলো প্রতিটি সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সামনে যে প্রশ্নগুলো ছিল, সেগুলো কীভাবে বিশ্বসভায় উপস্থাপিত হয়েছে। কখনো প্রশ্ন ছিল দারিদ্র্য ও উন্নয়নের, কখনো পানি ও আন্তর্জাতিক আইন; আবার কখনো রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক শান্তির। সেই অর্থে জাতিসংঘ শুধু বাংলাদেশের নেতাদের বক্তব্য শোনেনি বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল ইতিহাসও নথিবদ্ধ করেছে।
১৯৮০ সালের বাংলাদেশ আর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এক নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এক নয়। কিন্তু বিশ্বসভায় নিজের কথা বলার অধিকার ও প্রয়োজন বাংলাদেশের জন্য অপরিবর্তিত। জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া, খালেদা জিয়া থেকে তারেক রহমান জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের এই দীর্ঘ যাত্রা তাই কোনো একক ব্যক্তির গল্প নয় এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিচয়ের পরিবর্তনেরও একটি দলিল। নিউইয়র্কের সেই বিশ্বসভা আজ বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক নীরব আর্কাইভ। সেখানে সংরক্ষিত বক্তব্যগুলো ভবিষ্যতের গবেষককে শুধু কে কি বলেছিলেন তা জানাবে না বরং কোন সময়ে বাংলাদেশ কি নিয়ে ভাবছিল, বিশ্বের কাছে কি প্রত্যাশা করছিল এবং নিজেকে আন্তর্জাতিক সমাজে কিভাবে উপস্থাপন করছিল তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরবে।
-মো. ইউসুফ
সহকারী অধ্যাপক,
ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।