প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গৃহবধূকে হত্যা
ভোলার আদালতে আসামি কবির © টিডিসি
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মুজিবনগর ইউনিয়নের শিকদারের চর এলাকায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গৃহবধূ বকুল বেগমকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত ৩ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, ২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বিভিন্ন ধারায় আরও কয়েকজনকে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। একই সঙ্গে একজন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (২৪ মে) দুপুরে চরফ্যাশন (চৌকি) আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন চরফ্যাশন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এডিশনাল জজ শওকত হোসাইন।
আদালত ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে দুলারহাট থানাধীন মুজিবনগর ইউনিয়নের শিকদারের চর ৯ নম্বর ওয়ার্ডে মো. আলম বাচ্চু মেলকারের বসতঘরের সামনের বারান্দায় ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় গৃহবধূ বকুল বেগমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসা তার বড় বোন মুকুল বেগমও হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে দুলারহাট থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে আদালত এ মামলার রায় প্রদান করেন।
আরও পড়ুন : রামিসা হত্যা: অভিযোগপত্র গ্রহণ, বিচারের জন্য বদলি
আদালত সূত্রে জানা যায় ,আদালত রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আব্দুল মালেক পণ্ডিত, মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও আব্দুল মান্নানকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এবং একই ধারায় মোহাম্মদ সেলিম ও মোহাম্মদ রফিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
এ ছাড়া অপরাধীকে পালাতে সহায়তা করার অভিযোগে দণ্ডবিধির ২১২ ধারায় মোহাম্মদ জসিম, মোহাম্মদ ফিরোজ ও মোহাম্মদ সোহাগকে ৩ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। দণ্ডবিধির ২০৩ ধারায় মোহাম্মদ আলম বাচ্চু মেলকারকে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডবিধির ১১০ ও ৪৩৬ ধারায় মোহাম্মদ কবিরকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
অন্যদিকে, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আসামি আজাদকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে পূর্বে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত তাৎক্ষণিকভাবে সাজা পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মামলার আলামত বিধি মোতাবেক নিষ্পত্তি এবং আদায়কৃত জরিমানার অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩ আসামির সাজা নিশ্চিতকরণের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী মামলার মূল নথি, রায়ের অনুলিপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
চরফ্যাশন আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট হযরত আলী হিরণ বলেন, “ন্যায়ের ভিত্তিতেই আদালত এ রায় দিয়েছেন। এতে নিহত পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে।”
রায় ঘোষণার পর বিচারক মো. শওকত হোসাইনকে আদালতের আইনজীবী ও স্থানীয়রা ধন্যবাদ জানান। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের আলোচিত এ মামলায় আদালত সাহসী ও সঠিক রায় দিয়েছেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভূমিকাও প্রশংসিত হয়েছে।