নিয়োগ হাইকোর্টের সহায়কের, কাজ করানো হয় বিচারপতির বাসায় বাবুর্চি-ধোপা-সুইপারের

দাসপ্রথার সঙ্গে তুলনা

০৪ মে ২০২৬, ০৮:২৭ PM , আপডেট: ০৪ মে ২০২৬, ০৮:২৭ PM
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন ভুক্তভোগী অফিস সহায়করা

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন ভুক্তভোগী অফিস সহায়করা © ভিডিও থেকে নেওয়া

উচ্চ আদালতের অফিস সহায়কদের (এমএলএসএস) আবারও বিচারপতিদের বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মীরা। আজ সোমবার (৪ মে) সকালে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এই অভিযোগ করেন তারা। বাসা-বাড়িতে কাজে বাধ্য করার বিষয়টিকে ‘দাসপ্রথা’র সঙ্গে তুলনা দিয়ে এটি বাতিলের দাবি জানান এসব অফিস সহায়ক।

তারা বলেন, সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পেলেও বিচারপতিরা নানা প্রলোভন দেখিয়ে এসব অফিস সহায়ককে বাসা-বাড়িতে পোস্টিং নিয়ে দিতেন। সেখানে গৃহকর্মীর কাজে বাধ্য করতেন তাদের। এক্ষেত্রে বাবুর্চি, ধোপা, ফরাশ বা সুইপারের মতো কাজও বাদ যেত না। এ ছাড়া শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নেরও অভিযোগ তুলেছেন তারা।

তাদের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ এই প্রথা বাতিল করলেও নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর সম্প্রতি পুনরায় তাদের বাসা-বাড়িতে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ করে ভুক্তভোগী এক অফিস সহায়ক সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের নিয়োগ সার্কুলারে ছিল অফিস ডিউটি। বাসায় ডিউটির কথা উল্লেখ ছিল না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন আমরা বাসা-বাড়িতে কর্মরত ছিলাম। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ তিনজনের সমন্বয়ে বিচারপতি কমিটি গঠন করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সবাই অফিসে চলে আসি। আমরা অফিসে আরামে ডিউটি করছিলাম এতদিন। কিন্তু দীর্ঘদিন অফিসে ডিউটি করার পরে হঠাৎ করে আমাদের প্রশাসন সবাইকে পোস্টিং দিয়ে বাসা-বাড়িতে আবার নতুনভাবে দাসপ্রথা চালু করেছে।

আরও পড়ুন: অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

তিনি বলেন, আমাদের সাথে অনেক ভাই ও বোনেরা আছেন, তারা দীর্ঘদিন বাসা-বাড়িতে ডিউটি করার কারণে সাপ্তাহিক কোনো ধরনের ছুটি পায়নি। ঈদের দিনও ডিউটি করানো হয়েছে, আমি নিজেই এর ভুক্তভোগী। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা আর বাসা বাড়িতে যেতে চাচ্ছি না। আমাদের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু ওটার কোনো রেসপন্স পাইনি।

আমি স্যারদের কাছে বিনীত আবেদন করব যে আমাদের চাকরি না নিয়ে আমাদেরকে ফাঁসির অর্ডার দিয়ে দেন। আমরা মরে যেতে চাই। চাকরি না হওয়া এক কথা, আর চাকরি হয়ে চলে যাওয়া এক কথা। আমরা বাড়িতেও যেতে পারব না, আমরা সমাজে মুখও দেখাব না। তার থেকে আমাদেরকে ফাঁসির অর্ডার দেন, এটাই ভাল হয়— ভুক্তভোগী নারী কর্মী

বিচারপতিদের বাসায় বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও জুলুমের শিকার হতে হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিচারপতিরা প্রতি মাসে ডোমেস্টিক অ্যালাউন্স বাবদ সরকার থেকে ৩২ হাজার টাকা পান। কিন্তু আমাদেরকে বাসায় নিয়ে কোনো বাসায় তারা সিকিউরিটি রাখেন না, বাবুর্চি রাখেন না। উল্টো আমাদেরকে বিভিন্নভাবে কাজ করান। বাবুর্চি, ফরাশ, সুইপার থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজ করতে হয়।

অপর এক অফিস সহায়ক বলেন, আমরা যে নিয়োগ পেয়েছি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে, এটা একটা সরকারি প্রজাতন্ত্রের চাকরি। আমরা সার্কুলার দেখে আসছি, আমাদের অফিস সহায়কের কাজ। কিন্তু বিচারপতিরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্নভাবে আমাদের তাদের বাসা-বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে অত্যাচার করে আমাদের ওপর, আসলে আমরা নির্যাতিত। হাইকোর্টে আমাদের দেখার মত কোনো লোক নাই। আমাদের কথা শোনার মত কেউ নাই। আমরা যে সরকারি কর্মচারী, এটা হাইকোর্ট মনে করে না।

আরও পড়ুন: নারী-শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ, খালাস ৭০

এক নারীকর্মী বলেন, আমাদেরকে বলা হচ্ছে আমাদের নামে মামলা দেবে, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিংবা চাকরি চলে যাবে। আমি স্যারদের কাছে বিনীত আবেদন করব যে আমাদের চাকরি না নিয়ে আমাদেরকে ফাঁসির অর্ডার দিয়ে দেন। আমরা মরে যেতে চাই। চাকরি না হওয়া এক কথা, আর চাকরি হয়ে চলে যাওয়া এক কথা। আমরা বাড়িতেও যেতে পারব না, আমরা সমাজে মুখও দেখাব না। তার থেকে আমাদেরকে ফাঁসির অর্ডার দেন, এটাই ভাল হয়।

বিচারপতিবাদের বাসা-বাড়িতে শিশু থেকে গৃহকর্মীদের কাছেও ‘ছোট’ হয়ে থাকতে হয় জানিয়ে এই নারী বলেন, আমরা তো অফিসে একটা স্যার পাই, আর ওখানে সবাই স্যার। ছোট আসুক, বড় আসুক সবাই স্যার। আমাদের কাজের লোকেরও কাজ করতে হয়। কাজের লোকেরা বসে থাকবে, ওদেরকে আমাদেরকে সম্মান করতে হবে। ওরা যদি স্যারদের কানে কোনো কথা লাগায়, সেটার বিপক্ষে কথা বললে আমাদেরকে মামলা দেয়, আমাদেরকে জুলুমের শিকার হতে হয়।

নিজে অসুস্থতাজনিত কারণে কাজে যেতে না পারায় চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার চাকরি চলে গেছে আট মাস। আমি অসুস্থ হয়েছিলাম। জ্বর-কাশি হয়েছিল আমার, নিউমোনিয়া। আমি বলেছি, স্যার আমি অসুস্থ, যাব না। যার জন্য মামলা দিয়ে আমার চাকরি চলে যায়। পরে ২৪ সালে আন্দোলনের পরে চাকরি আবার ফেরত দেয়, কিন্তু আট মাস আমার আবেদন থেকে শেষ। আবারও আমাকে বাসায় দিয়েছে। আমি রেজিস্টার স্যারকে বলেছি, স্যার আমাকে বাসায় দিয়েন না। আমি বাসায় পারব না। তারপর আবার সেই স্যার নাকি আমাকে নোটিশ দিয়েছে নাকি মামলা দিয়েছে, আমি হাতে পাইনি, তবে শুনেছি। এটা একটা দাসপ্রথা, যা গিয়ে বুঝেছি। আসলে এটা চাকরি না। আমরা আসলে দাসপ্রথায় থাকতে চাই না। আমরা অফিসে থাকতে চাই।

আরও পড়ুন: হাইকোর্টে আওয়ামীপন্থিদের অবস্থানের প্রতিবাদে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বিক্ষোভ

উল্লেখ্য, উচ্চ আদালতের ৩২ বিচারপতির বাসায় সরকারি কর্মচারীকে দিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করতে বাধ্য করানোর অভিযোগ ওঠে ২০২৪ সালে। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীরা তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের কাছে আবেদন করেন। এতে ১৯ বিচারপতির পরিবারের বিরুদ্ধে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের কথা উঠে আসে। এ ছাড়া ১৬ বিচারপতি ও সাতজনের পরিবারের বিরুদ্ধে বলা হয়, তাদের মুখের ভাষা অশালীন। এ বিষয়ে তিন সদস্যের জাজেস কমিটি গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এই কমিটিতে ছিলেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, শশাঙ্ক শেখর ও আশফাকুল ইসলাম। পরে বাসা-বাড়িতে কাজ করানোর প্রথা বাতিল করে এই কমিটি।

ওই সময়ে জানা যায়, একজন বিচারপতি প্রতি মাসে ৩২ হাজার টাকা গৃহস্থালি ভাতা পান। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে বিচারপতির আদালতের চেম্বারের জন্য একজন পিয়ন এবং বাসার কাজের জন্য একজন করে দারোয়ান ও বাবুর্চি দেওয়া হয়। তবে বেশ কয়েকজন বিচারপতি প্রভাব খাটিয়ে তাদের বাসায় দুই থেকে ছয়জন এমএলএসএস নিয়ে যান। এর মধ্যে চার অবসরপ্রাপ্তসহ হাইকোর্ট বিভাগের ৩২ বিচারপতির বাসায় ১০ নারীসহ ৭০ জন এমএলএসএসকে কাজে বাধ্য করানোর অভিযোগ ওঠে।

জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে দাপ্তরিক কাজের সহায়তার জন্য ৪৫৪ জন এমএলএসএস কর্মরত ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই এসএসসি পাস। কেউ কেউ স্নাতকোত্তর কিংবা এমবিএ ডিগ্রিধারীও রয়েছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০১৪ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এমএলএসএস পদের নতুন নাম অফিস সহায়ক। তাদের কাজ মূলত অফিসে সীমাবদ্ধ। ১৯৬৯ সালের পরিপত্র অনুযায়ী, অফিস সহায়করা অফিসের আসবাব ও রেকর্ড সুন্দরভাবে বিন্যাস, ফাইল ও কাগজপত্র স্থানান্তর, হালকা আসবাব সরানো, ফাইল অন্য অফিসে নেওয়া, কর্মকর্তাদের পানীয়জল পরিবেশন, মনিহারি ও অন্যান্য জিনিস সংরক্ষণ, ইউনিফর্ম পরা, কর্মকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা, ভদ্র ব্যবহার করা, ব্যাংকে চেক জমা ও টাকা তোলা, ১৫ মিনিট আগে অফিসে আসা এবং বিনা অনুমতিতে অফিস ত্যাগ করবে না। কিন্তু আদালতের যেসব কর্মচারীকে বাসায় পাঠানো হয়, তাদের গৃহকর্মী, বাবুর্চি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতে বাধ্য করা হয়। সরকারি বন্ধের দিনও তাদের ছুটি দেওয়া হয় না।

কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ফেনী, উদ্বৃত্ত যাবে জেলার বাইরে
  • ১৯ মে ২০২৬
সরকারি পেনশনভোগীদের সুবিধাও বাড়ছে
  • ১৯ মে ২০২৬
শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, আবেদন ২…
  • ১৯ মে ২০২৬
জাবিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন, ২১ হলে লাগানো হবে দুই হ…
  • ১৯ মে ২০২৬
১ জুলাই থেকেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হবে: অর্থমন্ত্রী
  • ১৯ মে ২০২৬
এমসি কলেজের নতুন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ
  • ১৯ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081