রাজধানীতে সক্রিয় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুলিতে নিহত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন © টিডিসি সম্পাদিত
রাজধানীর নিউমার্কেট সংলগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শহীদ শাহনেওয়াজ হলের সামনে অতর্কিত গুলিতে নিহত যুবক খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন দেশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করারও প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার সঙ্গে পুরান ঢাকার মামুন হত্যার সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
টিটন হত্যার পর আবারও আলোচনায় এসেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপটেন ইমন। ধারণা করা হচ্ছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইমন ও টিটন একসময় ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং পুরান ঢাকার অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন। টিটনের ছোট বোন নীলার সঙ্গে ইমনের বিয়ে হওয়ায় তাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কও ছিল।
দীর্ঘ কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মুক্তির পর ইমন বিদেশে চলে যান, আর টিটন দেশে অবস্থান করেন। এরপর থেকেই চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, নিহত টিটন রাজধানীর পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে—পুলিশ সদর দপ্তর
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে নীলক্ষেত সংলগ্ন বটতলা এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত টিটনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনার পরপরই হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা ধাওয়া দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এলাকা ত্যাগ করে। হামলাকারীদের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক থাকায় তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, টিটনের শরীরে মোট পাঁচটি গুলি লাগে—এর মধ্যে মাথায় তিনটি, হাতে একটি এবং বগলের নিচে একটি। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কারামুক্তি পাওয়া কয়েকজন সন্ত্রাসীর মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। তবে মুক্তির পর তিনি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেননি, যার কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও সহিংস অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে।
এদিকে একই কায়দায় এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সূত্রাপুরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দিনে-দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় তারিক সাইফ মামুনকে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তিনিও একসময় ইমনের সহযোগী ছিলেন এবং পরে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।
ডিবির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টিটন হত্যার পেছনে দুইটি সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে—একটি হলো বিদেশে থাকা ইমনের সঙ্গে আধিপত্য ও ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ, অন্যটি হলো পূর্ববর্তী কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ।
নিহত টিটন রাজধানীর পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।— শফিকুল ইসলাম, প্রধান, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, নিউমার্কেট, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, সূত্রাপুর ও গেন্ডারিয়াসহ পুরান ঢাকার বড় একটি অংশের অপরাধ জগৎ বর্তমানে ইমনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার নেটওয়ার্ক চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, টিটন হত্যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সঙ্গে ঘটনাটির কোনো যোগসূত্র আছে কি না এমন প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক কিছুই শোনা যাচ্ছে, বিভিন্নভাবে আলোচনা হচ্ছে, তবে এসব বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়ে কিছু বলছি না। আমরা আমাদের মতো করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ইমন ভুক্তভোগীর আত্মীয় সম্পর্কে শালা। তাদের মধ্যে কী ঘটেছিল, কোনো বিরোধ ছিল কি না সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে লিটনের বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পারিবারিক সূত্রের বরাতে তিনি বলেন, ভুক্তভোগীর সঙ্গে ইমনের কোনো বিরোধ ছিল এমন তথ্য পরিবার থেকে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকালে স্বজনরা আসার পর মামলা নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
ডিসি মাসুদ বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে রাজধানীতে আলোচিত মামুন হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এমন তথ্যও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে ইমন ও মামুনের মধ্যে ব্যক্তিগত পরিচয় বা বন্ধুত্ব থাকতে পারে যেহেতু তারা একসঙ্গে কারাগারেও ছিলেন।
টিটন হত্যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সঙ্গে ঘটনাটির কোনো যোগসূত্র আছে কি না এমন প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক কিছুই শোনা যাচ্ছে, বিভিন্নভাবে আলোচনা হচ্ছে, তবে এসব বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়ে কিছু বলছি না। আমরা আমাদের মতো করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।— মো. মাসুদ আলম, উপ-কমিশনার, রমনা বিভাগ, রমনা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
টিটন হত্যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সঙ্গে ঘটনাটির কোনো যোগসূত্র আছে কি না এমন প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক কিছুই শোনা যাচ্ছে, বিভিন্নভাবে আলোচনা হচ্ছে, তবে এসব বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়ে কিছু বলছি না। আমরা আমাদের মতো করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
আরও পড়ুন: পদোন্নতি-চাকরির বয়স বৃদ্ধিসহ ছয় দাবি ঢাবি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, রেজিস্ট্রার অবরুদ্ধ
এ তালিকায় আলোচিত সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে রাসু বা ফ্রিডম রাসু। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালের নাম উঠে এসেছে। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইমন। এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কুপিয়ে জখমের ঘটনায়ও ইমনের সহযোগীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার নজরে থাকা অন্যদের মধ্যে রয়েছে কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, ফ্রিডম রাসু এবং মফিজুর রহমান মামুন। তারা বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে গত ২৫ বছরে আলোচিত বহু সন্ত্রাসীর উত্থান হলেও সরকারিভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়নি। বর্তমানে মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক ও কাফরুল এলাকায় অন্তত চার শীর্ষ সন্ত্রাসীর সক্রিয়তা রয়েছে—মফিজুর রহমান মামুন, শাহাদাত হোসেন ওরফে সাধু, কিলার আব্বাস এবং ইব্রাহিম খলিল ওরফে কিলার ইব্রাহিম।
ফার্মগেট ও কাওরানবাজার এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগীরা আতঙ্ক সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাদশাহ, আহাদ, সিদ্দিক, রবিন, মাসুদ ও আরিফ। এদের মধ্যে বাদশাহ ও আহাদের অবস্থান মিরপুরের শাহআলী এলাকায়। আর খামারবাড়ি এলাকায় সক্রিয় সিদ্দিক, রবিন, মাসুদ, আরিফ, ইকবাল ও রুবেল বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।