মাননীয় স্পিকার, আমরা নতুন বাংলাদেশ চাই

১৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৭ PM
মুহম্মদ সজীব প্রধান

মুহম্মদ সজীব প্রধান © টিডিসি সম্পাদিত

ছোট্ট একটি ক্যামেরার লেন্সে আটকে যায় বিস্তৃত আটলান্টিক কিংবা সুউচ্চ হিমালয়। আলোর প্রতিফলনে তৈরি এক টুকরো ফটোগ্রাফি দেখেই আমরা সমুদ্র ও হিমালয়ের সৌন্দর্যকে অনুভব করি। সমুদ্রের বিস্তৃতি ও হিমালয়ের উচ্চতা কতটা সেটাও অনুধাবন করার চেষ্টা করি। প্রতিটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও এমন একটি লেন্স আছে, যেখানে সরকার ও জনগণের স্পষ্ট প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ হল সেই লেন্স, যেখানে সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশে বড়সড় একটি গণঅভ্যুত্থানের পর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিরা সংসদে যাচ্ছেন। তাই তাঁদের ওপর জনগণের প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে। ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে যেকোনো জাতি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চায়। বাংলাদেশের জনগণও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ যখন বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত তখন তৃষ্ণার্ত জনগণের মনের কথা কি মহান সংসদে আদৌ কেউ বলে? যদি একজন রিক্সাওয়ালা, কৃষক, উদ্যোক্তা, পোশাক শ্রমিক, নির্যাতিত নারী কিংবা একজন বেকার তরুণ সংসদে কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে কী বলতেন? ওনারা হয়তো মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বলতেন–

‘মাননীয় স্পিকার, আমরা নতুন বাংলাদেশ চাই। নতুন বাংলাদেশ ১৮ কোটি জনগণের নিছক স্বপ্ন নয়, এটি পূর্ণিমার চাঁদের মতই বাস্তব হবে যদি বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো আমরা সাহসের সঙ্গে নির্মূল করতে পারি। মাননীয় স্পিকার, বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল দুর্নীতি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে দেখা যায় যে, দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, কাজের মান কমে এবং জনগণের করের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হয় না। দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না বরং এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। যখন একজন যোগ্য নাগরিক দেখে যে, মেধা ও সততার চেয়ে অনৈতিক প্রভাব বেশি কার্যকর তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার বিশ্বাস ক্ষীণ হয়ে যায়। তাই বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিতে হলে সর্বপ্রথম দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে হবে।

মাননীয় স্পিকার, বিচারহীনতা বাংলাদেশের আরেকটি গভীর সংকট। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকারিতা হারায়। অপরাধী যদি শাস্তির ভয় না পায় তবে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হয়। একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য।

মাননীয় স্পিকার, রাজনৈতিক সম্প্রীতির অভাব আমাদের জাতীয় অগ্রগতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। ভিন্নমত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য কিন্তু যখন সেই ভিন্নতা সংঘাত ও সহিংসতায় রূপ নেয় তখন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংলাপ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অন্যতম শর্ত। মাননীয় স্পিকার, বাংলাদেশের জনগণ বহির্বিশ্বে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে চায়। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের নীতিগত অবস্থান দৃঢ় ও বাস্তবসম্মত হওয়া জরুরি। কূটনৈতিক দূরদর্শিতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশকে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মাননীয় স্পিকার, অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করা আমাদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু সেই আয়ের সুষম বণ্টন এখনো নিশ্চিত হয়নি। শহর ও গ্রামের উন্নয়নের পার্থক্য, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং সুযোগের বৈষম্য অনেক নাগরিককে উন্নয়নের মূলধারা থেকে দূরে রাখছে। একটি টেকসই অর্থনীতি গড়তে হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

মাননীয় স্পিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গৌরব। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ যুগ যুগ ধরে সহাবস্থানের ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সেই সম্প্রীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আন্তঃধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজন বাংলাদেশের জন্য কার্বন মনোক্সাইডের মতো নীরব ঘাতক, যা ধীরে ধীরে জাতীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই সাম্প্রতিক সম্প্রীতিতে ফাঁটল সৃষ্টি হয় এমন সকল কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

মাননীয় স্পিকার, রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু নারী এখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, পারিবারিক সহিংসতা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। বিশেষ করে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত নারীরা বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে কম মজুরি, অনিরাপদ পরিবেশ এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন। একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

মাননীয় স্পিকার, শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার মান সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি। পরীক্ষামুখী শিক্ষা, গবেষণার সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্বও বাড়ছে, যা অর্থনীতি ও সমাজ উভয়ের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। জাতির মেরুদণ্ডের এই করুণ ক্ষয় রোধ করতে এখনই সচেষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে।

মাননীয় স্পিকার, পরিবেশগত সংকট আজ বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশ এই সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও নদী দূষণ, বন উজাড় এবং বায়ুদূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পরিবেশ রক্ষা করা মানে কেবল প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব। ধন্যবাদ, মাননীয় স্পিকার।’

বাংলাদেশের প্রায় ১৩ কোটি ভোটার চায় সংসদ হোক এমন এক সাংবিধানিক মঞ্চ যেখানে রাষ্ট্রের সংকট ও সম্ভাবনা, মানুষের আশা ও বেদনা, স্বপ্ন ও বাস্তবতার প্রতিধ্বনি সমান গুরুত্বে উচ্চারিত হবে। গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে যখন সংসদের দেয়ালের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয় জনতার কণ্ঠস্বর। নীতিনির্ধারণের প্রতিটি শব্দে প্রতিফলিত হয় জনগণের আকাঙ্ক্ষা।

তবে শুধু সংসদে অগ্নিঝরা বক্তৃতা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শব্দের দীপ্তি তখনই অর্থবহ হয় যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় কার্যকর উদ্যোগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সংসদের ভেতরে যেমন প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর বিতর্ক, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তেমনি সংসদের বাইরে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীলতা, সহমর্মিতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যখন সমবেত সুরে কাজ করবে তখনই সংসদের সাফল্য নাগরিক জীবনের বাস্তবতায় রূপ নেবে।

বাংলাদেশের মানুষ এই রাষ্ট্রকে কেবল মানচিত্রে আঁকা কোনো ভূখণ্ড হিসেবে পায়নি; পেয়েছে দীর্ঘ ত্যাগ, রক্ত ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে তারা নিজেদের স্বপ্নকে আগলে রেখেছে। তাই রাষ্ট্রের প্রতি তাদের প্রত্যাশাও খুব স্বাভাবিক অর্থাৎ একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে নাগরিকের মর্যাদা অটুট থাকবে, আইনের শাসন দৃঢ় হবে এবং উন্নয়নের আলো সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে সমাজের প্রতিটি স্তরে। অতএব অতীতের গ্লানি ভুলে, বিভেদের ধূসরতা পেছনে ফেলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর প্রতিটি নাগরিকের স্বপ্ন পূরণ হোক মহান সংসদে।

মুহম্মদ সজীব প্রধান
কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।
ই-মেইল: sajibprodhanbd@gmail.com

সাতকানিয়ায় একসঙ্গে জন্ম নেওয়া সেই পাঁচ শিশু পেল ঈদ উপহার
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
জাবি ছাত্রীর লাশ উদ্ধার—হত্যাকাণ্ড বলছে পুলিশ, স্বামী পুলিশ…
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
দলীয় বিবেচনায় জেলা প্রশাসক নিয়োগ অগণতান্ত্রিক : সারজিস আলম
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
শপিং ব্যাগের দাম নেওয়া বন্ধে আড়ংকে আইনি নোটিশ
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
বেফাকের ৪৯তম কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা
  • ১৫ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence