টিডিসি সম্পাদিত © টিডিসি
আমাদের দেশে একটি প্রশ্ন খুব সহজেই আলোচনায় উঠে আসে—কে বড়? কোন পেশার মানুষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বেশি যোগ্য কিংবা কোন ক্যাডার বেশি মর্যাদার। কিন্তু একটি দেশের অগ্রগতির জন্য ‘আমি বড়, অন্যরা ছোট’ এই মানসিকতা কতটা সহায়ক, সেটি নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি। অথচ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রত্যেক পেশার মানুষ নিজ নিজ জায়গায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের সেই অবদান অনুযায়ী সম্মান দেয়।
সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার একটি অংশ সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষকদের যোগ্যতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার মানদণ্ডকে ঘিরে। যোগ্যতার প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার জন্য নির্দিষ্ট একাডেমিক ও গবেষণাগত মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এই আলোচনাটি যখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কে বেশি যোগ্য বা মর্যাদাবান—এই প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন মূল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। আমাদের বরং আলোচনা করা উচিত ছিল, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার মান কীভাবে বাড়ানো যাবে এবং এর জন্য কী ধরনের কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো শিক্ষাদানের পাশাপাশি গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টির সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজগুলোতেও শিক্ষার মান, গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক)
অন্যদিকে আমাদের কলেজগুলো ঐতিহাসিকভাবে একই গবেষণাকেন্দ্রিক কাঠামোর মধ্যে গড়ে ওঠেনি। ফলে কলেজের একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো গবেষণার সুযোগ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রত্যাশা সব সময় পান না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কলেজের শিক্ষকরা কম যোগ্য। একজন কলেজ শিক্ষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে গবেষণা করতে পারেন, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন এবং অসাধারণ শিক্ষক হতে পারেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেই যে সবাই সমানভাবে ভালো শিক্ষক বা সক্রিয় গবেষক হবেন, সেটিও ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
তাই ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত একটাই—মানদণ্ড কী এবং সেই মানদণ্ড কে পূরণ করছেন? কোনো কলেজ শিক্ষক যদি সংশ্লিষ্ট পদের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেন, তাহলে শুধু তিনি কলেজের শিক্ষক ছিলেন বলে তাকে অযোগ্য বিবেচনা করার যুক্তি নেই। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেষ্ঠ নন। বিষয়টি দয়ার নয়, আবার অবজ্ঞারও নয়, বিষয়টি যোগ্যতার।
আমার মূল আলোচনা আসলে এখানেই—আমরা কেন সবকিছুকে ‘কে বড়, কে ছোট’-এর কাঠামোয় দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি?
পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই পেশাগত পার্থক্য আছে। কাজের ধরন, দায়িত্ব, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পারিশ্রমিক ও সামাজিক মর্যাদায় পার্থক্যও থাকে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজে এই পার্থক্য অন্য পেশাকে অসম্মান করার কারণ হয় না। শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, গবেষক কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী- প্রত্যেকের কাজ আলাদা, কিন্তু প্রত্যেকেই সমাজের প্রয়োজনীয় অংশ।
শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কলেজের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- তাদের দায়িত্ব এক নয়; কিন্তু একটি ধারাবাহিক শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ওইসিডির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও দেখায়, ভালো শিক্ষক আকৃষ্ট ও ধরে রাখতে শুধু সামাজিক মর্যাদা নয়, প্রতিযোগিতামূলক বেতন, পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং ভালো কর্মপরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যাটি শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়। আমাদের পেশাগত কাঠামোতেও এমন প্রশ্ন উঠছে। বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করা তরুণেরা তাঁদের নিজস্ব পেশায় কাজ করার পরিবর্তে সাধারণ প্রশাসনিক ক্যারিয়ারের দিকে কেন আকৃষ্ট হচ্ছেন- এটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন। বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ওপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অ-মেডিকেল ক্যারিয়ার হিসেবে বিসিএস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর পছন্দের শীর্ষে ছিল।
এটি কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্তের সমালোচনা নয়; বরং আমাদের ভাবতে হবে, একজন চিকিৎসক কেন চিকিৎসা পেশায়, একজন প্রকৌশলী কেন প্রকৌশলে, একজন শিক্ষক কেন শিক্ষায় এবং একজন গবেষক কেন গবেষণায় নিজের ভবিষ্যৎ দেখবেন। প্রতিটি পেশাকে শক্তিশালী করার মতো মর্যাদা, পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশে আমরা একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াচ্ছি, অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান, গবেষণা ও শিক্ষক নিয়োগের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠান বাড়ালেই শিক্ষার মান বাড়ে না। একই সঙ্গে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার মানও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় একা একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে না। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো স্কুল ও কলেজও প্রয়োজন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাই আমাদের বিতর্কের জায়গাটি অন্য রকম হওয়া উচিত। কে কলেজের শিক্ষক, কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এটি নয়; বরং কে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেন, কীভাবে যোগ্য শিক্ষক তৈরি ও নিয়োগ করা যায়, কীভাবে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা যায় এবং কীভাবে শিক্ষার্থীরা আরও ভালো শিক্ষা পাবে—সেই প্রশ্নগুলো সামনে আসা উচিত।
একটি দেশের উন্নয়ন কোনো একটি পেশা বা প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে না। একজন ভালো স্কুলশিক্ষক ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তৈরি করেন, একজন ভালো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জ্ঞান সৃষ্টি করেন, একজন ভালো চিকিৎসক মানুষের জীবন রক্ষা করেন, একজন প্রকৌশলী দেশের অবকাঠামো নির্মাণ করেন এবং একজন দক্ষ প্রশাসক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করেন। প্রত্যেকের কাজ আলাদা, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজন সবার।
আমাদের তাই ‘কে বড়’ এই সংস্কৃতি থেকে ‘কে কতটা ভালো’—এই সংস্কৃতিতে যেতে হবে। প্রতিটি পেশার জন্য থাকতে হবে স্পষ্ট ও কঠোর মানদণ্ড; একই সঙ্গে থাকতে হবে যথাযথ মর্যাদা, পারিশ্রমিক ও পেশাগত সুযোগ।
কে বড় আর কে ছোট বিতর্ক হয়তো সাময়িক আত্মতৃপ্তি দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ বদলাবে তখনই, যখন আমরা প্রত্যেককে তার নিজ নিজ জায়গায় বড় হওয়ার সুযোগ দেব এবং প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে দেশের জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করব।
লেখক: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল