নিহত রোকেয়া রহমান ও তার মেয়ে জোবাইদা রহমান © সংগৃহীত
পাওনা টাকা পরিশোধ করতে চাপ দেওয়ায় মা ও মেয়েকে পরিকল্পিত হত্যা। গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় হত্যার পর লুকানো মা ও তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে হত্যার কুলু বেড়িয়ে আসে। গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে কেরানিগঞ্জের কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জোবাইদা রহমান ফাতেমা (১৪) এবং তার মা রোকেয়া রহমানের (৩২) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। যানা গেছে, হত্যার পর ওই বাসায় মা ও তার মেয়েকে লুকিয়ে রাখা হয় ফলস ছাদ ও খাটের নিচে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম বলেন, মা ও মেয়ে নিখোঁজের ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গৃহশিক্ষিকা মীমকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরা দেখা যায়, গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটার দিকে ফাতেমা কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকায় একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে মীম বেগমের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যায়। পরে সন্ধ্যায় ফাতেমা প্রাইভেট পড়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। একই দিন প্রাইভেট শিক্ষক ফাতেমার মা রোকেয়া রহমানও নিজ বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। তখন থেকে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিখোঁজ দুজনের খোঁজার চেষ্টা করছিল।
এর কিছুদিন পরে মুক্তিরবাগ এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে এলাকাবাসী নিজেরাই দুর্গন্ধের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে মীম বেগমের ফ্ল্যাটে পৌঁছান। ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানালে তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তল্লাশি চালিয়ে লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম (২২), তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া (২৮), মেজো বোন নুরজাহান বেগম (১৪) এবং ছোট বোন মাহিকে (১১) আটক করেছে পুলিশ।
যেভাবে হত্যা করা হয় মা ও মেয়েকে
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বিবরণ। ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা পড়া শেষে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে গৃহশিক্ষিকার মেজো বোন নুরজাহান বেগম ফাতেমার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে খুঁজতে ফাতেমার মা রোকেয়া রহমান ওই বাসায় আসেন। ঘরে ঢুকে মেয়ের হত্যার বিষয়টি জানতে পারার পর গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম ও তার বোন নুরজাহান মিলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা প্রাইভেট পড়তে গৃহশিক্ষিকা মীম বেগমের বাসায় যায়। ওই সময় থেকেই ফাতেমা ও তার মা নিখোঁজ হন। দুই দিন পর, ২৭ ডিসেম্বর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।
ঘটনার পর হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে তারা কৌশল হিসেবে নুরজাহান নিহত ফাতেমার পরনের জামাকাপড় খুলে নিজে তা পরে বাইরে বের হয়। এতে সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায়, পড়া শেষে ফাতেমা বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে— যা দেখে সবাই বিভ্রান্ত হয়। এরপর ১০-১৫ মিনিট পর নুরজাহান বোরকা পরে আবার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে, যাতে কেউ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সন্দেহ না করে।
পরে দুইবোন মিলে ককসিট দিয়ে ফাতেমার লাশ বাথরুমের ফলস ছাদের ওপর এবং রোকেয়ার লাশ নুরজাহানের শোবার ঘরের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। এ সময় মীমের ছোট বোন মাহি পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া তখন বাসার বাইরে ছিলেন।
জোড়া খুনের কারণ সম্পর্কে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার (ওসি) এম সাইফুল আলম আরও বলেন, গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, যার জামিনদার ছিলেন ফাতেমার মা রোকেয়া রহমান। ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় পাওনাদারেরা বারবার রোকেয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রোকেয়া রহমান ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দিলে পরিকল্পিতভাবে মা ও মেয়েকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।