তথ্য যাচাই ছাড়াই রিটার্ন দাখিল তৈরি করতে পারে ভবিষ্যৎ জটিলতা

০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৩ AM , আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৫ AM
প্রভাত বিশ্বাস

প্রভাত বিশ্বাস © টিডিসি সম্পাদিত

আয়কর রিটার্ন দাখিল বর্তমানে অনেকটাই অনলাইননির্ভর। প্রযুক্তির এই সুবিধায় ঘরে বসেই রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব হলেও বাস্তবে অনেক করদাতা কম্পিউটার দোকান বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তায় রিটার্ন জমা দিচ্ছেন। 

এতে দ্রুত রিটার্ন দাখিলের কাজ সম্পন্ন হলেও আয়, সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাব ও জীবনযাপন ব্যয়ের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা অনেক সময় যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না।

ফলে রিটার্ন দাখিলের সময় বিষয়টি সহজ মনে হলেও পরবর্তীতে করদাতাকে নোটিশ, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন কিংবা অডিটের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।

রিটার্ন শুধু ফরম পূরণের বিষয় নয়

আয়কর রিটার্ন একজন করদাতার আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিবরণী। 

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৫ অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তির রিটার্নে তার সব ধরনের আয় এবং বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সম্পদ ও দায়ের বিবরণী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জীবনযাপন সংক্রান্ত ব্যয়ের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ শুধু আয় বা করের অঙ্ক বসিয়ে রিটার্ন দাখিল করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে করদাতার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোথায় হতে পারে ভুল?

অদক্ষভাবে রিটার্ন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ভুল বা অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। যেমন— প্রকৃত আয় সঠিক খাতে প্রদর্শন না করা; ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের তথ্য বাদ দেওয়া; সম্পদ ও দায়ের তথ্য অসম্পূর্ণ বা ভুলভাবে উপস্থাপন; বিনিয়োগ ও কর রেয়াতের তথ্য ভুলভাবে প্রদর্শন; পূর্ববর্তী বছরের সম্পদ ও বর্তমান বছরের সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য; জীবনযাপন ব্যয়ের তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকা; প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হিসাব সংরক্ষণ না করা বা রিটার্নে প্রদর্শিত তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক, সম্পদ বা অন্যান্য নথির অসামঞ্জস্য থাকা।

আইন কী বলছে?

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৯ অনুযায়ী নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য, বিবরণ, তফসিল, বিবৃতি, হিসাব, পরিশিষ্ট ও প্রযোজ্য দলিলাদিসহ রিটার্ন দাখিলের বিধান রয়েছে। 

ফলে রিটার্ন দাখিলকে কেবল একটি অনলাইন ফরম পূরণের কাজ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ছাড়া ধারা ১৬৬-এ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অডিটের ঝুঁকি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮২ অনুযায়ী অডিট ঝুঁকির কারণ ও নির্ধারিত পদ্ধতির ভিত্তিতে রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচন করা যেতে পারে। অন্যদিকে, ধারা ১৭৯ অনুযায়ী অডিট বা কর নির্ধারণের প্রয়োজনে করদাতার রেকর্ড, হিসাব, বিবৃতি, দলিল, তথ্য বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড উপস্থাপনের জন্য নোটিশ দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে পরবর্তীতে উপস্থাপিত নথির অসামঞ্জস্য দেখা দিলে করদাতাকে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও কাগজপত্রের ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।

রিটার্ন দাখিলের আগে যা যাচাই করা জরুরি

করদাতার উচিত রিটার্ন দাখিলের আগে—

১. আয় ও আয়ের উৎস সঠিকভাবে যাচাই করা।
২. ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের তথ্য মিলিয়ে দেখা।
৩. সম্পদ ও দায়ের সঠিক বিবরণ প্রস্তুত করা।
৪. বিনিয়োগ ও কর রেয়াতের প্রযোজ্যতা যাচাই করা।
৫. জীবনযাপন ব্যয়ের তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা।
৬. পূর্ববর্তী বছরের রিটার্নের সঙ্গে বর্তমান বছরের তথ্য মিলিয়ে দেখা।
৭. রিটার্নে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হিসাব সংরক্ষণ করা।
৮. রিটার্ন দাখিলের আগে পুরো রিটার্নটি পড়ে তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করা।

আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রিটার্ন দাখিল শুধু অনলাইনে তথ্য বসিয়ে ‘Submit’ করার বিষয় নয়। একজন করদাতার আয়, সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক তথ্যের মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।

এ কারণে রিটার্ন দাখিলের আগে একজন আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া করদাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আয়কর আইনজীবী করদাতার প্রদত্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনা করে প্রযোজ্য আইন ও বিধান অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন।

বিশেষ করে যেসব করদাতার একাধিক আয়ের উৎস, ব্যবসায়িক আয়, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদ, বিনিয়োগ, জমি-ফ্ল্যাটসহ স্থাবর সম্পদ কিংবা পূর্ববর্তী বছরের সম্পদের হিসাব রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে রিটার্ন প্রস্তুতের আগে তথ্য যাচাই করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

সচেতন করদাতা, নিরাপদ কর ব্যবস্থাপনা

কম্পিউটার দোকান থেকে রিটার্ন দাখিল করা কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়। তবে শুধুমাত্র ফরম পূরণ ও অনলাইনে সাবমিট করার জন্য অদক্ষ বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া করদাতার জন্য ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে তাই সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় দলিল, আইনগত বিধান এবং পেশাদার পরামর্শ—এই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কারণ, একটি আয়কর রিটার্ন শুধু একটি অনলাইন ফরম নয়, এটি করদাতার আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিবরণী।

“আজকের একটি ভুল রিটার্ন আগামী দিনের নোটিশ ও অডিটের কারণ হতে পারে; তাই রিটার্ন দাখিলের আগে সচেতন হোন, তথ্য যাচাই করুন এবং প্রয়োজনে আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।”

লেখক: আয়কর আইনজীবী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সদস্য, ঢাকা ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশন।

একই পরিবারের চারজনের দাফনে ৪ খাটিয়া, শোকে স্তব্ধ গ্রামবাসী
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
১০ মাস পর নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মিটিং, যেসব বিষয় …
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
তথ্য যাচাই ছাড়াই রিটার্ন দাখিল তৈরি করতে পারে ভবিষ্যৎ জটিলতা
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
মুক্তিযোদ্ধা মেজর আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার, প্রতিবাদে বিক্ষো…
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
শুধু ডিগ্রি নয়, চাই মানসম্মত উচ্চশিক্ষা
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
ইবির বিভাগ থেকে পরীক্ষার খাতা উধাও, প্রোভিসির উপর দায় চাপান…
  • ০২ অক্টোবর ২০২৬