তারেক সালমান © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনরোষে পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পলাতক অবস্থায় ভারত থেকে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। জুলাই মাসে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। আগস্টেও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি সত্যিই দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি, নাকি বিপর্যস্ত দলীয় নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল?
বাস্তবতা বলছে, শেখ হাসিনার ঘোষণার সঙ্গে আওয়ামী লীগের মাঠের সাংগঠনিক সক্ষমতার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ কার্যত প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে। ২০২৫ সালের মে মাসে দলটির সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রচারসহ দল ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রম।
এমন পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে দেশে ফেরার ঘোষণা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দলের ভবিষ্যৎ, তার নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস বলে, বড় কোনো রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘদিনের জন্য মুছে ফেলা সহজ নয়। আওয়ামী লীগও বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দলটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে যে জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল, তার রাজনৈতিক মূল্যও দলটিকে দিতে হয়েছে। কিন্তু একটি দলকে তার একজন নেতা বা একটি পরিবারের সঙ্গে সম্পূর্ণ একীভূত করে দেখলে রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়।
আজ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীর সবচেয়ে বড় প্রশ্নও সম্ভবত এখানেই—দল কি আবার মানুষের কাছে যেতে পারবে? আর যদি পারে, তাহলে কোন আওয়ামী লীগ নিয়ে যাবে?
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির পাশাপাশি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী মত দমন, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা এবং মানবাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও ক্ষমতাচ্যুতির পর এসব প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া ও আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে গিয়ে দলটির কর্মীদের গ্রেপ্তার বা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। জুনে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে কর্মসূচির চেষ্টার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
এখানেই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের দায়িত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। আইন ভঙ্গ হলে আইন প্রয়োগ হবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একজন কর্মী আর একজন অভিযুক্ত বা অপরাধী এক জিনিস নন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়া যেমন ন্যায়বিচারের পরিপন্থী, তেমনি দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের বিচার না করাও গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রকে এই দুই চরম অবস্থার বাইরে দাঁড়াতে হবে।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণা তাই আওয়ামী লীগের জন্যও একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ। ‘নেত্রী ফিরবেন, সব ঠিক হয়ে যাবে’—এই পুরোনো রাজনৈতিক মানসিকতা দিয়ে নতুন আওয়ামী লীগ তৈরি হবে না। আওয়ামী লীগ যদি কখনো সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমে নিজেদের অতীতের ভুল ও ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় স্বীকার করতে হবে। দলকে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বের করে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ থাকবে কি না—তার উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু একটি বিষয় এখনই বলা যায়, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা আর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।
সম্ভবত আওয়ামী লীগের তৃণমূলের একটি বড় অংশও এমন একটি দল চায়, যে দল মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ধারণ করবে, কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে না। যে দল ক্ষমতায় থাকলে জবাবদিহিতা মানবে, বিরোধীদলে থাকলে গণতান্ত্রিক নিয়ম মানবে এবং রাষ্ট্রকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা করবে না।
রাজনীতি থেকে কোনো দলকে স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার চেয়ে তাকে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বেশি স্বাস্থ্যকর। তবে সেই প্রত্যাবর্তনের দরজা খুলতে হলে আওয়ামী লীগকেই প্রমাণ করতে হবে—সে পুরোনো আওয়ামী লীগ নয়।
আর শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণা যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেটি হবে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ—তিনটিরই কঠিন পরীক্ষার মুহূর্ত। শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত শুধু একজন নেতার ইচ্ছায় হয় না; জনগণের আস্থা, আইনের শাসন এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাই ঠিক করে দেয় কে ফিরবে, কীভাবে ফিরবে এবং কতটা জায়গা নিয়ে ফিরবে। এবার দেখার পালা হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা বাস্তবতা নির্ভর না অতীতের মতো শুধুই রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি, সময়ই তা বলে দেবে।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস