‘দেখিস, তুই বিচারক হতে পারিস কি না’

মো. দেলোয়ার হোসেন, ফেসবুক থেকে নেওয়া
মো. দেলোয়ার হোসেন, ফেসবুক থেকে নেওয়া  © সংগৃহীত

আনোয়ারা উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়নের চাঁদুয়াপাড়ার ছেলে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের জীবনে অভাব ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী। সাত ভাইবোনের সংসারে বাবা আবদুর রহমান ছিলেন স্থানীয় ভূমি অফিসের কর্মচারী। আয়ের তুলনায় সংসার ছিল বড়, প্রয়োজন আরও বড়। দুবেলা ভাতের চিন্তা, শরীরে ছেঁড়া শার্ট, পরনে জীর্ণ প্যান্ট। এভাবেই বড় হয়ে উঠেছেন দেলোয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতে কোনো কোনো দিন হাতে থাকত মাত্র ২০ টাকা। সেই টাকাতেই হোটেলে ভাত নিতেন, যার সঙ্গে ফ্রি পাওয়া ডাল আর এক-দুইটি পেঁয়াজুই ছিল তাঁর প্রতিদিনের খাবার। তবু পড়াশোনা ছাড়েননি। কারণ মাথায় ছিল বাবার বলা একটি কথা—‘দেখিস, তুই বিচারক হতে পারিস কি না।’

২০০৪ সালের এক বিকেলের ঘটনা আজও ভোলেন না দেলোয়ার। তখন তিনি বরুমচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজে গরুর জন্য ঘাস কেটে ফিরছিলেন। পথে দেখা হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপক চৌধুরীর সঙ্গে। পরদিন তার বাবাকে ডেকে শিক্ষক জানান, দেলোয়ারকে যেন আর কোনো কাজ করানো না হয়। সামনে বৃত্তি পরীক্ষা, প্রস্তুতিতে মন দিতে হবে। বাবাও কথাটি গুরুত্ব দিয়ে নেন। সেদিনের সেই পরামর্শ দেলোয়ারের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই বছরই তিনি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় পাস করেন। পরে বুঝেছেন, পড়াশোনার ভিত গড়ে দিয়েছিলেন সেই শিক্ষকই।

দেলোয়ারের জীবনে বড় ধাক্কা আসে ২০১২ সালে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরই তিনি বাবাকে হারান। বাবা মারা যাওয়ার পর পুরো পরিবার আর্থিক টানাপোড়েনে পড়ে যায়। কিন্তু বাবার স্বপ্ন তাকে থামতে দেয়নি। আবার চেষ্টা করে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান দেলোয়ার। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, স্বপ্নের পথে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।

আইন বিভাগে পড়া মানেই খরচ। বই, নোট, ফরম—সবই ব্যয়বহুল। বাড়িতে টাকা পাঠানোর মতো কেউ নেই। তাই প্রতিদিন টিউশনি করতে হতো দেলোয়ারকে। সকালবেলা ক্লাস, বিকেলে টিউশনি ও রাতে পড়াশোনা। এভাবেই কাটে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। অনটনের মধ্যে থেকেও মা ও ভাইবোনেরা ভরসা দিতেন। তারা বলতেন, ‘টাকার চিন্তা করিস না, তুই জজ হবি।’ এই বিশ্বাসই তাকে মনোবল দিত।

আরও পড়ুন: যে কারণে বিষয়ভিত্তিক শূন্য পদের তথ্য সংগ্রহ করছে এনটিআরসিএ

বিশ্ববিদ্যালয় শেষে শুরু হয় কঠিন পথ। ২০১৯ সালে ১৩তম বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নেন, ব্যর্থ হন। এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৪তম, ১৫তম, ১৬তম বিজেএসেও মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়েন। প্রতিটি ব্যর্থতা তাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দিচ্ছিল। কিন্তু বন্ধুরা পাশে ছিলেন। তারা পরামর্শ দেন হাল না ছাড়তে। কেউ কেউ সাহায্যও করতেন। অবশেষে দেলোয়ার টিউশনি কমিয়ে পুরো মনোযোগ দেন ১৭তম বিজেএসের প্রস্তুতিতে।

২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এসে যায়। ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর নিজের নাম তালিকায় দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি দেলোয়ার। কান্না ভেঙে পড়ে তার চোখ। মনে হচ্ছিল, বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, সবচেয়ে খুশি তিনিই হতেন। ছেঁড়া শার্ট পরে শাটলে চড়ে ভর্তি পরীক্ষায় যাওয়া সেই ছেলেটি আজ দেশের বিচারব্যবস্থায় সহকারী জজ। তার জীবনের সংগ্রাম, ব্যর্থতা আর দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে যাওয়ার গল্প আজ অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই পথচলায় পরিবার, বড় ভাই, বন্ধু, শিক্ষক—সবাই আমাকে শক্তি দিয়েছে। আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, তাদের প্রতি আমি চিরঋণী।’

তিনি আরও বলেন, বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর তার বন্ধুরা তাকে শক্তি জুগিয়েছেন। তারা টাকাপয়সার দুশ্চিন্তা না করে চেষ্টা চালিয়ে যেতে বলতেন। সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে নতুন সাহস দেয়। টিউশনি কমিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দেন ১৭তম বিজেএসের প্রস্তুতিতে।

অভাবের ভেতরেও যে স্বপ্ন টিকে থাকে, লড়াই করলে তার পরিণতি একদিন সুন্দর হয়, দেলোয়ারের জীবন যেন তারই উদাহরণ।


সর্বশেষ সংবাদ

×
  • Application Deadline
  • December 17, 2025
  • Admission Test
  • December 19, 2025
APPLY
NOW!
GRADUATE ADMISSION
SPRING 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence