থানায় মা-মেয়েকে মারধরের অভিযোগ
আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মা-মেয়ে © টিডিসি ফটো
কক্সবাজার পেকুয়া থানায় পুলিশকে মারধরের অভিযোগে এনে রেহেনা মোস্তফা (৪২) ও তার মেয়ে জুবাইদা বেগমকে (২১) এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সেই সাজা বাতিল করে তাদের খালাস দিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম।
অভিযোগ রয়েছে, পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষ এবং আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রথমে তাদের কাছে ঘুষ দাবি করেন। পরে জুবাইদা ও তার মা ২০ হাজার টাকা দেন। তবে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইতে গেলে পুলিশ তাদের মারধর করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ভুক্তভোগী রেহেনা মোস্তফার দাবি, ইফতারের সময় তিনি আকুতি-মিনতি করেও পুলিশের কাছ থেকে পানি পাননি।
ঘটনার সূত্রপাত, জুবাইদা ও তার পরিবারের সম্পত্তির ভাগ নিয়ে। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা ও তার স্বামীর বিচ্ছেদ হয়। ২০১৩ সালে ২৩ মে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভাগের জন্য চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু তারা জুবাইদাকে অস্বীকার করেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা করেন জুবাইদা। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে। মামলার তদন্তভার যায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষের কাছে।
এ বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে কথা হয় ভুক্তভোগী রেহেনা মোস্তফার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে বুধবার আমাদের থানায় ডেকেছিল পুলিশ। আমি ও আমার মেয়ে থানায় গেলে পুলিশ আমাদের প্রচণ্ড মারধর করে। মারধরের পর থানায় ইউএনও আসেন। আমরা তাকে পুলিশের নির্যাতনের কথা বলি। তখন আমরা মনে করেছিলাম, ইউএনও স্যার আমাদের রক্ষা করতে এসেছেন। কিন্তু উনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পরও কিছু না বলে ওপরে (ওসির রুমে) চলে যান। ঘণ্টা দেড়েক পর সেখান থেকে নেমে যে যার মতো তারা (ইউএনও-ওসি) চলে গিয়েছেন। এরপর পুলিশ আমাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়।’
আরও পড়ুন: ইউএনওর অভিযান, এক মাসের সাজা বিচারপ্রার্থী মা ও কলেজপড়ুয়া মেয়েকে
রেহেনা মোস্তাফা বলেন, ‘হাসপাতালের কথা বলে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রামু এলাকায় ইফতারের সময় হলে অনেক আকুতি-মিনতি করেছি, তবু একটু পানিও দেয়নি পুলিশ। অথচ ইফতারের জন্য তাদের হাতে জুস ছিল, এটা-ওটা ছিল। খালি পেটে কাজ আছে বলে আমাদের ইফতারটাও করতে দেয়নি।’
কারাগারে নেওয়ার পর তাদের শরীরের আঘাত দেখে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে গ্রহণ করতে চাননি বলে দাবি রেহেনা মোস্তফার। তিনি বলেন, ‘প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চাননি। কারা কর্তৃপক্ষ বলেন, কাগজপত্র ঠিকমতো আনো, ওদের আঘাত বেশি। রাতে মারা গেলে আমরা কী জবাব দিব। পরে ইউএনওর সাথে কথা বলে ই-মেইলে কী কী কাগজপত্র পাঠানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের গ্রহণ করেন। পরদিন সকালে আমরা জানতে পেরেছি আমাদের এক মাস করে সাজা দিয়েছেন ইউএনও।’
ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে এক মাসের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সামাজিক সমালোচনা এবং মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহিদুল আলম সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে বেকসুর খালাস দেন।
মুক্তির পর মা-মেয়েকে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের শরীরে মারধরের চিহ্ন রয়েছে এবং মানসিকভাবে দুজনই বিপর্যস্ত। বিশেষ করে জুবাইদা মানসিক ধাক্কায় ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব জানান, মা-মেয়ের ওপর আঘাতের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আইনজীবী মিজবাহ উদ্দিন বলেন, পুলিশ মা-মেয়ের ওপর হামলার মিথ্যা অভিযোগ দেখিয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।