ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী ভাতা: নৈতিকতার কণ্ঠ কি আরও জোরালো হবে?

১৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৮ PM
মো. ওয়াকিলুর রহমান

মো. ওয়াকিলুর রহমান © টিডিসি ছবি

মানবসভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস থেকেই ইমাম, পুরোহিত, পাদ্রি ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতারা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, নৈতিকতা চর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাঁদের শিক্ষা শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং চরিত্র গঠন, আত্মসংযম এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরিই ছিল সেই শিক্ষার মূল ভিত্তি। প্রকৃতপক্ষে মসজিদ, মন্দির ও গির্জাকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রাচীনকাল থেকেই ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

উল্লেখ্য, এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মূলত স্থানীয় জনগণের অনুদান ও সহায়তার ওপর নির্ভর করেই পরিচালিত হয়ে আসছে। গ্রামীণ অঞ্চলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে সামান্য উৎপাদন করত, তার একটি অংশ সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ধর্মীয় গুরুদের প্রদান করত। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ইমাম ও অন্যান্য ধর্মীয় গুরু স্থানীয় জনগণের সহায়তার ওপর নির্ভর করেই তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ সরকারি স্বীকৃতি ও সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন মসজিদ, মন্দির, গির্জায় যারা বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে থাকেন তাঁরা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় সম্মানী থেকে বঞ্চিত ছিলেন। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন সময় সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ইমাম, পুরোহিত ও ধর্মীয় সেবকদের বেতন-ভাতার বিষয়টি দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। ফলে তাঁদের অনেকেই ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে ধাপে ধাপে ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কি তাঁদের নৈতিকতার কণ্ঠকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে প্রচার করতে সহায়তা করবে?

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যভিচার, মাদক গ্রহণ ও বিক্রয় এর বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। অথচ অতীতে এসব অবক্ষয় রোধে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল। সমাজে দুর্নীতিবাজ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের ঘৃণার চোখে দেখা হত, তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনও অনেকে এড়িয়ে চলতেন। আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখত। একসময় কেউ হঠাৎ অঢেল অর্থসম্পদের মালিক হলে সমাজ তার উৎস সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু এখন সেই বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অর্থ ও ক্ষমতাই এখন সামাজিক মর্যাদার প্রধান মাপকাঠি, তা যেভাবেই অর্জিত হোক না কেন। ফলে মানুষ অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনে মরিয়া হয়ে উঠছে, তা বৈধ কিংবা অবৈধ যেকোনো উপায়েই হোক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ বিষয়ে সমাজ কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় নেতাদের তেমন দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ায় বিষয়টি এক ধরনের সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।

তবে প্রশ্ন হল— এই পরিস্থিতির উন্নতি কি সম্ভব? আমার মতে, অবশ্যই সম্ভব। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো দুর্নীতি ও মাদককে ঘৃণা করে। কিন্তু সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে তারা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজে কেউ সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ বা নেশাগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত হতে চায় না। এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো গেলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর এর জন্য প্রয়োজন অংশীজনদের প্রকৃত অংশগ্রহণ।

এই ক্ষেত্রে প্রধানতম অংশীজন হলো রাষ্ট্র বা সরকার। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অনেক কঠিন সমস্যারও সমাধান সম্ভব। বর্তমান সরকার ঘুষ, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে এসব নির্মূলে কাজ করছে। তবে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সময়সাপেক্ষ। এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন।

আর এই সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন ধর্মীয় নেতারা— বিশেষ করে মসজিদ, মন্দির ও গির্জার সেবকরা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। অতীতে বহু ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতারা ইতিবাচক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। যেমন, দেশে চরমপন্থার বিস্তার রোধে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণা কিংবা করোনা মহামারির সময় টিকা গ্রহণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও মসজিদভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। ঠিক তেমনি, দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে ধর্মীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য অর্জনকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আমি দূঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। 

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মানী চালুর মাধ্যমে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে। ঘোষিত মাসিক সম্মানীর পরিমাণ অনুযায়ী প্রতিটি মসজিদের জন্য ১০,০০০ টাকা এবং মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের জন্য ৮,০০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের পদমর্যাদা অনুযায়ী ৫,০০০, ৩,০০০ ও ২,০০০ টাকা হিসেবে বণ্টন করা হবে। এই আর্থিক সহায়তা তাঁদের স্থানীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীনির্ভর চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত করবে এবং মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও দৃঢ়ভাবে কথা বলার সাহস জোগাবে।

এক্ষেত্রে অবশ্যই ধর্মীয় রেফারেন্সভিত্তিক দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচার করা গুরুত্বপূর্ণ। ইমামরা সাপ্তাহিক খুতবায় সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরতে পারেন। একইভাবে অন্যান্য ধর্মীয় নেতারাও নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে একজন ধর্মীয় নেতার অন্তর্ভুক্তি, যা সরকারের পক্ষ থেকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এসব আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে ধর্মীয় নেতারা সাহসী ও গঠনমূলক পরামর্শ দিলে সামাজিক আন্দোলন আরও শক্তিশালী হতে পারে।

বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী দেশে প্রায় তিন লক্ষ মসজিদ, প্রায় চল্লিশ হাজার মন্দির এবং কয়েক হাজার গির্জা রয়েছে। নিবন্ধিত উপাসনালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত সম্মানী প্রদান রাষ্ট্রের জন্য একটি নির্দিষ্ট আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি করবে। তবে সামাজিক স্থিতিশীলতা, নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং অপরাধপ্রবণতা হ্রাসের মাধ্যমে এর সামাজিক ‘রিটার্ন’ নিঃসন্দেহে অনেক বেশি হবে। আসলে, ধর্মীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে মাদক ও দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপও কিছুটা কমাবে। তবে শুধু আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়, এই উদ্যোগকে কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন— 

প্রথমত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছ নিবন্ধন ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় নেতাদের জন্য নৈতিকতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও নাগরিক দায়িত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত, ধর্মীয় বক্তব্যে সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা জোরদার করা।
চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা।
পঞ্চমত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। 

এই পাঁচটি বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকের মতো ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। সদিচ্ছা, সুশাসন ও সমন্বিত প্রয়াস একত্রে কাজ করলে আজকের এই উদ্যোগ আগামী দিনে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। সর্বোপরি, রাষ্ট্র ও ধর্মীয় নেতৃত্ব যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে আসে, তবে নৈতিকতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠন আর স্বপ্ন হয়ে থাকবে না,তা বাস্তবতায় রূপ নেবে।

মো. ওয়াকিলুর রহমান
প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, 
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

তারুণ্যের চোখে ঈদ: ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মিলনের বহুরঙা অনুভ…
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
‘চাকরির বয়স ৪০ বছর, এই প্রথম কোনো শিক্ষার্থীর হাতে আমাকে মা…
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী ভাতা: নৈতিকতার কণ্ঠ কি আরও জো…
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ে জাবিসাসের আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়াম অ…
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
রমজানের সংযমে ঈদের আনন্দ: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভাবনা…
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
ঈদের তারিখ ঘোষণা করল তুরস্ক ও সিঙ্গাপুর
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence