শিক্ষকতার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা— রেজিস্ট্রারের টেবিলে এখন কোনো অপেক্ষমাণ নথি নেই

১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ PM , আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১০:২২ PM
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম © ফাইল ছবি

আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে পুরোদমে অ্যাকাডেমিক কাজে ফিরে গেলাম। বরাবরই শ্রেণিকক্ষ আমার পছন্দের জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়ন শেষ করে ১৯৯৭ সালে শুরুর চাকরিটা ছিল চট্টগ্রামের বৃহত্তম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন শিক্ষকতা। প্রায় চার বছর শিক্ষকতার পর প্রভাষকের পদ ছেড়ে বছর দুয়েক কাজ করেছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক (গবেষণা) পদে। 

অবশেষে ২০০৩ সালের মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার স্বপ্নের চাকরিটা পাই। প্রশাসনিক তেমন কোনো দায়িত্ব কখনোই পালন করা হয়নি। এমনকি, ২০১৫ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করার সুবাদে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল সভায় যোগদানের জন্য প্রশাসনিক ভবনে যাওয়া ছাড়া উক্ত ভবনে আমার যাতায়াত ছিল না বললেই চলে। 
অধিকন্তু, আওয়ামী শাসনামলে এ ভবনে রাজ্যের দুর্নীতি হতো। চাকরি, টেন্ডার, অবৈধ লেনদেন, প্রশাসনের পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলন এসব ছিল প্রশাসনিক ভবনকেন্দ্রিক নৈমিত্তিক ঘটনা। পত্রিকার পাতা উলটাতেই চোখে পড়ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রকাশিত অনিয়ম, দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের খবর। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার উপাচার্য হিসেবে যোগদান করলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়।

দিনটি ছিল চব্বিশ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। হঠাৎ মোবাইল ফোনে ইয়াহ্ইয়া স্যারের কল দেখে আঁচ করছিলাম, স্যার এমন কিছু বলবেন এবং বলেছেনও। একই দিন দুপুরে তৎকালীন রেজিস্ট্রার ফোন করে বললেন, স্যার আপনি রেজিস্ট্রার অফিসে এসে দায়িত্ব বুঝে নিন। আমি তাঁকে বললাম, আপনি আজ দায়িত্বে থাকুন; আমি আগামীকাল সকালে যোগদান করব। এভাবে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ শুরু।

জমে থাকা নথিপত্র এবং অনিষ্পন্ন দলিল-আবেদন এসবের কারণে প্রথমদিকে বেশ চাপ অনুভব হতো। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করে অফিসটাকে মোটামুটি একটা শৃঙ্খলায় নিয়ে আসতে সক্ষম হই। উপাচার্য ইয়াহ্ইয়া আখতার এবং তৎকালীন দুই উপ-উপাচার্য এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন। 

বলাবাহুল্য, অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক এবং প্রশাসনিক পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ছিল। প্রফেসর ইয়াহ্ইয়া আখতার এবং তাঁর টিমের আন্তরিক চেষ্টায় একের পর এক সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে আর্থিক লেনদেন শতভাগ দূরীভূত হয়।

১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গত ১৭ মার্চ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকানকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। ঐ সময়টাতে ঈদ উদ্‌যাপন উপলক্ষ্যে আমি গ্রামের বাড়ি ছিলাম। নতুন উপাচার্য যোগদান করবেন তাই গ্রাম থেকে ফিরে আসি। উপাচার্য মহোদয়কে কথার ফাঁকে বললাম, যেহেতু রাজনৈতিক সরকার- আমি অব্যাহতি চাই। তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। ফোরকান স্যারের সাথে কাজ করতে গিয়ে গত প্রায় চার মাস যা লক্ষ্য করলাম, তিনি তুখোড় মেধাবী, ভালো গবেষক এবং সর্বোপরি তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা আকাশচুম্বী। উপাচার্যের সাথে শিক্ষকগণের বিভিন্ন মতবিনিময় সভায় তাঁর এসব যোগ্যতা উল্লেখ করতে গিয়ে আমি কোনো কোনো সময় কিছু সহকর্মীর তোপের মুখেও পড়েছিলাম। 

এখানে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে, পূর্বের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার আপাদমস্তক একজন সৎ এবং নির্মোহ মানুষ ছিলেন। তাঁর আমলে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে প্রায় চারশো নিয়োগ হয়েছে। আমার জানামতে একটি নিয়োগের জন্যও প্রফেসর ইয়াহইয়া আখতারের ব্যক্তিগত সুপারিশ কিংবা পক্ষপাত ছিল না। অন্যদিকে তৎকালীন উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান নির্দিষ্ট আদর্শের অনুসারী হতে পারেন, কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক সম্পৃক্ততা শামীম উদ্দিন খানের বেলায় কল্পনা করাও অসম্ভব। বরং ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি এমনকি বিরোধী মতাবলম্বীদের বেলায়ও কখনো দ্বিচারিতা করেননি। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) তুলনামূলকভাবে কম বয়সের হতে পারেন, কিন্তু তিনি ছিলেন করিতকর্মা। সার্বিকভাবে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন সততার সাথে সীমিত সময়ে অনেক বেশি কাজ হাতে নিয়েছে, যার কিছু অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

অল্প সময়ে অধিক নিয়োগের বিষয়টি সমালোচিত হয়েছে বটে, কিন্তু একটি নিয়োগও বিজ্ঞাপনের অতিরিক্ত হয়নি, একটি নিয়োগও অর্থের বিনিময়ে হয়নি। প্রায় ত্রিশ হাজার শিক্ষার্থীর এ প্রতিষ্ঠানে এখনো দুই শতাধিক শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীর শূন্য পদ রয়েছে শতাধিক। সুতরাং অধিক নিয়োগের রাজনৈতিক বয়ান কেবল মাঠ গরম করার একটি হাতিয়ার হতে পারে। 

অতীত নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নিয়োগ তুলনা করলে সকল বিবেচনায় পরের প্রক্রিয়াটি মানসম্পন্ন স্বীকার করতেই হবে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষক নিয়োগে পূর্বে একটি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হতো। পনেরো মিনিট কিংবা আধঘন্টার মৌখিক পরীক্ষায় আসলে কী হতো- তা সবার জানা। রাজনৈতিক পরিচয়টা নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হতো। 

প্রফেসর ইয়াহইয়া আখতার ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার প্রচলন করেন। যারা নির্ধারিত পাস নম্বর পেতেন তাদেরকে অবশিষ্ট ৫০ নম্বরের মৌখিক ও প্রেজেন্টেশনের জন্য ডাকা হতো। পূর্বে প্রেজেন্টেশন বলতে কিছু ছিল না, অথচ একজন সদ্য গ্র্যাজুয়েট শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারবে কি না, তা বোঝার একটি উপায় হতে পারে প্রেজেন্টেশন। 

এ বিবেচনায় 'ইয়াহ্ইয়া আখতার মডেল' অধিক গ্রহণযোগ্য। তবে প্রক্রিয়াটিকে আরও কার্যকর করতে চাইলে প্রার্থীর অতীতে অর্জিত স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ফলাফলের ভিত্তিতে একটি স্কোর যোগ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছে তা দেখার বিষয় আছে। বর্তমান প্রশাসন আরেকটি সংস্কার-উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। শিক্ষক পদোন্নতির বিভিন্ন ধাপে স্বীকৃত জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধের মধ্যে কমপক্ষে একটি প্রবন্ধ ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশিত/গৃহীত হতে হবে- এমন শর্ত আরোপ করতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাবে।

অন্তর্বর্তী প্রশাসন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি কমপিউটার দক্ষতা নিরূপণের জন্য লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের টাইপের দক্ষতা যাচাই করার পদক্ষেপ নিয়েছে। বর্তমান প্রশাসনকে অনুরোধ করব এটি অব্যাহত রাখতে। প্রায়ই লক্ষ্য করেছি, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাগণের অধিকাংশ টাইপিং জানেন না। টাইপিস্ট না থাকলে তাঁদের নথি সামনে এগোয় না, কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। পৌনে দুই বছর রেজিস্ট্রার অফিসে কাজ করতে গিয়ে দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট অনুভব করেছি। মেধা-দক্ষতা যাচাই না করে অর্থের বিনিময়ে কিংবা আত্মীয়তার সূত্রে কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল একসময়, যারা মানসম্মত সেবা দিতে অনেকটাই অক্ষম। এমনকি তারা অফিসকে ধারণই করেন না, নামমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন আর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান।

তবে যা কিছু ভালো তাকে ভালো বলতেই হবে, অন্যথায় প্রণোদনা থাকে না। প্রণোদনার প্রতি মানুষ সাড়া দেয়। এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীও রেজিস্ট্রার দপ্তরে আছেন, যাঁরা কর্মে দক্ষ, সৎ এবং আন্তরিক। হতে পারে তাঁরা ভিন্ন মতাদর্শের, কিন্তু আমি তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছি। ভিন্ন মতের হওয়ায় তাঁদেরকে বদলি করার চাপ ছিল, কিন্তু আমি তা করিনি। রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কোনো নথি সামনে পাঠাতে একদিনও দেরি করিনি, সিদ্ধান্ত কার অনুকূলে গেল কিংবা কার প্রতিকূলে গেল সে বিষয় বিবেচ্য ছিল না। রেজিস্ট্রারের টেবিলে এখন কোনো অপেক্ষমাণ (পেন্ডিং) নথি নেই। 

বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকানও কাজ পেন্ডিং রাখেন না। হিসাব নিয়ামক দপ্তর, প্রকৌশল দপ্তরসহ সকল দপ্তর যদি একই সংস্কৃতি চর্চা করে এবং ধারণ করে তবে বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে নির্বিঘ্নে। উপাচার্য মহোদয়ের প্রতি অনুরোধ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেন অর্থসংশ্লিষ্টতা আবার ফিরে না আসে, দলীয় বিবেচনা যেন মুখ্য না হয়। আপনি অনেক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, চাইলেই বাস্তবায়ন করতে পারবেন, এবং প্রশংসা কুড়াবেন। আমার মূল্যায়নে আপনি দলান্ধ নন, রাজনৈতিক চাপকে গুরুত্ব দেওয়ার মানুষ নন, কিন্তু দিনে দিনে ধারণা পালটে যাচ্ছে। আপনার জন্য শুভকামনা।

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এসএসসি পরীক্ষার ফল ভবিষ্যতের কতটা পথ নির্ধারণ করে?
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
জুলাই শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভায় নেই ব্যানার, বক্তা যুবলীগ …
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
২৭ বছর বেতনহীন, শিক্ষকরা এখন দর্জি-দিনমজুর— বন্ধের পথে প্রত…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
টাইমস হায়ার এশিয়া র‌্যাঙ্কিংয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষে …
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ কর্মসূচির প্রচারণ…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মধ্যেই চকরিয়ায় প্রকাশ্যে ব্যবসায…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence