সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত শিশু © সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার দেখানো পথে হেঁটে ভারতেও ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবি ও আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির বেশ কয়েকটি রাজ্যের মন্ত্রীরা শিশুদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে একটি আইনি কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের অন্তত দুটি রাজ্য এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। খবর বিবিসি।
সম্প্রতি ভারতের ‘ইকোনমিক সার্ভে’ বা বার্ষিক অর্থনৈতিক সমীক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারকে শিশুদের জন্য বয়স-ভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও এই সুপারিশ মানা বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য এলএসকে দেবরায়ালু ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করতে একটি ব্যক্তিগত বিল প্রস্তাব করেছেন। যদিও এটি সরাসরি সরকারি নীতি নয়, তবে সংসদীয় বিতর্কে এটি বড় প্রভাব ফেলছে।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ইতোমধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে যারা বিশ্বব্যাপী এ সংক্রান্ত নিয়মাবলী পর্যবেক্ষণ করছে। তারা মেটা, এক্স ও গুগলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলোচনার জন্য ডেকেছে। রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী নারা লোকেশ এক্সে লিখেছেন, শিশুরা 'বিরামহীন ব্যবহারের' দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা তাদের মনোযোগের পরিধি ও শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও বলেন, 'আমরা নিশ্চিত করব যাতে সোশ্যাল মিডিয়া একটি নিরাপদ স্থান হয় এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো যায়।' এছাড়া গোয়া ও কর্ণাটক রাজ্যও একই ধরনের পদক্ষেপের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বেশিরভাগ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করেছে। সেখানে বয়স যাচাই করা এবং কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে ফ্রান্সের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য একই ধরনের বিল অনুমোদন করেছে। যুক্তরাজ্যও বর্তমানে এমন একটি নিষেধাজ্ঞার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছে।
বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ডিজিটাল অধিকার কর্মী নিখিল পাহওয়া মনে করেন, ভারতের মতো বিশাল দেশে রাজ্য স্তরে আইপি অ্যাড্রেস বা অন্য উপায়ে বয়স যাচাই করা অত্যন্ত জটিল। তিনি বলেন, 'কোম্পানিগুলো আইপি ঠিকানার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অবস্থান বুঝতে পারলেও সেই ব্যবস্থা অনেক সময় ভুল হয়। যেখানে রাজ্যগুলোর সীমানা খুব কাছাকাছি, সেখানে এক রাজ্যে নিষিদ্ধ আর অন্য রাজ্যে অনুমোদিত হলে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।' পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ প্রতীক ওয়াঘের মতে, এই নিয়ম বাস্তবায়ন পুরোপুরি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।
অনেক অভিভাবক এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কেউ কেউ এর মূল কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দিল্লির বাসিন্দা জিতেন্দ্র যাদব মনে করেন, সমস্যার শুরুটা আসলে পরিবার থেকে। তিনি বলেন, 'বাবা-মায়েরাই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না এবং তাদের ব্যস্ত রাখতে ফোন হাতে তুলে দেন। সমস্যাটি আসলে সেখান থেকেই শুরু হয়।' তাঁর মতে, 'আমি নিশ্চিত নই যে সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা খুব একটা কাজে আসবে কি না। কারণ যতক্ষণ না বাবা-মায়েরা সন্তানদের সময় দিচ্ছেন বা তাদের সৃষ্টিশীল কাজে ব্যস্ত রাখছেন, ততক্ষণ শিশুরা এই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ ঠিকই খুঁজে নেবে।'