ইসলামোফোবিয়া: ভয় থেকে বৈষম্য, বৈষম্য থেকে সহিংসতা

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ PM
দেওয়ান তাফহীমূল হাসান

দেওয়ান তাফহীমূল হাসান © টিডিসি সম্পাদিত

ইসলামোফোবিয়া হলো ইসলাম ধর্ম এবং মুসলিমদের প্রতি অমূলক ভয়, ঘৃণা ও বিদ্বেষ। এটি এক ধরনের বর্ণবাদ যা মুসলিম বা ইসলামভিত্তিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য, সহিংসতা এবং নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে।

Islamophobia শব্দটির অর্থ ইসলামভীতি। ইসলামফোবিরা শব্দটির সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ফরাসি লেখক Alain Quellien। ১৯১০ সালে অ্যালেন কুইলিয়েন কর্তৃক রচিত "La Politique Musulmane dans" গ্রন্থে Islamophobia শব্দটি ব্যবহার করে বলেন, ইউরোপীয়দের মধ্যে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি যে ব্যাপক ঘৃণা ও শত্রুতা রয়েছে তার মূল কারণ হলো ইসলামভীতি এবং ইসলাম হলো খ্রিষ্টান ধর্ম ও ইউরোপকেন্দ্রিক আদর্শের শত্রু এবং বিপরীত মত ধারণ করে। ১৯২৩ সালে ইংরেজি জার্নাল “থিওরোজিক্যাল স্টাডিজে" এর ব্যবহার দেখা যায়।

"Conceptualization and Measurement of Islamophobia" গবেষণাপত্রে Runnymede Trust (1997) কর্তৃক প্রস্তাবিত সংজ্ঞাকে সমর্থন করে। Runnymede Trust-এর তথ্য অনুযায়ী "Islamophobia" হলো ইসলাম বা মুসলমানদেরকে ভয় বা হুমকির উৎস হিসেবে দেখা, তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক বা ভুল ধারণা পোষণ করা এবং তা ছড়িয়ে দেওয়া। এই ধারণার ভিত্তিতে তাদের প্রতি বৈষম্য, ঘৃণা, বর্জন ও অন্যায় আচরণ করা।

'Runnymede Trust-এর প্রতিবেদনে বলা হয় 'Islamophobia' মানে শুধু ইসলামকে অপছন্দ করা নয় বরং এটি এমন এক ধরনের মনোভাব যেখানে মুসলিম তথা ইসলাম সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক মনোভাব প্রসন্ন করে এবং যারা মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেন, যাদের পরিবারে ইসলাম ধর্ম বিদ্যমান ও ইসলাম ধর্মকে সম্মান প্রদর্শন করেন তাদেরকে ইসলামভীতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি পশ্চিমা ঘরানার বিদ্বেষমূলক মতবাদ। এখানে,

১. মুসলমানদেরকে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়।

২. পশ্চিমা সমাজের তুলনায় নিকৃষ্ট মনে করা হয়।

৩. ইসলামকে সহিংস ও বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এ প্রসঙ্গে গবেষক Jonathan Schwartz ও Ayhan Kaya বলেন, ইসলামভীতি মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক ধরনের সাংস্কৃতিক বর্ণবাদ যার ফলে প্রকাশ্য নেতিবাচক আচরণ সৃষ্টি হয়।

ইসলামভীতির শিকড় ইউরোপের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়। মুসলিম সভ্যতার উত্থান, আন্দালুস, অটোমান সাম্রাজ্য এবং ক্রুসেডের সময় খ্রিষ্টান ও ইসলামের সংঘাতের ফলে ইউরোপে মুসলমানদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয় যা অতিরঞ্জিত বর্ণনা আকারে ছড়াতে থাকে।

১৯১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যালেন কুইলিয়েন "La Politique musulmane dans" গ্রন্থে শব্দটি ব্যবহার করলে তা পৃথিবীব্যাপী বিকশিত হয়। গত ১০০ বছরে 'মুসলমান'রা পৃথিবীতে আলাদা জাতি হিসেবে চিহ্নিত এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। ১৯২৫ সালে ফরাসি লেখক এতিয়েন ডিনেট ও সলিমা বিন ইব্রহিম 'Islamophobia' শব্দটি ব্যবহার করেন।

Runnymede Trust (1997) সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী "Islamophobia: A Challenge For Us All" তথ্য অনুযায়ী ইসলামভীতির মাধ্যমে মুসলমানদের প্রতি পদ্ধতিগত নিপীড়ন, বর্ণবাদ ও গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণার ফলে মুসলমানদের ইসলামপন্থী আরবি নাম, দাড়ি, বোরকা ইত্যাদি বিষয় দিয়ে চিহ্নিত করে হামলা করা হত। ফলে মুসলমানরা বৈষম্য, সামাজিক বর্জন, ঘৃণা ও সহিংসতার শিকার হন।

কারণ:
১. উপনিবেশবাদ Islamophobia বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এডওয়ার্ড সাঈদ বলেন ঔপনিবেশিক যুগে পশ্চিমাদের মুসলমানদের প্রতি ভয়ের কারণ ছিল না বরং এটি পশ্চিম ও পূর্ব সমাজের মধ্যে পার্থক্য ছিল কেননা পূর্ব ছিল মুসলিম সমর্থক এলাকা।

২. ওরিয়েন্টালিজম শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব তত্ত্বের ধারণা থেকে জন্মায় যা পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুসলিমরা নেতিবাচকভাবে বিশ্লেষণ করে।

৩. ধর্মীয় উগ্রবাদের কারণে Islamophobia সৃষ্টি হয়েছে। এর ভিত্তি তৈরি করেছিল পশ্চিমারা।

৪. ১৯৮০ দশকে তালেবান-আল-কায়দা গঠন Islamophobia-কে ত্বরান্বিত করে।

৫. বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়া দৃশ্যমান হয়ে উঠে। ফলে সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামভীতিকে একত্রে উপস্থাপন করা হলে বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। Runnymede Trust-এর তথ্য অনুযায়ী ৯/১১-পরবর্তী সময় বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের উপর নজরদারি, কঠোর নিরাপত্তা নীতি, হিজাব নিষিদ্ধকরণ, মুসলিম হত্যা, মসজিদে হামলা এবং ঘৃণাজনিত অপরাধ বৃদ্ধি পায়। যা ইসলামভীতিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বৃদ্ধি করে।

৫. পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে মুসলমানদের সন্ত্রাসী, যুদ্ধবাজ, উগ্রবাদ, নারী নিপীড়নের সাথে যুক্ত করে দেখানো হয়।

৬. ইসলামভীতি ছড়ানোর জন্য রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনী জনসভায় মুসলিমবিরোধী বক্তব্য, ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিতর্ক, শরিয়া আইন নিয়ে মন্তব্য করে বিশ্বব্যাপী ইসলামভীতি তৈরি করা হয়।

৭. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য, বিকৃত ছবি ঘৃণামূলক মন্তব্যের সাথে ইসলামকে জড়ানোর মাধ্যমে সমাজে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়।

৮. ইসলামের প্রকৃত তথ্য সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা ও ভুল তথ্যের কারণে অনেকে ইসলামভীতি মনোভাব পোষণ করেন। ফলে বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়ার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইসলামোফোবিয়া বিস্তারে অর্থায়ন ও গবেষণার তথ্যঃ
Islamophobia-কে বিশ্বব্যাপী বিকশিত করার জন্য “Center for American Progress”-এর গবেষণা তথ্য অনুযায়ী ২০০১-২০০৯ সালের মধ্যে ৪২.৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ ইসলামভীতিকে বিশ্বব্যাপী ছড়াতে সাতটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে ব্যয় করা হয়।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে Muslim Civil Rights এবং Advocacy সংস্থা “Council on American-Islamic Relations (CAIR)” কর্তৃক প্রকাশিত "Legislating Fear: Islamophobia and Its Impact in the United States" এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামবিরোধী গোষ্ঠীগুলো ২০০৮-১১ সালে ১১৯ (USD) অর্থ ইসলামভীতি বিকশিত করার জন্য ব্যয় করে।

তৃতীয়ত, ২০১৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Berkeley Center for Race & Gender ও CAIR-এর যৌথ গবেষণায় "Comforting Fear: Islamophobia and Its Impact in the United States" এর প্রতিবেদনে বলা হয় ইসলামভীতি ছড়াতে নিয়োজিত দলগুলোতে 205 মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দেয়া হয়।

চতুর্থত, সেক্যুলার পশ্চিমা গবেষকদের তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের Islamophobia Network-এর ৩৩টি কেন্দ্রের গোষ্ঠীর দ্বারা ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়।

পঞ্চমত, Rice University-এর সহকারী ডিরেক্টর Zahra Jamal বলেন, হিউস্টনে ৬২% মুসলিম ধর্মভিত্তিক শত্রুতা অনুভব করেন এবং ৬৫% অন্যদের দ্বারা অসম্মানিত হন।

ষষ্ঠত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর ফান্ডামেন্টাল রাইটস-এর তথ্যমতে ৪৭% মুসলিম বর্ণবাদের শিকার হন এবং ২০২২ সালে ৩৮% ইউরোপীয় মুসলিম বৈষম্যের শিকার হন।

সপ্তমত, Othering and Belonging Institute-এর জরিপে দেখা যায় ৬৭.৫% মুসলমান তাদের জীবনে কোন না কোন সময় ইসলামভীতির কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং প্রতিবছর ৬২% মুসলিম (প্রাপ্ত বয়স্ক) বৈষম্য অনুভব করেন।

অষ্টমত, ২০১৮ সালের ব্রিটিশ সংসদের "অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ অন মুসলিমস"-এর প্রতিবেদনে বলা হয় হিজাব পরিহিতা নারীরা ইসলামভীতির আক্রমণের শিকার হন।

এভাবে বিশ্বব্যাপী ইসলামভীতিকে পশ্চিমা ঘরানার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য প্রদান করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, বর্জন, সহিংসতা, ঘৃণা, অন্যায় আচরণকে বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে মুসলিম জাহানে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। ইসলামভীতির মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে মানুষের মনোজগতে সাম্প্রদায়িক চিন্তার বীজ বপন করে বিশ্বব্যাপী ইসলামকে সংকীর্ণভাবে পশ্চিমা সমাজ উপস্থাপন করে থাকেন।

-দেওয়ান তাফহীমূল হাসান
মাস্টার্স দ্বিতীয় সেমিস্টার, ইতিহাস বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজধানীতে এবার থানার সামনে বাসে আগুন
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে এশিয়ান ফিল্মমেকার অ্যাওয়ার্ড জিতলেন বাংলাদেশি…
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কমল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি পরীক্ষার ফি, পুনর্নির্ধারি…
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এমফিল ও পিএইচডি …
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাকসুর উদ্যোগে ২৫ লাখ টাকায় জাবি মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন …
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ক্যান্সার প্রতিরোধে নারীদের সচেতন করতে ইবি ক্যাপের উঠান বৈঠক
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬