ঢাকা-৯ আসন
ঢাকা ৯ আসনটিতে আলোচনায় আছেন তিন প্রার্থী © টিডিসি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন (খিলগাঁও-সবুজবাগ-মুগদা) সারাদেশের মানুষের আগ্রহে পরিণত হয়েছে প্রার্থীদের সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচারণার জন্য। আসনটিতে আলোচনায় আছেন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব ও এনসিপি প্রার্থী জাভেদ মিয়া (রাসিন)। বিভিন্ন আসন যেখানে প্রার্থীদের পেশিশক্তি প্রদর্শন ও কথার লড়াইয়ের কারণে আলোচনায়, সেখানে ঢাকা-৯ আসনে প্রার্থীদের সুস্থ প্রচারণার কৌশলের কারণে অনেকে আসনটিকে অনেকে ‘গ্রিন জোন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৯ আসন। আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৩ জন পুরুষ, ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৮২ জন নারী ও ৫ জন হিজড়া ভোটার রয়েছেন। জনবহুল এই আসরটি মিশ্র আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা নিয়ে গঠিত।
নব্বই দশক থেকে আসনটি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। আসনটি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও। ফলে আসনটিতে বিএনপির উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক শক্তি ও ভোট ব্যাংক রয়েছে। সে তুলনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও এনসিপি প্রার্থী জাবেদ রাসিনের জন্য প্রথম নির্বাচন হিসেবে আসনটিতে জয় লাভ করা অনেকটা চ্যালেঞ্জের। তবে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থী হিসেবে তাসনিম জারা ও জাভেদ রাসিন ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছেন ভোটারদের মাঝে।
আসনটিতে আলোচনায় আছেন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব ও এনসিপি প্রার্থী জাভেদ মিয়া (রাসিন)। বিভিন্ন আসন যেখানে প্রার্থীদের পেশিশক্তি প্রদর্শন ও কথার লড়াইয়ের কারণে আলোচনায়, সেখানে ঢাকা-৯ আসনে প্রার্থীদের সুস্থ প্রচারণার কৌশলের কারণে অনেকে আসনটিকে অনেকে ‘গ্রিন জোন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
এলাকার মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিয়ে ও ব্যক্তিগত কারিশমায় নারী ও তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করেছেন জারা। আর ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হওয়ায় জামায়াত ইসলামীর ভোটব্যাংক রয়েছে জাবেদ রাসিনের সাথে। তবে সব সমীকরণে ঊর্ধ্বে ধারণা করা হচ্ছে, আসনটিতে ত্রিমুখী লড়াইয়ে জয়ের মুকুট নির্ধারণ করে দেবেন তরুণ ও নারী ভোটাররা।
প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা একাধারে চিকিৎসক, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং রাজনীতিবীদ। এনসিপি থেকে পদত্যাগের আগে তিনি দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকাতে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এভিডেন্স-বেইজড হেলথ কেয়ার বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।
তাসনিম জারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে তার চিকিৎসা জীবন শুরু করেন। ২০১৯ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং এনএইচএসে জরুরি চিকিৎসা বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
জারা 'সহায় হেলথ' নামক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যা বাংলাভাষী জনগণের জন্য প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা তথ্য প্রদানে কাজ করে। ২০২৩ সালে তিনি ‘সহায় প্রেগন্যান্সি’ নামক মোবাইল অ্যাপের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন, যা গর্ভাবস্থার প্রতিটি সপ্তাহের জন্য তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করে। গবেষক হিসেবে তাসনিম জারা জেএসিসি : কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশনস এবং ফ্রন্টিয়ার্স ইন গ্লোবাল উইমেন’স হেলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যালোচিত জার্নালে একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।
২০১৪ সালে তাসনিম জারা জাতিসংঘের বাংলাদেশ যুব উপদেষ্টা প্যানেলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই প্যানেলে তিনি যুব সম্পৃক্ততা ও নীতিনির্ধারণে জাতিসংঘকে পরামর্শ প্রদান করেন। ২০২১ সালে, যুক্তরাজ্য সরকার তাকে "ভ্যাকসিন লুমিনারি" হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জনসচেতনতা গড়ে তোলা এবং টিকা গ্রহণে জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকার জন্য তিনি এ সম্মাননা লাভ করেন।
বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব দীর্ঘ ৩৮ বছর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছাত্রদলের রাজনীতি করে বর্তমানে নগর বিএনপিতে অবস্থান করে নিয়েছেন হাবিব। ২০১১ সালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ দায়িত্ব পালনকালে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গুলিবিদ্ধ হতে হয় তাকে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বর্তমানে নগর বিএনপিতে সক্রিয় তিনি। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এই সদস্য এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর এবং পেশায় একজন ব্যবসায়ী তিনি। ছাত্রজীবন থেকে বহুবার জেল খেটেছেন। শেখ হাসিনার আমলে তার বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা করা হয় এবং তিনি বিভিন্ন সময়ে কারবরণ করেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও চব্বিশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন তিনি।
এনসিপি প্রার্থী জাভেদ মিয়া রাসিন একাধারে আইনজীবী, কবি ও কথাসাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ। এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা রাসিন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন তালিকাভুক্ত আইনজীবী। এছাড়া তিনি পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নে নিয়োজিত এসইডি ফাউন্ডেশন (SED Foundation)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট। তার প্রকাশনা সংস্থা 'ঈহা প্রকাশ'। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'তমিস্রা'।
প্রচারণায় নজর কেড়েছেন প্রার্থীরা
আসনটিতে প্রচারণার কৌশলে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণে করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা। এলাকার মেয়ে পরিচয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করছেন তিনি। পরিবর্তনের রাজনীতির আহ্বান জানিয়ে এই তরুণ নেতার প্রচারণা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলার চেষ্টা করছে। শোডাউন বা মাইক না বাজিয়ে বিকল্প উপায়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: জামায়াতের বিরোধিতা করতে নির্বাচনী প্রচারণায় কেন হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনছে বিএনপি?
এলাকায় গিয়ে সরাসরি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলছেন। তার ক্যাম্পেইনে যুক্ত হয়েছেন ১৭ হাজার ভলানটিয়ার। গ্যাস–সংকট নিরসনে ‘সেবা নেই, বিল নেই’ নীতি বাস্তবায়ন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা গড়ে তোলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে এমপির সুপারিশ ও কোটা বাতিলসহ ছয় দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছেন তিনি।
বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশীদ হাবিব তার ব্যক্তিগত ইমেজ এবং ধানের শীষের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন তিনিও। ভোটারদের কাছে তিনি আহবান জানাচ্ছেন তার ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করার। তিনি বলছেন, ‘যদি খারাপ কিছু পান তাহলে ভোট দেবেন না, আর যদি ভালো শুনতে পান, তাহলে ভোট দিতে পারেন।’ এলাকায় জনসভা ও পথসভা করে জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি। নির্বাচনে বিজয়ী হলে ঢাকা–৯ আসনের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
এনসিপির প্রার্থী জাভেদ রাসিনও ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। তিনি 'জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের স্পিরিট' এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার 'আমূল সংস্কারের' কথা বলছেন। বেকার তরুণদের জন্য আইটি পার্ক, ইকোনমিক জোন এবং কুটিরশিল্প তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক ও হতাশা থেকে দূরে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেন রাসিন।
এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শাহ ইফতেখার আহসান, জাতীয় পার্টির কাজী আবুল খায়ের, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. মনিরুজ্জামান, গণফোরামের নাজমা আক্তার, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মাসুদ হোসেন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের নাহিদ হাসান চৌধুরী জুনায়েদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) খন্দকার মিজানুর রহমান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শাহীন খান ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী।