বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান © সংগৃহীত
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে বিএনপি বলছে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—দুই দলের প্রস্তাবের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, নাকি মৌলিক পার্থক্য আছে।
সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের এক বৈঠকের পর জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। যদিও ওই বৈঠকে জামায়াতের আমির কোনো নির্দিষ্ট সরকার কাঠামোর কথা বলেননি। তবে তার বক্তব্যে উঠে আসে—নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে তারা বিএনপি নেতার সঙ্গে বসতে চান এবং জাতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী।
এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করছেন। তাদের মতে, জামায়াত নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি আলোচনায় রাখতে চাইছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত মিলে কোনো জাতীয় সরকার গঠিত হবে কি না, আবারও কি একপক্ষীয় সংসদ তৈরি হবে, নাকি সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকবে।
তারেক রহমান ও শফিকুর রহমানের বৈঠকটি হয় ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর একদিন পর, পহেলা জানুয়ারি, জামায়াতের আমির বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করতে যান। সেখানেই তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আরও পড়ুন: গণঅধিকার পরিষদে কী হচ্ছে?
ভিন্ন পরিস্থিতিতে বৈঠক হলেও সেখানে জামায়াত নেতা রাজনীতি ও নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের শফিকুর রহমান বলেন, পাঁচ বছরের জন্য জাতির স্থিতিশীলতা ও সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে সবাই মিলে ভালো কোনো চিন্তা করা যায় কি না, সেটিও ভাবার সময় এসেছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পরপরই সরকার গঠনের আগে তারা বসবেন, খোলা মনে কথা বলবেন এবং জাতির স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই বক্তব্যে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব না থাকলেও সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহই নানা আলোচনার জন্ম দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একে ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ বলছেন।
জামায়াতের আমির নিজেও জানিয়েছেন, তার বক্তব্যে একটি ইঙ্গিত রয়েছে, যদিও সেটি তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেননি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সব ক্ষেত্র ভেঙে পড়েছে, যা এখনও পুরোপুরি সামাল দেওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতিতে একমত ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো দলের এককভাবে দেশ চালানো কঠিন। সে কারণেই রাষ্ট্র পরিচালনায় সব দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন বলে জামায়াত মনে করছে।
তবে বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক প্রকাশ্যভাবেই টানাপোড়েনপূর্ণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর বিএনপির পুরোনো মিত্র জামায়াতই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে উঠে এসেছে। দুই দলের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগও দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াত এখন দুই ভিন্ন শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে। যদিও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ তৈরি করাই সক্রিয় দলগুলোর লক্ষ্য হতে পারে।
তবে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময়ই বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের ফাটল প্রকাশ্যে আসে। বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং জামায়াত আলাদাভাবে আন্দোলন চালায়। বিশ্লেষকদের মতে, নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থ থেকেই দুই দলের মধ্যে এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে আরও বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক না কেন, তারা কি অপর দলকে সরকারে অংশীদার করবে? বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সক্রিয় সব দলই মনে করছে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তাদের প্রভাব রয়েছে, ফলে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও বেড়েছে।
লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াত ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে চায় বলেই সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চেয়েছে। যদিও জামায়াত নেতারা এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন এবং তারা সব দলের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরছেন।
জামায়াত নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে এবং এ ক্ষেত্রে তাদের তিনটি শর্ত রয়েছে। প্রথমত, দুর্নীতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপ চলবে না। তৃতীয়ত, জুলাই আন্দোলনের চেতনায় সব দল যে সংস্কার প্রস্তাবে একমত হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
জামায়াত নির্বাচনে জয়ী হলে এই তিন শর্তে যারা একমত হবে, তাদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে দলটি। জামায়াতের আমির জানিয়েছেন, তারা কোনো সরকারে গিয়ে দুর্নীতির দায় নিতে রাজি নন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যে বিএনপির প্রতিই ইঙ্গিত রয়েছে।
তবে সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ জানানোয় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—জামায়াত কি বিএনপির সঙ্গে সরকারে যেতে চায়? এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি জামায়াতকে বাদ রেখেই জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা বলছে। তিনি জানান, বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনায় সব দলের সহযোগিতার বিষয়টি সামনে আনছে জামায়াত।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ১ম বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা, মানতে হবে যেসব শর্ত
জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব বাস্তবায়নে এগোবে। আর বিএনপি সরকার গঠন করলে তারা সহযোগিতা করতে চায়। ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ যে ১০টি দল জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতায় রয়েছে, তারাও তিন শর্তে জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে।
দুই দলের প্রস্তাবে যোগসূত্র আছে কি না—এ প্রশ্নে উভয় দলের নেতারা তা অস্বীকার করছেন। তবে পার্থক্য স্পষ্ট। জামায়াত জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে। আর বিএনপি বলছে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা।
বিএনপি ২০২২ সালে যুগপৎ আন্দোলনের সময় ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দেয় এবং সেখানে জামায়াতকে বাদ রেখেই মিত্রদের নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা বলা হয়। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসিকে বলেন, তারা জামায়াতকে বাদ রেখেই সরকার গঠনের অবস্থানে রয়েছেন।
বিএনপির আরেক নেতা বলেন, সব দল মিলে সরকার গঠন করলে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকবে না এবং একপক্ষীয় সংসদ তৈরি হতে পারে। সে কারণে বিএনপি সহযোগিতা ও ক্ষমতার অংশীদারিত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রাখতে চায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য অবস্থান বিবেচনায় বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ঐকমত্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা কম। কারণ দুই দলই আলাদা শিবিরের নেতৃত্ব দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং একে অপরকে বাদ রেখেই সরকার গঠনের প্রস্তাব দিচ্ছে।