খালিদ মাহমুদ পলাশ © টিডিসি সম্পাদিত
১৮৩৭ সাল ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এ সময় ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ভাষা ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি এবং উর্দুকে স্বীকৃত দেয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে ভাষার এই প্রশাসনিক মর্যাদা নিয়ে হিন্দি ও উর্দুর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হয়। বিহারে উনিশ শতকের শেষভাগে হিন্দির প্রসার ঘটে এবং ১৯০০ সালে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও অযোধ্যা অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হিন্দিকে উর্দুর পাশাপাশি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
হিন্দি ও উর্দুর কথ্য ভাষার স্তরে দুটির মধ্যে বিস্তর মিল রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা দুটির লিপি, শব্দভাণ্ডার, সাহিত্যিক রীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে।
উর্দু প্রধানত পারসো-আরবি লিপিতে এবং ফারসি-আরবি উৎসের শব্দভাণ্ডারকে বেশি গ্রহণ করেছে; বিপরীতে হিন্দি দেবনাগরী লিপি এবং সংস্কৃতঘেঁষা শব্দভাণ্ডারের দিকে বেশি অগ্রসর হয়েছে।।
ফলে হিন্দি-উর্দুর পার্থক্যকে শুধু ‘দুটি আলাদা ভাষার’ বিষয় হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি একই ভাষিক ধারার ভেতর থেকে গড়ে ওঠা দুটি ভাষার পাশাপাশি বিকাশের ইতিহাস; যেখানে লিপি, শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং স্বতন্ত্র সত্তার পরিচয় বহন করে।
এই অঞ্চলে বাংলা কখনো দাপ্তরিক ভাষা ছিল না। সেন আমলে বাংলা ভাষা সবচেয়ে চাপের মুখে ছিল। দক্ষিণ ভারত থেকে আসা সেন শাসকরা সংস্কৃতকে দরবারের ভাষা করল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ ও বৌদ্ধ পালদের বিতাড়িত করল। চর্যাপদ ১৯০৭ সালে এই দেশ থেকে বিতাড়িত হয় নেপালে পাওয়া গেল। বাংলা ভাষায় মহাভারত রামায়ণ শুনলে রৌবক নামক নরকে যাওয়ার ফতোয়া প্রাচীন কালে হিন্দুত্ববাদীরাই দিয়েছিল। হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো বাংলা অনুবাদ মুসলিম শাসন আমলেই হইল। নিম্নবর্গের হিন্দু যাদের ভাষা ছিল বাংলা তাদের জন্য উম্মুক্ত হইল তাদের ধর্মগ্রন্থ।
মুসলিম শাসন এই অঞ্চলে না আসলে বাংলা কখনো ভাষা হিসেবে টিকত কিনা সেই আলাপও অনেক শক্তিশালী।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান নামে দুটি দেশ হবার পর জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার যে দাবি জানিয়েছিল সেই একই কাজ নেহেরুও করেছিল হিন্দিকে নিয়া।
হিন্দিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তামিলনাড়ুতে আন্দোলন দানা বেধে উঠল। তামিলনাড়ুতে আন্দোলনকারীরা আত্মাহুতি দিল তাদের নিজ ভাষার সম্মানে। আন্দোলন দমনে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হইল ৭০ এর উপর মানুষকে।
আসামে গুলি করে হত্যা করা হইল ১১ জনকে। আমাদের দেশে ভাষা আন্দোলনে শহীদ হল ৫ জন।
জিন্নাহ ছিলেন গুজরাটি। ভাষা হিসেবে উর্দুতে সাবলীল ছিলেন না। পারিবারিক ভাবে কথা বলতেন গুজরাটি ভাষায়। ইংরেজিতে সাবলীল ছিলেন। এটাতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন।
দুই নেতাই চেয়েছিলেন নানা জাতের, ভাষার মানুষকে একটা lingua franca ( সাধারণ ভাষা) তে বাধতে যাতে তাদের স্বকীয়তা থাকে এবং একতা থাকে। তাদের সেই প্রচেষ্টা ছিল ভুল।
রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি প্রথম এই অঞ্চলে পায় ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গনপরিষদে আর সংবিধানে ১৯৫৬ সালে।
কোনো ভাষার শক্তি কেবল তার সাহিত্য, প্রাচীনত্ব কিংবা বক্তার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। ভাষাকে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী করতে শুধু ভাষাটির প্রচার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই ভাষাভাষী মানুষের শিক্ষা, অর্থনীতি, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি ও প্রভাব বিস্তার। বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী হইতে হইলেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য।
কারণ, ভাষা যেমন সংস্কৃতির বাহন, তেমনি অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও ভাষার বিস্তার ও মর্যাদা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।