জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল: দায় কার, করণীয় কী?

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৬ PM
মো. হেবজুল আলম লিমন

মো. হেবজুল আলম লিমন © টিডিসি সম্পাদিত ছবি

বিগত রোববার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে, যা কার্যকর হয়েছে সোমবার থেকে। নতুন দামে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। বাসের যাত্রী, সেচ পাম্প চালানো কৃষক আর পণ্য ওঠানো ব্যবসায়ী—সবার মুখেই এখন একই দুশ্চিন্তা। অনেকে বলছেন, ‘আইএমএফের চাপেই এই দাম বাড়ল।’ কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়, আবার পুরোপুরি সত্যও নয়।

সরকারের জ্বালানি বিভাগ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম মার্চ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এর ফলে মার্চ থেকে আগস্ট—এই ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। বিভাগটি আরও বলছে, বিদেশ থেকে বেশি দামে তেল এনে দেশে কম দামে বিক্রি করলে চোরাচালানের ঝুঁকিও বাড়ে। তাদের হিসাবে কলকাতায় ডিজেলের দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৩৫ টাকা, আর শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে তা আরও অনেক বেশি।

হিসাবটা সহজ। কেনার দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করলে ফারাকটা কারও না কারও পকেট থেকে মেটাতে হয়। সেই টাকা আসে সরকারের ঋণ, ডলারের রিজার্ভ কিংবা ভবিষ্যতের করের টাকা থেকে। দাম না বাড়ালে খরচ শূন্য হয়ে যায় না, বিল শুধু পিছিয়ে যায়, আর সেটা শেষ পর্যন্ত আমাদেরই মেটাতে হয়।

আইএমএফের ভূমিকা আছে, তবে সেটা একটু আলাদা। ২০২৪ সালের মার্চে চালু হওয়া বাজারভিত্তিক দামের ফর্মুলা ভর্তুকি কমানো ও আইএমএফের শর্ত পূরণের লক্ষ্যের সঙ্গেই যুক্ত ছিল, আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে দেশেও সমন্বয় হবে। কিন্তু আইএমএফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন শুধু দাম বাড়ানোর কথা বলেনি। বিদ্যুতের দামের সংস্কারের ক্ষেত্রে সেখানে খরচ কমানোর পরিকল্পনা, দামের সমন্বয়সূচি এবং দুর্বল মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষার কথাও আছে, সঙ্গে জনগণের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগের তাগিদ। অর্থাৎ সংস্কারের তিনটি অংশ—দামের সমন্বয়, খরচ কমানো ও দুর্বলদের সুরক্ষা। প্রথম অংশটি আমরা আজ পাম্পে দেখছি। বাকি দুটি জনগণ কবে দেখবে, প্রশ্নটা এখন সেটাই।

ডিজেল শুধু গাড়ির জ্বালানি নয়। এটি বাস-ট্রাক চালায়, সেচ পাম্প চালায়, কারখানার যন্ত্রও চালায়। তাই ডিজেলের দাম বাড়লে ঢেউ লাগে চাল-সবজির বাজারে, বাস ভাড়ায়, নিত্যদিনের সব খরচে। এপ্রিলে ডিজেলের দাম বাড়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাক ভাড়া ট্রিপপ্রতি ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বেড়েছিল। আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ, আর খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে ৯.৩২ শতাংশ। পরিবারগুলোর বাজেটে আগে থেকেই টান, এই বাড়তি খরচ তাদের আরও চাপে ফেলবে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে থাকা পোশাক কারখানার মতো রপ্তানিমুখী খাতও এতে ঝুঁকিতে পড়বে। যাঁদের আয়ের বেশির ভাগ খাবার ও যাতায়াতে যায়, ধাক্কাটা তাঁদের গায়েই লাগবে সবচেয়ে বেশি।

এই ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় প্রথমত, দাম ঠিক করার একটা অনুমানযোগ্য নিয়ম দরকার। পাঁচ মাস দাম অপরিবর্তিত রেখে হঠাৎ একবারে ২০ টাকা বাড়ালে মানুষ ও ব্যবসায়ী—কারও পক্ষেই মানিয়ে নেওয়া সহজ হয় না। ছোট ছোট ধাপে, আগে জানিয়ে, হিসাবসহ সমন্বয় করলে ধাক্কা কম লাগে। কোন খরচের ভিত্তিতে দাম ঠিক হলো, সেই হিসাবও প্রকাশ করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, সবার জন্য দাম কম রাখার চেয়ে যাঁদের সত্যিই দরকার তাঁদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর। যাঁরা বেশি জ্বালানি পোড়ান, যেমন ব্যক্তিগত গাড়ি বা জেনারেটরের মালিক, সবার জন্য কম দামের সুবিধা মূলত তাঁদের পকেটেই যায়। আইএমএফের প্রতিবেদনেই বলা আছে, হালনাগাদ সামাজিক নিবন্ধন ব্যবস্থা ও দারিদ্র্য মানচিত্র কাজে লাগিয়ে সহায়তা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। নিম্ন আয়ের পরিবারকে নগদ বা পণ্যসহায়তা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে সহায়তা আর সেচ মৌসুমে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো—এগুলোই সেই পথ।

তৃতীয়ত, বিপিসি ও বিদ্যুৎ খাতের অপচয় ও অদক্ষতা কমাতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে অদক্ষতার দাম দিতে না হয়। খরচ কমানোর লক্ষ্য, লোকসানের নিরীক্ষিত হিসাব ও বকেয়া মেটানোর পরিকল্পনা দাম বাড়ানোর ঘোষণার সঙ্গেই প্রকাশ করা উচিত।

চতুর্থত, সরকারের আয় বাড়াতে হবে। আইএমএফ বলেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় কর আদায় তীব্রভাবে কমেছে। ধনী ও উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায় না করে শুধু জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সমন্বয়ের বোঝা চাপানো ন্যায়সংগত হয় না।

পঞ্চমত, ঋণদাতাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে। সংস্কারের দিক ঠিক হলেও তার গতি ও ধাপ নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে। যুদ্ধজনিত ধাক্কার তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে দাবি করা, প্রতিটি দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন সুরক্ষার ব্যবস্থাও চালু হয়। আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডও ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের ওপর জোর দিয়েছে।

জনগণের শুধু সরকারকে দোষ দিলে বা নিজেদের কেবল ভুক্তভোগী ভাবলে চলবে না, কারণ জ্বালানির বড় ভোক্তা আমরাই। প্রথম কাজ সাশ্রয়ী ব্যবহার। কাজ একসঙ্গে সেরে যাতায়াত কমানো, সম্ভব হলে বাস-ট্রেনে চলা, ইঞ্জিন ও পাম্প ঠিকঠাক রাখা আর কৃষিতে পানি সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি মানা। যে লিটার আমরা বাঁচাই, তা বিদেশ থেকে কিনতে হয় না, ডলারও বাঁচে।

দ্বিতীয়ত, আতঙ্কে কেনাকাটা বা মজুত করা চলবে না। এতে দামের সমস্যা সংকটে রূপ নেয়। কয়েক মাস আগেই আমরা পাম্পে লম্বা লাইন আর সংকট দেখেছি। তৃতীয়ত, সুযোগসন্ধানীদের দিকে নজর রাখতে হবে। জ্বালানির দামের অজুহাতে পরিবহন মালিক বা ব্যবসায়ীরা প্রকৃত খরচের চেয়ে বেশি ভাড়া বা দাম হাঁকতে পারেন। ভোক্তা, গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসন সজাগ থাকলে বাড়তি ভাড়া প্রকৃত খরচের সীমার মধ্যে রাখা যায়।

চতুর্থত, সততার সঙ্গে কর দিতে হবে। ব্যাপক কর আদায় হলে সরকারের পক্ষে দুর্বল মানুষকে সহায়তা দেওয়া সহজ হয়। পঞ্চমত, প্রশ্ন করতে হবে, স্বচ্ছতা চাইতে হবে। গণমাধ্যম, ভোক্তা সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিকভাবে। গুজব বা সহিংসতার পথে নয়।

টিকে থাকার আসল পথ আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প ও ছাদে সোলার প্যানেল, রেল ও নদীপথে পণ্য পরিবহন, উন্নত গণপরিবহন, শিল্পে জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্র, আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আর পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত—এসবই সেই পথের অংশ। দামের চাপ কষ্টকর, তবু একে বিনিয়োগের সংকেত হিসেবেও দেখা যায়। সহজ শর্তের ঋণ, দক্ষ যন্ত্রপাতির জন্য প্রণোদনা এবং গণপরিবহন ও মজুতে বিনিয়োগ দিয়ে সরকার সেই পথ সহজ করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এই মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু দাতাদের চাপ কিংবা কারিগরি সাফল্য—কোনো একক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করলে বিষয়টির পূর্ণচিত্র পাওয়া যাবে না। এটি বাইরের ধাক্কা এবং দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখা সিদ্ধান্তের একটি বিল। প্রশ্ন হলো, এই বিল কে কতটা মেটাবে, কতটা ন্যায্যভাবে এবং এর খরচ আমাদের অর্থনীতিকে আরও মজবুত করবে, নাকি পরবর্তী সংকটকে শুধু পিছিয়ে দেবে?

সরকার যদি খরচে শৃঙ্খলা, লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষা ও খোলামেলা যোগাযোগ নিশ্চিত করে এবং নাগরিকেরা যদি সাশ্রয়, সঠিক কর প্রদান ও সচেতনতার পরিচয় দেন, তাহলে লিটারপ্রতি এই ২০ টাকা হতে পারে একটি নতুন সূচনার মূল্য, আরেকটি হারানো বছরের নয়।

-মো. হেবজুল আলম লিমন
সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান, শেরপুর সরকারি কলেজ ও পিএইচডি গবেষক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই চুয়েটে যোগ দিতে চট্টগ্রামে ন…
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় জানালেন উপাচার্য
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সর্বনিম্ন বাসভাড়া ১০ টাকা
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি, কোথায় কত বাড়ল দেখ…
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল: দায় কার, করণীয় কী?
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই …
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬