অ্যালগরিদমের শীতকাল ও অচিন পাখির খোঁজে: কেন ইতিহাস, সাহিত্য ও আর্টস আজও অপরিহার্য

২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৭ AM
দেওয়ান ফারহান কবীর

দেওয়ান ফারহান কবীর © সংগৃহীত

আজকের বিশ্ব প্রতিদিন নতুন কোনো অ্যালগরিদমের কাছে নিজের চাবিকাঠি সঁপে দিচ্ছে। জেনারেটিভ এআই, চ্যাটজিপিটি কিংবা জেমিনাইয়ের মতো প্রযুক্তি যখন এক ক্লিকে কবিতা লিখে দিচ্ছে, মুহূর্তেই জটিল কোড সলভ করছে বা ক্যানভাসের মতো ছবি এঁকে দিচ্ছে—তখন চারপাশে একটা আশঙ্কার গুঞ্জন শোনা যায়: ‘আর্টস, সাহিত্য বা ইতিহাস পড়ে এখন আর কী হবে?’ এমনকি আমাদের দেশে প্রায়ই একটা কথা বাতাসে ভাসে যে, মানবিক বা সামাজিক বিজ্ঞানের প্রথাগত বিষয়গুলোর হয়ত আর প্রথাগত বাজারমূল্য নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষার মূল কাজ কি শুধুই ‘বাজারের চাহিদা’ মেটানো, নাকি মানুষ হিসেবে আমাদের আত্মবোধ ও মানবিক বিবেককে টিকিয়ে রাখা?

ইতিহাস কিংবা সাহিত্যের মতো বিষয়গুলো আমাদের কোনো রেডিমেড কোডিং শেখায় না, কিন্তু শেখায় চিন্তার স্বাধীনতা ও শেকড়কে চেনার ক্ষমতা। ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকার উত্থান, বিসমার্কের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কিংবা বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস পাঠ করার অর্থ কেবল অতীত মুখস্থ করা নয়; বরং বর্তমানের জটিল বিশ্বরাজনীতিকে বোঝা এবং আগামী দিনের গতিপথ চেনার এক প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিশক্তি অর্জন করা। যে জাতি নিজের ইতিহাস ও সাহিত্যের শেকড় ভুলে যায়, অন্য কেউ এসে তার ইতিহাস লিখে দেয় এবং তাকে যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ন্যারেটিভে কেনাবেচা করা সহজ হয়ে যায়।

আজ আমরা প্রযুক্তিকে সাফল্যের চূড়ান্ত চূড়ায় পৌঁছাতে দেখছি। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটা বেশ অন্ধকারের। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তার ক্ষমতার ধ্বংসাত্মক রূপ দেখিয়েছিল সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই মুহূর্তে সভ্যতা ছাই করে দেওয়ার ক্ষমতায়। আর আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে একদিকে উন্নত বিশ্ব রকেটে করে মঙ্গলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে পৃথিবীর কোনো কোনো প্রান্তে নিদারুণ মানবিক বিপর্যয়ে শিশুদের রক্তে মাটি ভিজে যাচ্ছে। একদিকে অ্যালগরিদম আমাদের চোখধাঁধানো সেবা দিচ্ছে, অন্যদিকে সমাজ হারাচ্ছে তার মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা। আমাদের চারপাশে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো যে অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির দানব গড়ে উঠছে, তার গলায় নৈতিকতার দড়ি পরানোর দায়িত্ব কেবল নিতে পারে আর্টস, হিউম্যানিটিজ এবং সাহিত্য।

প্রযুক্তির বাজার যতই বড় হোক, মানুষের রক্তমাংসের অনুভূতি আর সৃজনশীলতা কখনো সিলিকন চিপে বন্দি করা সম্ভব নয়। কবি বা শিল্পীর ক্যানভাসে তুলির ডগার শেষ কাঁপন কিংবা নাটকের মঞ্চে একজন অভিনেতার চোখের জলের যে আসল অনুভূতি—তা এআই কোনোদিন নকল করতে পারবে না। আজ থেকে শত বছর আগে সাধক লালন শাহ ব্যাকুল হয়ে গেয়েছিলেন—‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়!’ আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো অ্যালগরিদম ঘেঁটে লালনের গানের সুর, ছন্দ আর অন্ত্যমিল হুবহু নকল করে মুহূর্তেই হাজারটা গান বানিয়ে দিতে পারবে। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এআই কি সত্যি জানে সেই ‘অচিন পাখি’র রহস্য? কোটি কোটি ডেটা প্রসেস করার ক্ষমতা থাকলেও সিলিকন চিপের কোনো হৃদস্পন্দন নেই, নেই কোনো আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা বা ভাঙা গড়ার আত্মিক অনুভূতি। এআই যে গান বানায়, তা শুধুই গাণিতিক হিসাবের গণনানির্ভর ফসল; কিন্তু লালন বা নজরুলের গানের পেছনে যে রক্তমাংসের অনুভূতি, প্রেম, দ্রোহ ও জীবন্ত প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে থাকে তা সৃষ্টি করা কোনো যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ প্রযুক্তি গান বানাতে পারে, কিন্তু বুকের ভেতর খাঁচার অচিন পাখিকে অনুভব করার ক্ষমতা শুধুই মানুষের।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো দশ সেকেন্ডের কম সময়ে চমৎকার কোনো কবিতার ফ্রেম বা সমালোচনার খসড়া বানিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু তার নিজের কোনো ‘বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা’ নেই। তার কোনো অন্তর্গত বিষাদ নেই। ফ্রস্ট বা নজরুলের কবিতার তীব্র অনুভূতির রূপ কিংবা পরোক্ষ ‘ডার্ক হিউমার’ বোঝার মতো স্পিরিট অ্যালগরিদমের অনুপস্থিত। এআই বিশাল তথ্যের মহাসমুদ্র ঘেঁটে উত্তর দেবে ঠিকই, কিন্তু সে ‘মানুষ’ হতে শেখাবে না।

অথচ বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা এক ভিন্ন দৃশ্য দেখি। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের মতো শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইতিহাস, দর্শন ও ধ্রুপদী সাহিত্যকে এখনো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মূল স্তম্ভ ধরা হয়। কারণ তারা বোঝে শুধু যন্ত্র দিয়ে সভ্যতা টিকে থাকে না; সভ্যতা টিকে থাকে একটি জাতির নীতি, চিন্তা ও সম্মিলিত ঐতিহাসিক চেতনা ও বোধের ওপর। এমনকি এমআইটির মতো বিশ্বসেরা টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানেও এখন STEM (Science, Technology, Engineering, Math)-এর সাথে A (Arts) যুক্ত হয়ে তা STEAM-এ রূপান্তরিত হয়েছে। গুগল বা অ্যাপলের মতো জায়ান্ট প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখন শুধু কোডার খুঁজছে না, তারা খুঁজছে এমন মানুষ যে চারুকলা বোঝে, মানবিক মনস্তত্ত্ব বোঝে এবং উপস্থাপনায় আবেগ সঞ্চার করতে পারে।

কারণ টেকনিক্যাল খাটুনিটুকু এআই সামলে নিলেও, নতুন যুগের ‘ইউনিক আইডিয়া’ বা মানবিক স্পর্শের জন্য সেই সৃজনশীল মানুষের কাছেই ফিরে আসতে হয়। আমাদের ট্র্যাজেডি হলো, আমরা শিক্ষাকে কেবল জিপিএ, বিসিএস বা মোটা অঙ্কের চাকরির স্কেলে মাপতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা শিশুদের রোবট বানাচ্ছি, অথচ ভুলে যাচ্ছি পরীক্ষার খাতায় ১০০ পাওয়ার চেয়েও মনের ভেতর অন্যের জন্য মায়াবোধ ও মানবিকতা থাকাটা কতটা জরুরি। তবে এই যুগের সাথে তাল মেলাতে আর্টস ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীদেরও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। নিজেদের শেকড়, সাহিত্য ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে আন্তর্জাতিক স্তরে বিশ্বমানের উপস্থাপনা শিখতে হবে।

দিনশেষে অ্যালগরিদমের যে 'পারমাণবিক শীত' বা প্রযুক্তির ডিসটোপিয়া আমাদের তাড়া করে ফিরছে, তার ফাঁকফোকর দিয়ে আশার আলো এক জায়গায় এআই নিজে থেকে নতুন কোনো মৌলিক আবেগ সৃষ্টি করতে পারে না। দিনশেষে এআই আমাদের পৃথিবীর সব তথ্য এনে দিতে পারে, কিন্তু 'মানুষ' হতে শেখাতে পারে না। 

অ্যালগরিদমের হাতে তৈরি সাহিত্য বা শিল্পে নিখুঁত হিসাব থাকতে পারে, কিন্তু তাতে থাকে না কোনো প্রাণের স্পন্দন। এই যান্ত্রিক জমানায় দাঁড়িয়ে ইতিহাস পড়া, সাহিত্য চর্চা করা কিংবা ক্যানভাসে তুলি ছোঁয়ানোটা শুধু পড়াশোনা নয় এটা রোবট হওয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। তাই প্রযুক্তির অন্ধ প্রতিযোগিতার ভিড়ে নিজেদের ভেতরের রক্তমাংসের, নীতিবান ও স্বাধীন চিন্তার মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখাই হোক আমাদের চূড়ান্ত অন্বেষণ।

লেখক: দেওয়ান ফারহান কবীর, প্রভাষক, ইতিহাস

মিশরের জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক সারাহ খলিফাসহ ১২ জনের মৃত্যুদণ…
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের বাজারে কমল সোনার দাম, ভরিতে কত
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিনা সুদে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডিজিটাল ঋণ সুবিধা, পাবেন যা…
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একাই নদীর আবর্জনা পরিষ্কার করে ভাইরাল যুবক, পেলেন ডাচ কোম্প…
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজেহাসপাতালে  ৪ হাজার রোগীর জন্য ১৫ লিফট…
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাবার নিজ জেলায় প্রথম সফর নিয়ে আবেগঘন পোস…
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9