শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা ও আমাদের সংকট

০৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৫ AM
জুবাইর আহমেদ

জুবাইর আহমেদ © টিডিসি সম্পাদিত

ফুটবল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন খেলা। বর্তমান পৃথিবীতে এটিই এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। খ্রিষ্টপূর্ব যুগে চীনে ফুটবল খেলার জন্ম হলেও উনিশ শতকে ইংল্যান্ডে আধুনিক ফুটবল খেলার সৃষ্টি হয়। ক্রমান্বয়ে এটি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ১৯০৪ সালে বিশ্ব ফুটবল সংস্থা(ফিফা) প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংস্থার উদ্যোগে ১৯৩০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবল আসর শুরু হয়। তখন থেকে আজ অবধি প্রতি চার বছর পর পর (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য দুটি আসর ছাড়া) বিশ্বকাপের এ আসর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

খেলাধুলা শৈশব ও তারুণ্যের শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলার মাধ্যমে শরীর চর্চা হয়। একটি শিশু খেলাধুলার মাধ্যমে খেলার সাথিদের সাথে সামাজিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। সৌহৃদ্য, হৃদ্যতা, পরোপকার, নেতৃত্ব সহ নানা সামাজিক গুণাবলি এবং ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন রকমের খেলাধুলা বাংলাদেশে প্রচলিত থাকলেও ফুটবল খেলা বাংলার মানুষের নিকট সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। 

ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে ফুটবল খেলা প্রচলিত হয়। ধীরে ধীরে খেলাটি জনপ্রিয় হতে থাকে। সহজ নিয়মের এই খেলাটি বাংলাদেশের আপামর জনতার নিকট বোধগম্য হওয়ায় এটিই এখন সবচেয়ে উপভোগ্য খেলায় পরিণত হয়েছে। শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ, পুরুষ, মহিলা, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সর্বস্তরের মানুষ খেলাটি উপভোগ করতে পারে। ফলে খেলাটি এখন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক বিনোদনের মাধ্যম।

ফুটবল বিশ্বকাপ বর্তমান পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন। সারা পৃথিবীর কোটি কোটি দর্শক শ্রোতা বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের দিনগুলোতে ফুটবল নিয়ে, প্রিয় খেলোয়াড়, প্রিয় দল নিয়ে আনন্দে মেতে থাকে। হাজার মাইল দূরের কোনো দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন হলেও বিশ্বকাপের উষ্ণ বাতাস বাংলাদেশে বয়ে আসে এবং সুনামির বেগে এ দেশের লাখ কোটি মানুষের হৃদয়ে আছড়ে পড়ে। কয়েক শতাব্দী পূর্বে প্রচলিত হওয়া খেলাটি এখন শহর থেকে গ্রামাঞ্চল সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। 

বিশ্বকাপের উত্তাপ শহর-গ্রাম, নগর-বন্দর, হাট-বাজার, গ্রামের চায়ের স্টল থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। গ্রামের ছোট দোকানি থেকে কর্পোরেটর অফিসের বড়ো চাকুরে সবাই যেন বিশ্বকাপে বুঁদ। প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই বিশ্বকাপের আয়োজন। বিশ্বকাপের টুর্নামেন্টে নিজ দেশের এমনকি পার্শ্ববর্তী কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও এ দেশের মানুষের রয়েছে বিশ্বকাপে নিজ দলের পক্ষে বিরাট সমর্থন। 

প্রিয় দেশ, প্রিয় খেলোয়াড়ের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় সরব এ দেশের ভক্ত সমর্থকরা। প্রিয় দলের জন্য পতাকা ওড়ানো, জার্সি গায়ে দেওয়া, ব্যানার-ফেস্টুন ওড়ানো, খেলা দেখার জন্য বড়ো পর্দার আয়োজন, প্রিয় দলের বিজয়ে বিজয় মিছিল, ভুঁড়িভোজের আয়োজন সহ কত শত আয়োজনে ব্যস্ত এ দেশের ফুটবল প্রেমীরা।


বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টকে নিয়মতান্ত্রিকতা ও সীমার মধ্যে আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে উপভোগের ব্যবস্থা করাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু ইদানীং বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের অতিরিক্ত বাড়াবাড়িই বিপত্তি ঘটাচ্ছে। বিশ্বকাপ বাংলাদেশের মানুষের বিনোদনের পরিবর্তে প্রতিপক্ষের সাথে বিভেদ-বিদ্বেষ তৈরি করছে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশে দুটি বৃহৎ সমর্থক গোষ্ঠী থাকায় প্রায়ই তারা বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গ বিদ্রæপ করা নিয়ে হাতাহাতি মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। 

পছন্দের দলের পতাকা উড়াতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে যাওয়া, ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া, বৈদ্যুতিক খুঁটির তারের সাথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। কিছু উগ্র সমর্থক প্রিয় দলের পক্ষে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টির নেশায় নিজের জমি বিক্রি করে বৃহৎ আকারের পতাকা তৈরি, ফ্যান ক্লাব তৈরি করছে। সবচেয়ে বড়ো উদ্বেগের ব্যাপার যেটি সেটি হলো বড়ো দুটি সমর্থক গোষ্ঠী(আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল) তাদের প্রিয় দলের পরাজিত হওয়ার পর একাধিক ব্যক্তি আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা সামাজিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রেও বিরাট প্রভাব ফেলছে। মাসব্যাপী চলে বিশ্বকাপের আসার। সাধারণত বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর অনুষ্ঠিত হয় প্রতি চার বছর পর পর জুন-জুলাই মাসে। জুন-জুলাই বাংলাদেশের শিক্ষাবর্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ সময় মাধ্যমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে ষাণ্মাসিক মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। 

এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয় এ সময়ে। উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী একটি পাবলিক পরীক্ষা। অথচ এ সময় সারা দেশে এমনভাবে বিশ্বকাপের আয়োজন চলতে থাকে যাতে একজন শিক্ষার্থী তার পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি পরীক্ষায় মনোনিবেশ করতে পারেনা। বাড়িতে, রাস্তায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অনলাইন সামাজিক মাধ্যমে, সংবাদপত্র, টিভি-মিডিয়ায় বিশ্বকাপই যেন একমাত্র আলোচনায় পরিণত হয়। শিক্ষার্থীর মনোজগতে এর দারুণ প্রভাব পড়ে। যেখানে তারুণ্যের সময় একজন শিক্ষার্থীর এমনিতেই মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হয়, সেখানে চারদিকে বিশ্বকাপের এ নগ্ন উন্মাদনা তাদের লেখাপড়াকে দারুণভাবে বিঘিœত করে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানলাম তারা পরীক্ষার রাতেও রাত জেগে ফুটবল খেলা দেখেছে। পরীক্ষার প্রস্তুতির চেয়ে তারা প্রিয় দলের পারফরম্যান্স নিয়ে ছিল বেশি সচেতন। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় তাদের পারফর্মেন্স খারাপ করেছে এবং সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

পরীক্ষার হলে কক্ষ প্রত্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখি সহকর্মী কক্ষ প্রত্যবেক্ষকের কেউ কেউ রাত জেগে খেলা দেখায় পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করতে সমস্যা বোধ করছেন। খেলার আলোচনা পরীক্ষার হলে পর্যন্ত চলে আসত। পছন্দের দলের পরাজয়ের পর উক্ত দলের সমর্থক শিক্ষক পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। কোন কোন শিক্ষক দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়েছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন নিয়ে তারা প্রতিষ্ঠান প্রধানের নিকট আবদার করেছে। 

কোন কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান আবেদনকে মঞ্জুরও করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও বিশ্বকাপের আমেজ ছিল তীব্র। প্রাথমিকের কোমলমতি শিশুর মনোজগতে খেলাকে বিনোদন বা শিল্প হিসেবে উপভোগের পরিবর্তে খেলাকে নির্দিষ্ট দেশের বা দলের সমর্থক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা বা পরিচিত করার মানসিকতা দেখা গেছে। কোমলমতি শিশুরা অন্য শিশুকে ট্যাগিং, বুলিং করছে। কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয় বরং দেশের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিসেও বিশ্বকাপ নিয়ে অতিরিক্ত উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। 

অনেক সরকারি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদ্যোগে বিশ্বকাপ নিয়ে বিরাট আয়োজন, অফিসে ভুঁড়ি ভোজের আয়োজন হয়েছে। বিশ্বকাপকে ব্যক্তিগত বিনোদনের পর্যায়ে না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনে রূপ দেয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল পর্যায়ের কোন কোন ব্যক্তির বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে এমন আবেগ উৎসাহ প্রকাশ করেছেন যা কল্পনাতীত। তাদেরকে এ বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দিলে তার বিষয়টিকে নিছক বিনোদন হিসেবে উড়িয়ে দিতেন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে বড়ো বড়ো আয়োজন হয়েছে যাকে কেন্দ্র করে সাইবার বুলিং, টিজিং এর মতো ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে শিক্ষার্থীদের সাথে বহিরাগত যুবক যুবতিদেরও ব্যাপক উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। বহিরাগত মানুষের পদচারণা বৃদ্ধি পাওয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘিœত হয়েছে। আনন্দ উদ্যাপনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও নিরাপত্তা সংকটে পড়েছিল।

বিশ্বকাপ ফুটবল সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ক্রীড়া আসর। দর্শক জনপ্রিয়তা, অর্থনৈতিক বাজেট, আন্তর্জাতিক পরিব্যাপ্তি, মিডিয়া কাভারেজ নানা দিক থেকে এটি সারা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। সুতরাং, বিশ্বায়নের এ যুগে বাংলাদেশেও বিশ্বকাপের উত্তাপ আসবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে এবং বিনোদনের জন্য বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকরাও এটি নিয়ে আনন্দ উপভোগ করবে, পর্যালোচনা করবে। তবে এটি নিয়ে বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুতরাং সচেতন মহলকে এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। 

কোমলমতি শিশুদের সমর্থক হিসেবে বড়ো না করে খেলার শৈল্পিক বিষয়গুলোকে শিশুর মনোজগতে স্থাপন করতে হবে। প্রতিভাবান শিশুদের মধ্যে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে যথেষ্ট সচেতন করতে হবে। বিশ্বকাপের আয়োজনগুলোকে সামাজিক সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিকের মতো বড়ো পাবলিক পরীক্ষাগুলোকে বিশ্বকাপের মৌসুম এড়িয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল  ক্যাম্পাসের  শিক্ষার্থীদের খেলা উপভোগের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তরুণ সমাজকে উগ্রসমর্থন থেকে উগ্রআচরণ, বিদ্বেষ, সাইবার বুলিং, আত্মহত্যার মতো নিন্দনীয় কাজে নিরুৎসাহিত করতে হবে। খেলাধুলাকে সুস্থ চিত্র বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সর্বোপরি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে বিশ্বকাপের উন্মাদনায় আমরা যেন উন্মাদ না হয়ে যায়।

লেখক: প্রভাষক, বাঁশেরবাদা ডিগ্রী(অনার্স) কলেজ,ঈশ্বরদী, পাবনা

বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
দেশের বাজারে কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কত?
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
সেদ্ধ ডিম নাকি অমলেট—ওজন কমাতে কোনটি বেশি কার্যকর?
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
শিবির সংশ্লিষ্টতার কারণে কর্মচারীকে ছাত্রদল নেতার মারধর ও চ…
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা ও আমাদের সংকট
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬
নিয়মিত ভাতের মাড় পান করলে ত্বকে আসবে যে ৫ পরিবর্তন
  • ০৭ আগস্ট ২০২৬