গ্রেপ্তার ছাত্রলীগ নেতা মাহতাব হোসেন রুদ্র ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত গৃহকর্মী লিজা আক্তার © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর শান্তিনগরে লিজা আক্তার হত্যা মামলার আসামী নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা মাহতাব হোসেন রুদ্রকে (২৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত আড়াইটায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং এলাকা থেকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তারের আগে গতকাল মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ছাত্রলীগের ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন রুদ্র। শুভেচ্ছা বার্তায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের ‘ষড়যন্ত্রকারী’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট দিয়ে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তাকে। পরে তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন।
জানা গেছে, মাহতাব হোসেন রুদ্রর গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার রামেশ্বর শর্মা গ্রামে। তার বাবা কোহিদুর রহমান স্থানীয় মণ্ডলের হাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
সিআইডি জানিয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঢাকার শান্তিনগর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত লিজা আক্তার হত্যা মামলায় এক বছর পাঁচ মাস পর আসামী রুদ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন আসামী মাহতাব হোসেন রুদ্র স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা জামান পপিসহ হেলমেট পরিহিত আওয়ামীপন্থী নেতাকর্মীদের সঙ্গে অবস্থান করে আন্দোলন দমনে সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকাল ৫টার দিকে রাজধানীর শান্তিনগর মোড় ও সিদ্ধেশ্বরী নিউ সার্কুলার রোড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় কানিফার টাওয়ারের ১৪ তলার একটি ফ্ল্যাটের বারান্দায় অবস্থানরত লিজা আক্তার গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, লিজা ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাচড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদার বাড়ির দিনমজুর মো. জয়নাল সিকদারের (৬১) মেয়ে। শান্তিনগরে ১২ তলা ভবনের সাত তলার একটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করতেন তিনি।
অভাব অনটনের সংসারে অনেকটা বাধ্য হয়েই আট বছর আগে গৃহকর্মীর কাজে লিজাকে ঢাকাতে পাঠান তার মা-বাবা। ঢাকার শান্তিনগর এলাকায় যে বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন সে বাসার মালিক ভালো মনের হওয়ায় বাড়িতে তেমন আসা হত না লিজার। দুই-এক বছর পর পর গ্রামের বাড়িতে আসতেন তিনি। পাঁচ বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে লিজা ছিলেন চতুর্থ। মেয়ের বয়স বেড়ে যাওয়ায় বাবা-মা মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য পাত্র দেখা শুরু করেন। মেয়েকে বাড়িতে চলে আসতে বলেছিলেন মা ইয়ানুর বেগম। মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য ঘর মেরামতও করিয়েছেন।
তবে লিজা মাকে বলেছিলেন, তিনি একজনের কাছে বিকেল বেলা কোরআন শরীফ পড়া শিখছেন। তার কোরআন শরীফ পড়া শেষ হতে আর দুই-তিন মাস সময় লাগবে। এরপর বাড়িতে চলে আসবেন। লিজা আক্তার বাড়ি ফিরেছিলেন লাশ হয়ে। নিহত হওয়ার দিন মহররমের রোজা রেখেছিলেন লিজা।
এ ঘটনায় একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রমনা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে তার পরিবার। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ৩২৩, ৩০৭, ৩০২, ১১৪ ও ৩২ এবং বিস্ফোরক আইন, ১৯০৮-এর ৩, ৪ ও ৬ ধারায় রুজু করে পুলিশ। তবে ঘটনার পর থেকেই আসামী রুদ্র আত্মগোপনে চলে যায়। সিআইডি জানিয়েছে, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে এবং তদন্ত শেষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।