জুলাই গণ-আন্দোলন: ন্যারেটিভ, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় বৈধতা

১৭ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫৩ PM , আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫৩ PM
শেখ আব্দুল্লাহ্ ইয়াছিন

শেখ আব্দুল্লাহ্ ইয়াছিন © টিডিসি ফটো

‘শেখ হাসিনা পালিয়েছেন’— এই কথাটি মূলত একটি আবেগী কথা। অনেকেরই মনে থাকার কথা ৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনার পালানোর খবর ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন মূলধারার অনেক গণমাধ্যম সংবাদ প্রচার করেছিল ‘শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেছেন।’ এখানে লক্ষণীয় যে, দেশত্যাগ এবং পালিয়ে যাওয়া— এই দুটি বিষয় এক নয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয় যে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাননি; বরং তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল এবং তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগও করেননি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা কি আদৌ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন? যদি তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে থাকেন, তবে সেই পদত্যাগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হল না কেন? যদিও প্রজ্ঞাপন জারি করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি বিবৃতি পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্নটি এখনো অনুত্তরিত রয়ে গেছে।

যদি ধরে নেওয়া হয় যে তিনি সত্যিই পালিয়ে গেছেন, তবে পদত্যাগপত্রের প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি বলা হয় তিনি পালাননি, বরং স্বাভাবিকভাবে দেশত্যাগ করেছেন, তাহলে পদত্যাগপত্রের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ঘটলে এই বিতর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত এটি একটি ন্যারেটিভের খেলা।

ধরা যাক, শেখ হাসিনা সত্যিই পালিয়েছেন— এই ন্যারেটিভকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হল। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে। সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে মন্ত্রীসভাও পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হয়। সংবিধানের ৫৭(৩)-এ বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি তার পদে অন্তবর্তী হিসেবে বহাল থাকবেন।

একই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যদি পদত্যাগের পর সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিতে পারবেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সংসদ ভাঙার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হল, যদি শেখ হাসিনা সত্যিই পালিয়ে যান, তাহলে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেবেন কে? আবার সংসদ ভেঙে দিলে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করার বিধান রয়েছে। ফলে একটি সাংবিধানিক সংকট বা শূন্যতার সৃষ্টি হয়। যার ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রসঙ্গ আসে, যা আবার সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ নেই। ফলে প্রশ্ন ওঠে পুরো বিষয়টি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হল?

৫ আগস্ট ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালানোর পর দেশে একটি সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। একে সাংবিধানিক শূন্যতা বলা হচ্ছে এই কারণে যে, এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো কার্যরত প্রধানমন্ত্রী এভাবে পালিয়ে যাননি। ফলে সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সে সময় মূলত দুটি পথ খোলা ছিল—
১. সংবিধান স্থগিত বা বাতিল করে প্রোক্লেমেশন জারি করে একটি বিপ্লবী সরকার গঠন করা।
২. বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যেই এই সংকটের সমাধান খোঁজা।

বাস্তবে দ্বিতীয় পথটিই গ্রহণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল— সংবিধানের কোথাও সরাসরি ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ বা এই সংকট সমাধানের উত্তর দেওয়া নায়। তাহলে কীভাবে সমাধান খোজা? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ‘precedent’ বা পূর্ববর্তী নজির অনুসরণের বিষয়টি সামনে আসে। যখন কোনো রাষ্ট্রে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তখন  সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অনেক সময় Doctrine of Necessity প্রয়োগ করে থাকেন।

জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিষয়টি কার্যকর হয় এভাবে— সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে সংবিধানের অভিভাবক সর্বোচ্চ আদালতের কাছে Advisory Opinion চান। ১০৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হয় যে আইনের কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে বা উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে, এবং সেই প্রশ্নটি এমন ধরনের ও জনগুরুত্বপূর্ণ যে এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তবে রাষ্ট্রপতি বিষয়টি আপিল বিভাগের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করতে পারবেন। আপিল বিভাগ প্রয়োজনীয় শুনানি শেষে রাষ্ট্রপতিকে তাদের মতামত জানাতে পারবে।’ মূলত এই অনুচ্ছেদের আওতায় সুপ্রিম কোর্ট একটি মতামত প্রদান করে এবং সেই মতামতের ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পথ তৈরি হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যদের শপথ পড়ান।

মূলত এই ধরনের সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় আদালতের পরামর্শকে ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি নজির তৈরি হয়। অনেক সময় রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে আদালত ‘Doctrine of Necessity’—অর্থাৎ প্রয়োজনের তত্ত্ব অনুসরণ করে থাকেন। ইতিহাসে বিভিন্ন দেশে সাংবিধানিক অচলাবস্থা বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এই নীতির প্রয়োগ দেখা গেছে।

তবে এটিও সত্য যে ১০৬ অনুচ্ছেদের আওতায় দেওয়া মতামত সাধারণত একটি পরামর্শমূলক অপিনিয়ন (advisory opinion)। ভবিষ্যতে কেউ চাইলে সেই মতামতের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে বা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে বা আপিল করতে পারে। যদিও বাস্তবে এমন উদ্যোগ সবসময় দেখা যায় না, তবুও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যাই হোক পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং নির্দিষ্ট সময় পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়।

উপরের পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন হয়— শুরু থেকে নির্বাচন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি কি সম্পূর্ণভাবে সংবিধান মেনে হয়েছে? বাস্তবতা হল, তা পুরোপুরি হয়নি। রাষ্ট্র আবেগ মেনে চলে না এই কথা যেমন সত্য, তেমনি জুলাই আন্দোলন এবং এর পরবর্তী ঘটনাসমূহও জনআবেগ। সাংবিধানিক শূন্যতার মুহূর্তে যে Doctrine of Necessity অনুসরণ করতে হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল জনগণের দাবি বা people’s demand। এই পিপলস ডিমান্ড রক্ষাটাও আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

একইসাথে কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দেওয়াটাও অনেকাংশে ভুল আবেগের প্রকাশ। সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দলিল, যা রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত হতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য এত জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হত না, যদি প্রচলিত নিয়ম মেনে সংসদ ভেঙে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা যেত। সেই ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে নিয়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হয়নি। কারণ এখানে সংবিধান মেনে নয়, সব হয়েছে জন-আকাঙ্ক্ষা মেনে। অন্যদিকে বিতর্কের খাতিরে যদি ধরি শেখ হাসিনা পালান নাই, দেশত্যাগ করেছেন এই ন্যারেটিভটি সত্য— তাহলে উপরের সকল আলাপই মিথ্যা, অযৌক্তিক এবং অসাংবিধানিক ঠেকবে।

বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটলের মতে, একটি ধারণা সত্য হলে বাকি সবটুকু মিথ্যা। তার ভাষায় একই ধারণা সম্পর্কে একই সাথে, একই সময়ে এবং একই প্রেক্ষাপটে কোন কিছু একইসাথে সত্য বা মিথ্যা হওয়া অসম্ভব। একে দর্শনশাস্ত্রে Law of non-contradiction বলে। সুতরাং যদি জুলাই জন-আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পলায়ন, সংসদ ভেঙে দেওয়া, সাংবিধানিক সংকট তৈরি, সমাধানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি সত্য হয়ে থাকে, তবে জুলাই সনদসহ এর সাথে জড়িত সকল কার্যক্রম সত্য হবে। এসব একে অন্যের সাফল্য একসূত্রে গাঁথা। অন্যথায় শেখ হাসিনার পালায়ন থেকে বর্তমান সংসদ সবটুকু অসত্য হবে।

শেখ আব্দুল্লাহ্ ইয়াছিন
লেখক ও সাংবাদিক

হরমুজ প্রণালিতে ফ্রান্সকে না টানলেই ভালো হবে, ‘সাফ’ জানালেন…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
যেসব অঞ্চলে রাতের মধ্যে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
টাঙ্গাইলে বাসচাপায় সিএনজি চালকসহ দুই বন্ধু নিহত
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
ইসরায়েল ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পকে ‘ভুল পথে পরিচালিত …
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ নেবে শিক্ষক-প্রদর্শ…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
জুলাই গণ-আন্দোলন: ন্যারেটিভ, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় বৈধতা
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence