ইন্টারনেট ব্যবহারে আদবকেতা: পর্ব-১

অনলাইনে যে ভদ্রতাটুকু না জানলেই নয়

১৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৩৯ PM , আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২০ AM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © টিডিসি

বর্তমান পৃথিবীতে ইন্টারনেট ছাড়া যেন জীবন কল্পনাই করা যায় না। নিঃসন্দেহে এখন সর্বত্রই ইন্টারনেটের জয়জয়কার। দিনে-রাতের অনেকটা সময় অনেকেই কাটান মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবের স্ক্রিনে। অনেকে ঘুম থেকে উঠেই হাতে ফোন তুলে নেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেখেন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম। এরপর পড়াশোনা, অফিস, পেশাগত কাজে কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন অনলাইনে। তবে অনেকেই ভুলে যান কিংবা জানেন না অনলাইনে ভদ্রতা, দায়িত্ববোধ ও শালীনতা নিয়ে। বাস্তব জীবনে যেমন কিছু আচরণ মেনে চলা জরুরি, অনলাইনেও রয়েছে তেমন কিছু আদবকেতা।

সাধারণত ইন্টারনেট যারা ব্যবহার করেন, তাদেরকে ডিজিটাল ভাষায় ‘নেটিজেন’বলা হয়। ইন্টারনেটে নেটিজেনরা যে আচরণ বা ব্যবহার করেন, সেটাকে ‘নেটিকেট’ বলা হয়। এক কথায় বললে, ইন্টারনেটে শিষ্টাচারের আরেক নাম হলো নেটিকেট। এটি এসেছে ‘নেটওয়ার্ক’ এবং ‘এটিকেট’(আদবকেতা) শব্দ দুটি মিলিয়ে। সহজভাবে বললে, অনলাইনে এমন ব্যবহারই নেটিকেট, যা সভ্য, ভদ্র, শালীন ও সম্মানজনক। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই দেখা যায়, নেটিজেনদের অনেকেই নেটিকেট সম্পর্কে জানে না, মানেও না।

দেশের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় কাজে ইন্টারনেটে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে। সমীক্ষায় বলা হয় দিনে ১১ ঘণ্টার ওপরে অনলাইনে থাকে ৬.২ শতাংশ শিক্ষার্থী, ৮-১০ ঘণ্টা থাকে ১৯.৫ শতাংশ, ৫-৭ ঘণ্টা ৩৬.৬ শতাংশ, আর ২-৪ ঘণ্টা ব্যবহার করে ৩২.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। অনেকের অনলাইনে দীর্ঘ সময়ের বড় অংশই কেটে যাচ্ছে বিনোদন, চ্যাটিং বা উদ্দেশ্যহীন অনলাইন ঘোরাঘুরিতে। যার ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে, মানসিক চাপ বাড়ছে এবং অনলাইন আসক্তি নতুন সমস্যা হয়ে উঠছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের হিসেবে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটিরও বেশি। বিপুল সংখ্যক নেটিজনের মধ্যে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষই আছে। সব বয়সের মানুষেরই নেটিকেট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকার প্রয়োজন আছে।

সম্প্রতি আঁচল ফাউন্ডেশনের একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় কাজে ইন্টারনেটে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে। সমীক্ষায় বলা হয় দিনে ১১ ঘণ্টার ওপরে অনলাইনে থাকে ৬.২ শতাংশ শিক্ষার্থী, ৮-১০ ঘণ্টা থাকে ১৯.৫ শতাংশ, ৫-৭ ঘণ্টা ৩৬.৬ শতাংশ, আর ২-৪ ঘণ্টা ব্যবহার করে ৩২.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। অনেকের অনলাইনে দীর্ঘ সময়ের বড় অংশই কেটে যাচ্ছে বিনোদন, চ্যাটিং বা উদ্দেশ্যহীন অনলাইন ঘোরাঘুরিতে। যার ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে, মানসিক চাপ বাড়ছে এবং অনলাইন আসক্তি নতুন সমস্যা হয়ে উঠছে।

পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, বিপুল শ্রেণির কিশোর ও তরুণ নেটিকেট সম্পর্কে তেমন জানেও না। ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন বিনোদন ও তথ্যের উৎস, তেমনি অনেক সময় এগুলো হয়ে উঠছে গুজব, অশালীনতা ও প্রতারণার মাধ্যম। কিছু ব্যবহারকারী ভুয়া খবর ছড়িয়ে সমাজে আতঙ্ক তৈরি করে। সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। আবার কেউ অপমানজনক মন্তব্য করে অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করে। ধর্ম, জাতি বা রাষ্ট্র নিয়ে ঘৃণামূলক প্রচারণাও এখন সাধারণ ঘটনা হিসেবে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক এক ঘটনাই অনলাইন অসহিষ্ণুতা ও মানবিক অবক্ষয়ের জ্বলন্ত উদাহরণ। কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনজন ব্যক্তি জোর করে বাউল ফকিরের মতো দেখতে এক বৃদ্ধের চুল কেটে দিচ্ছেন। বৃদ্ধটি প্রাণপণে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষে অসহায়ের মতো বলেন, ‘আল্লাহ, তুই দেহিস।’

জানা গেছে, ওই বৃদ্ধের নাম হালিম উদ্দিন আকন্দ (৭০)। তিনি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয়রা তাকে ‘ফকির’ হিসেবে চেনেন। তারা জানান, হালিম উদ্দিন মানসিকভাবে অক্ষম নন; সংসার জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে তার মাথায় জট ছিল। হজরত শাহজালাল (র.) ও শাহপরান (র.)-এর ভক্ত হালিম উদ্দিন একসময় কৃষিকাজ করতেন, এখন ভক্তি ও সাধনার জীবন যাপন করেন। ঘটনাদিনে কাশিগঞ্জ বাজারে কয়েকজন ব্যক্তি হঠাৎ তাকে জাপটে ধরে মেশিন দিয়ে জোর করে তার চুল, দাড়ি ও জট কেটে দেয়। পরে তারা সেই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, এ ধরনের আচরণ সম্পূর্ণ অমানবিক, বেআইনি এবং সংবিধান ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা আরও বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রতিটি নাগরিককে আইনের আশ্রয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার দিয়েছে। ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে এবং ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদ কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি ওই ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করে সরাসরি সাইবার অপরাধ করা হয়েছে।

আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় কয়েক মাস আগে রংপুরের গঙ্গাচড়ার আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামে, যেখানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। জানা যায়, ওই গ্রামের এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক কিশোরের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর লেখা পোস্ট করে। এরপর ওই ঘটনার জেরে ক্ষুব্ধ জনতা ১৫টি বসতঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এ ঘটনা তখন সারা দেশে আলোচিত-সমালোচিত হয়। 

শুধু বাংলাদেশ নয়, ইউরোপ-আমেরিকায় উন্নত দেশগুলোও ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে নানা সমস্যায় ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার বুলিং একটি বড় সমস্যা। সেখানে ১২-১৭ বছর বয়সী কিশোরদের প্রায় ৩৭ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছে। ইউরোপে ভুয়া খবর (Fake News) গণতন্ত্র ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিংসহ নানা অপরাধ বেড়েছে। যার ফলে অনেক দেশে স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল সিটিজেনশিপ বা নেটিকেট শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অনলাইনে যে ভদ্রতাগুলো মানতেই হবে
ইন্টারনেট শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি এখন মানুষের অন্যতম যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইমেইল ইত্যাদি সবখানেই আমরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছি। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এখানকার আচরণও ব্যক্তিত্ব ও সুরুচির প্রতিফলন। বাস্তব জীবনে যেমন শিষ্টাচার না মানলে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, তেমনি অনলাইনেও শিষ্টাচার বা ভদ্রতার অভাব সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য সবার জন্যই অনলাইন আদবকেতা বা নেটিকেট জানা ও মেনে চলা জরুরি।

১. ভদ্র ভাষা ব্যবহার করুন
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক ভাষা ও গালির ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। কমেন্ট বক্সে গালাগাল এক সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধের অভাবেই এটি বেড়ে চলেছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনলাইনে অশালীন ভাষা ব্যবহারের প্রভাব বাস্তব জীবনের চেয়ে কম নয়; বরং অনেক সময় বেশি ক্ষতিকর। একটি কটু মন্তব্য বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক এমনকি কর্মক্ষেত্রেও মারাত্মক সংকট তৈরি করতে পারে। এজন্য মনে রাখতে হবে, ভদ্র ভাষা শুধু বাস্তব জীবনে নয়, অনলাইনেও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২. ভুয়া তথ্য, এডিটেড কনটেন্ট ও বিভ্রান্তি ছড়াবেন না
ইন্টারনেট যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভুয়া খবর বা ফেক নিউজ। এক ক্লিকেই হাজার হাজার মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে অনেকবারই গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০১২ সালে রামুতে ফেসবুকে ভুয়া পোস্টের কারণে ভয়াবহ হামলা ও সহিংসতা হয়েছিল। সম্প্রতি তার উদাহরণ আরও বেড়েছে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ছবি ও ভিডিও আমাদের তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন সহজেই ছবি-ভিডিও সম্পাদনা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের এডিটেড বা এআই-নির্ভর ভুয়া ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। কখনো তা ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, আবার কখনো ব্যক্তিগত সম্মানহানি বা হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে।

অনলাইনে যা কিছু দেখি বা পড়ি, তা সবসময় সত্য নাও হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য ভুয়া খবর, গুজব, এডিট করা ছবি কিংবা এআই-তৈরি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলো অনেক সময় মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে, অযথা আতঙ্ক ছড়ায় কিংবা কারও ব্যক্তিগত সম্মানহানি ঘটায়।

তাই তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো পোস্ট বা খবর শেয়ার করা উচিত নয়। দায়িত্বশীল নেটিজেনরা আগে সংবাদপত্র, নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট বা সরকারি সূত্র দেখে নেন। সচেতন না হলে আমরা নিজেরাই মিথ্যা প্রচারের অংশ হয়ে পড়ি, যা সমাজ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর।

৩. গোপনীয়তা রক্ষা করুন
প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা অনলাইনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারও অনুমতি ছাড়া ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা শুধু নৈতিকভাবে ভুল নয়, বরং আইনের চোখেও অপরাধ। বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বিশ্বজুড়েই এখন ডেটা প্রাইভেসি বড় আলোচনার বিষয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে চালু হয়েছে জিডিপিআর (GDPR) আইন, যেখানে কারও ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহার করলে প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি ইউরো জরিমানা গুনতে হয়। এজন্য নিজের পাশাপাশি অন্যের গোপনীয়তাও সম্মান করতে হবে।

৪. ভিন্ন মত ও বৈচিত্র্যতাকে সম্মান করুন
অনলাইনে আলোচনা করলে মতের ভিন্নতা হবেই। রাজনীতি, ধর্ম, খেলা, বিনোদন ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। কিন্তু ভিন্ন মত মানেই শত্রুতা নয়। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি হলো মতের ভিন্নতাকে শ্রদ্ধা করা। অনলাইনে অশালীন ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানানো বা ব্যক্তিকে আক্রমণ করা শুধু বিতর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। বরং ভিন্ন মতকে যুক্তি দিয়ে প্রতিহত করাই সভ্যতার পরিচয়।

ধরে নিন, হঠাৎ একদিন বাংলাদেশ বা পৃথিবীর কোনো দেশে দেখা গেল সব মানুষ একই ধর্মে বিশ্বাসী, একই রাজনৈতিক মতাদর্শে অনুগত, একই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেঁচে আছে। প্রথমে শুনতে হয়তো স্বপ্নের মতো লাগবে। কোনো বিভেদ নেই, কোনো বিতর্ক নেই, সবাই এক মত! কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো সমাজের স্বাভাবিক চিত্র নয়, বরং বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত।

কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন। জন্ম, পরিবার, পরিবেশ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির ভিন্নতায় আমরা প্রত্যেকে আলাদা। ভিন্নতাই মানুষকে মানুষ বানায়, সমাজকে গতিশীল রাখে। বৈচিত্র্য না থাকলে সভ্যতা থেমে যেত। তাই অনলাইনে অন্যের ভিন্ন মত ও বৈচিত্র্যতাকে সম্মান করা জরুরি।

৫. সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন
নারী ও কিশোররা অনলাইনে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়। জাতিসংঘের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ১০ জন তরুণীর মধ্যে অন্তত ৩ জন সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছে। বাংলাদেশেও সাইবার ট্রাইব্যুনালে নারী হয়রানি সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনলাইনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন: বিটিআরসি ভবনে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার সেই ৪৫ জন কারাগারে

এজন্য সবার দায়িত্ব হলো অনলাইনকে এমন একটি জায়গায় পরিণত করা, যেখানে নারী, শিশু, কিশোর কিংবা প্রবীণ ইত্যাদি সব বয়সের মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। অপমানজনক মন্তব্য, কটূক্তি বা হয়রানি থেকে বিরত থাকা এখানে নৈতিক দায়িত্বই নয়, আইনি দায়িত্বও বটে।

৬. সময় ও স্থানের প্রতি যত্নবান হোন
অনলাইনে যে কাউকেই রাত-বিরাতে অযথা বার্তা পাঠানো শোভন নয়। ইমেইল, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের সময়টুকু ভেবে নিতে হবে। বিশেষত অফিস বা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে রাত ১০টার পর মেসেজ না পাঠানোই ভদ্রতা। অনেক প্রতিষ্ঠানে ইমেইল পাঠানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়ও বেঁধে দেওয়া থাকে। এছাড়াও অনেকে অনুমতি ছাড়াই রাত-বিরাতে মেসেঞ্জারে কিংবা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যমে কল করেন। কাউকে অনলাইনে কোনোভাবে বিরক্ত করা কিংবা হয়রানি করা ঠিক নয়। এটিও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

৭. পোস্টের দায়িত্ব নিন
আপনি যা পোস্ট করছেন, তার দায়ও আপনার। অনেকেই না ভেবেই ছবি, ভিডিও বা লেখা শেয়ার করেন, পরে তা থেকে বিপদ তৈরি হয়। এজন্য কোনো পোস্ট করার আগে কিংবা কোনো মন্তব্য লেখার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন। প্রথমত, এটি কি সত্য? দ্বিতীয়ত, এটি কি শালীন? তৃতীয়ত, এটি কি কারও ক্ষতি করবে না? যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, তবে সেটি পোস্ট করা যেতে পারে। অন্যথায় বিরত থাকাই ভালো।

বিশেষজ্ঞদের কথা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু সেই তথ্য ভুল না ঠিক, তা আমরা ভেরিফাই করি না। এ না করার পিছনে অনেক কারণ থাকে, তথ্যটা দেখে সেটা যে ভুল না ঠিক, এ কাণ্ডজ্ঞান অনেকের থাকে না। অনেক সময় আমরা দেখি, প্রথম যেটি শুনি, সেটিকেই বিশ্বাস করি। অন্যগুলো আর বিশ্বাস করতে চাই না। এটি খুবই ক্ষতিকর, সর্বনাশও করে ফেলতে পারে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। ব্যক্তিগত জীবনে এটি এক অপূর্ব সুযোগ, তাই এটিকে সচেতন ও বিচক্ষণভাবে ব্যবহার করা জরুরি।

সোশ্যাল মিডিয়ার নেটিকেট শেখার জন্য তিনি বলেন, আমাদের মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন করতে হবে। ছোটবেলা থেকে যে অভ্যাস গড়ে তুলি, আমরা সে অভ্যাসের দাসত্ব করতে গিয়ে রোবটিক আচরণ করি। চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। কাজেই মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন করতে হলে শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা পড়াবেন, তারা হবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত, সবচেয়ে বেশি মর্যাদার, সবচেয়ে বেশি বেতনভুক্ত মানুষ। কিন্তু এর কোনোটাই এখানে নাই। কাজেই এখন থেকে যদি শিক্ষায় বিনিয়োগ না করি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত ভয়াবহ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ইন্টারনেট শুধু তথ্যসেবা নয়, পাশাপাশি এটি বিশাল বাণিজ্যিক উপাদান। ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভিউ, লাইক, ক্লিকবেট, কমেন্টের ব্যবসাটা সবার বোঝার কথা নয়। যে ভিডিও, যে কনটেন্ট মানুষ দেখতে চান, পড়তে চায়, শুধু সেগুলোই তাদের সামনে এনে তুলে ধরার জন্য কত কত গবেষণা যে হয়ে গেছে, অপরূপ ডিজিটাল দুনিয়ার বিরূপ সে অংশটুকু অনেকেই জানে না। যার ফলে অনলাইনে ব্যাপক প্রতারণা ও ক্রাইম হয়।

আরও পড়ুন: দেশে অনিবন্ধিত নতুন ফোন বিক্রি, এনইআইআর চালুর পর যে ভয়াবহ তথ্য দিল সরকার

তিনি আরও জানান, ইউনেসকো–আইপিএসওএসের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শতকরা ৮৫ ভাগ নাগরিক অনলাইনে ভুল তথ্যের প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। আমাদের দেশের জন্য সংখ্যাটা নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন হবে। আমাদের এক বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনো জানেনই না কী সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে অনলাইনে ও বিভিন্ন মিডিয়ায় ভুল তথ্য ও ঘৃণা ছড়ানো সম্ভব। এজন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবকিছু যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করা ঠিক নয়।

লেখক ও মনোবিদ অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, ইন্টারনেটে আপনি যা খুশি লিখতে পারেন, যা খুশি পোস্ট করতে পারেন, তবে পোস্ট করার আগেই অবশ্যই আপনাকে যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে হবে। আপনি হয়তো একটি বক্তব্য কিংবা ছবি-ভিডিও মজাচ্ছ্বলে প্রকাশ করেছেন, অন্যজনের জন্য তা মনোব্যথার কারণ হতে পারে। মোটা কথা অনলাইন আচরণ যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত হতে হবে।

অনলাইনে সহনশীলতা ও ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, অনলাইনে সহনশীলতা ও ভিন্ন মতকে গ্রহণ করা একটি সভ্য নেটিজেন হওয়ার মূল চিহ্ন। মানুষ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসে, তাই মতের ভিন্নতা স্বাভাবিক। কিন্তু অনলাইনে অনেক সময় ভিন্নমতকে অবজ্ঞা করা বা আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা দেখা যায়, যা আলোচনা পরিবেশকে বিষাক্ত করে। সহনশীলতা বজায় রেখে ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করলে মানসিক শান্তি, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ইতিবাচক সংলাপ তৈরি হয়। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পর্কই মজবুত করে না, বরং অনলাইন সমাজকে আরও মানবিক ও সমৃদ্ধ করে।

সর্বোপরি, ইন্টারনেট আমাদের জীবনে অসাধারণ সুযোগ তৈরি করেছে। তথ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিনোদন, যোগাযোগ ইত্যাদি সবকিছু হাতের নাগালে এনে দিয়েছে। তবে সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে অনলাইনে ভদ্রতা ও শালীনতা শেখা জরুরি। যেভাবে বাস্তব জীবনে সভ্য সমাজে টিকে থাকতে শিষ্টাচার মানা বাধ্যতামূলক, তেমনি অনলাইন সমাজেও নেটিকেট মেনে চলাই আমাদের দায়িত্ব। অনলাইনে সেই ভদ্রতাটুকুই আমাদের তৈরি করতে পারে একটি মানবিক, জ্ঞানভিত্তিক ও সম্মানপূর্ণ সমাজ, যেখানে থাকবে না হিংস্রতা, গালিগালাজ বা অপমান; বরং থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, যুক্তি ও সত্যের প্রতি আস্থা।

নদীতে কুমিরের আতঙ্কে পদ্মার তীরের মানুষ
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
সীমান্তে আটক বাংলাদেশি নারী ও শিশুকে ফেরত দিল বিএসএফ
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
মাধ্যমিক পর্যায়ে ভোলার ‘শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক’ হামিদ পারভেজ
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
খালেদা জিয়ার মাগফেরাত কামনায় জবিতে ছাত্রদলের শীতবস্ত্র বিতরণ
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
ভাইরাল হওয়া ভুয়া ছবির ভিত্তিতে ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার, অত:পর…
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
হাদি, সৌম্যদের হত্যার বিচার হতেই হবে: বিএনপি মহাসচিব
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9