জনসংযোগ পেশায় দুই যুগ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি © টিডিসি সম্পাদিত
সময় কখনো থেমে থাকে না। সময়ের স্রোতে মানুষ বদলায়, প্রতিষ্ঠান বদলায়, বদলে যায় চারপাশের বাস্তবতা। কিছু প্রতিষ্ঠান মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে, সেখানে কর্মজীবন আর ব্যক্তিজীবনের সীমানা একসময় অস্পষ্ট হয়ে আসে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আমার সম্পর্কও ঠিক তেমনই।
২০০৩ সালের জুন মাসে যে প্রতিষ্ঠানে আমার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল এ বছরের জুন মাসে সেই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে আমার চাকরিজীবনের দুই যুগ পূর্ণ হয়েছে। ২৪ বছর—শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি আমার জীবনের একটি বড় অধ্যায়। এই দীর্ঘ সময়ে ইউনিভার্সিটির অনেক পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি এর পথচলার বিভিন্ন বাঁক, সাফল্যের মুহূর্ত, সংকটের সময় এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা। তাই কখনো কখনো নিজেকে এই প্রতিষ্ঠানের ‘সুখ-দুঃখের জীবন্ত সাক্ষী’ বলে মনে হয়।
২০০৩ সালে যখন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে আমার কর্মজীবন শুরু হয়, তখন প্রতিষ্ঠানটি ছিল আজকের তুলনায় অনেক ছোট পরিসরের। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থী বেড়েছে, বিভাগ বেড়েছে, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বেড়েছে, অবকাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে এবং একাডেমিক কার্যক্রমও বিস্তৃত হয়েছে। একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় ও অবস্থান তৈরি করে— সেটি কাছ থেকে দেখার বিরল সুযোগ আমার হয়েছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত অগ্রগতি শুধু তার ভবন, বিভাগ কিংবা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে হাজারো মানুষের শ্রম, প্রত্যাশা ও স্বপ্ন। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান বিতরণ করেছেন, কর্মকর্তারা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, কর্মচারীরা নেপথ্যে থেকে প্রতিষ্ঠান সচল রেখেছেন। আর শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্ন নিয়ে এই ক্যাম্পাসে এসেছে এবং শিক্ষা শেষে ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে।
এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। তাদের ভর্তি থেকে শুরু করে শিক্ষা সমাপ্তি পর্যন্ত নানা পর্যায়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। অনেককে খুব কাছ থেকে দেখেছি— একজন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হয়ে উঠতে। তাদের সাফল্যের খবর যখন পাই, তখন মনে হয়, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার দীর্ঘ পথচলারও যেন সেখানে সামান্য একটি অংশ রয়েছে।
তবে একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস কখনো শুধু সাফল্যের গল্প দিয়ে লেখা হয় না। সংকট ও প্রতিকূলতাও সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিকেও বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা, আর্থিক বাস্তবতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন শর্ত ও প্রক্রিয়া, একাডেমিক ও অবকাঠামোগত প্রয়োজন— সব মিলিয়ে বিভিন্ন সময়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। কখনো পরিস্থিতি ছিল স্বস্তির, কখনো ছিল উদ্বেগের। কখনো একটি ছোট অর্জনও আমাদের আনন্দ দিয়েছে, আবার কখনো একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেককে হতাশ করেছে।
এই সময়গুলোতে আমি শুধু একজন কর্মকর্তা হিসেবে বিষয়গুলো দেখিনি; বরং প্রতিষ্ঠানের একজন দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে অনুভব করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো সময়ে যেমন আনন্দ পেয়েছি, তেমনি সংকটের সময়ও দায়িত্বের জায়গা থেকে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বও পরিবর্তিত হয়েছে। সময়ের ধারাবাহিকতায় আজ আমি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। জনসংযোগের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি সহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের সুযোগ হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে।
জনসংযোগের কাজটি অনেক সময় বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের অর্জনকে মানুষের কাছে তুলে ধরা যেমন দায়িত্ব, তেমনি সংকটের সময় সঠিক তথ্য, সঠিক অবস্থান এবং সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি— একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম তৈরি হতে দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু অসতর্কতার কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে খুব দ্রুত।
২৪ বছরের পথচলায় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো কোনো পদবি, পুরস্কার কিংবা আর্থিক সুবিধা নয়। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। এই প্রতিষ্ঠানে এসে বহু মানুষের স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছি। অনেক সহকর্মী হয়েছেন বন্ধু, অনেক সিনিয়র হয়েছেন অভিভাবকের মতো। আবার এই দীর্ঘ সময়ে অনেক প্রিয় মানুষকে হারিয়েছিও। কারও অবসর হয়েছে, কেউ অন্যত্র চলে গেছেন, কেউবা চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে ক্যাম্পাসের অনেক পরিচিত মুখ বদলে গেছে, কিন্তু তাদের স্মৃতি রয়ে গেছে।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি শুধু বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে ২৪ বছর চাকরি করিনি; বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিও আমার জীবনের ২৪ বছরকে ধারণ করেছে।
এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে আমার অসংখ্য সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা ও রাতের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অফিসের ব্যস্ততা, সভা, অনুষ্ঠান, শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সাফল্যের খবর, সংকটের মুহূর্ত— সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি আমার জীবনের একটি দীর্ঘ চলমান গল্প।
এই গল্পের সব অধ্যায় আনন্দের নয়। কিছু অধ্যায় বেদনার, কিছু অধ্যায় হতাশার, কিছু অধ্যায় সংগ্রামের। কিন্তু প্রতিটি অধ্যায়ই আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে। শিখিয়েছে ধৈর্য, দায়িত্ববোধ, মানুষের সঙ্গে কাজ করার কৌশল এবং সবচেয়ে বড় কথা—একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতার অর্থ।
২৪ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর আজ আমার উপলব্ধি আরও গভীর— একজন কর্মীর দায়িত্ব শুধু নির্ধারিত কাজটুকু শেষ করা নয়। যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জীবনের একটি বড় সময় কাটে, তার ভালো-মন্দের প্রতিও এক ধরনের নৈতিক দায় তৈরি হয়। সেই দায় থেকেই হয়তো ইউনিভার্সিটির কোনো অর্জনে নিজের আনন্দ হয় এবং কোনো সমস্যায় নিজের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির সামনে এখন নতুন সময়, নতুন সম্ভাবনা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, আন্তর্জাতিকীকরণ, গবেষণা এবং কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিকেও আরও আধুনিক, মানসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে।
আমার দীর্ঘ দুই যুগের কর্মজীবনের পথচলায় যাঁদের অবদান, অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা অনস্বীকার্য, তাঁদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
সবার আগে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম উপাচার্য, সাবেক সচিব, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক মরহুম কাজী আজহার আলী স্যারকে। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা, শিক্ষা ও মানবকল্যাণের প্রতি গভীর অঙ্গীকার এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারা আমার কর্মজীবনের এক অনন্য প্রাপ্তি। তাঁর সান্নিধ্য ও আদর্শ আমার পেশাগত জীবনের পথচলায় সবসময়ই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
একই সঙ্গে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বর্তমান চেয়ারম্যান কাজী জামিল আজহার স্যারসহ বোর্ডের সম্মানিত সদস্যবৃন্দকে। তাঁদের আস্থা, সহযোগিতা ও মূল্যবান দিকনির্দেশনা আমার দায়িত্ব পালনে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য, সম্মানিত ট্রেজারার ও রেজিস্ট্রার স্যারসহ প্রতিষ্ঠানের সাবেক ও বর্তমান সকল শ্রদ্ধেয় কর্মকর্তা ও সহকর্মীর প্রতি। তাঁদের সঠিক দিকনির্দেশনা, সহযোগিতা ও উৎসাহ আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম পাথেয়। তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এই দীর্ঘ পথচলা নিঃসন্দেহে এতটা সমৃদ্ধ ও অর্থবহ হতো না।
পেছনে ফিরে তাকালে উপলব্ধি করি—একটি কর্মজীবন কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, আস্থা, সহযোগিতা, পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা। আমার দুই যুগের এই পথচলায় যাঁরা কোনো না কোনোভাবে পাশে থেকেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা।
আমার প্রত্যাশা, আগামী দিনে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি শুধু তার বর্তমান অর্জন ধরে রাখবে না; বরং নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আরও বেশি শিক্ষার্থী এখানে তাদের স্বপ্নের ভিত্তি তৈরি করবে, আরও বেশি শিক্ষক গবেষণায় অবদান রাখবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।
হয়ত একদিন আমার কর্মজীবনেরও সমাপ্তি ঘটবে। অফিসের চেয়ার অন্য কেউ ব্যবহার করবেন, নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব নেবে, ক্যাম্পাসে নতুন মুখ আসবে। কিন্তু ২৪ বছরের যে স্মৃতি, ভালোবাসা, শ্রম ও আবেগ—সেটি আমার ভেতরে থেকে যাবে।
জীবনের একটি বড় সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাটানোর সৌভাগ্য সবার হয় না। আমি সেই সৌভাগ্যের অধিকারী।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আমার দুই যুগ পূর্ণ হয়েছে। এই দুই যুগে আমি প্রতিষ্ঠানের অনেক আনন্দ দেখেছি, অনেক দুঃখ দেখেছি, অনেক সাফল্যের সাক্ষী হয়েছি, আবার অনেক সংকটের সময়ও খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাই আজ নির্দ্বিধায় বলতে পারি—বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি আমার কাছে শুধু একটি কর্মস্থল নয়। এটি আমার জীবনের দুই যুগের ইতিহাস, অসংখ্য স্মৃতির ঠিকানা এবং আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম।
প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের পাতায় আমার নাম কতটা থাকবে, সেটি সময়ই বলবে। কিন্তু আমার জীবনের ইতিহাসে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির নাম যে স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
দুই যুগের এই পথচলার জন্য বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। আর সামনে যে পথ—সেই পথ হোক আরও সমৃদ্ধির, আরও সাফল্যের এবং আরও বড় স্বপ্নপূরণের।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি এগিয়ে যাক—তার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষীর সম্মিলিত স্বপ্ন নিয়ে।
লেখক-
সোহেল আহসান নিপু
পরিচালক (পিআর)
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি