এনসিপি নেতারা © টিডিসি সম্পাদিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়নপত্র জমা কার্যক্রম শেষে প্রার্থীদের কার কি পরিমাণ সম্পত্তি ও নগদ অর্থ রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আলোচিত প্রার্থী আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেনে, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে সম্পত্তি ও নগদ অর্থের পরিমাণে এগিয়ে আছেন হান্নান মাসউদ, তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৬ টাকার।
পরামর্শ দিয়ে বছরে ১৬ লাখ আয় নাহিদের
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, পরামর্শ দিয়ে বছরে ১৬ লক্ষ টাকা আয় করেন তিনি। তবে তার কোনো স্থায়ী সম্পদ নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসন থেকে নির্বাচন করবেন নাহিদ ইসলাম। হলফনামা অনুযায়ী, বর্তমানে তার পেশা পরামর্শক, এর আগে ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গোড়ানের দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা তিনি। তার স্থায়ী ঠিকানা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বাড্ডার বড় বেরাইদ এলাকায়।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান-জামায়াত আমির-নাহিদের চেয়ে স্বর্ণ বেশি নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর
নাহিদ ইসলামের কোনো বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, কৃষি, অকৃষি জমি নেই। নেই আগ্নেয়াস্ত্র ও মামলাও। ব্যাংকে ঋণ আছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। পরামর্শ দিয়ে বছরে আয় হয় ১৬ লাখ টাকা; নিজের কাছে নগদ আছে ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা; স্ত্রীর কাছে আছে ২ লাখ টাকা। ব্যাংকে আছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৩ টাকা ৫৭ পয়সা। এছাড়া নিজের অর্জনকালীন ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের অলঙ্কার এবং স্ত্রীর আছে অর্জনকালীন ১০ লাখ টাকা মূল্যের গহনা। ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও আসবাব আছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার। সব মিলিয়ে এনসিপি প্রধানের ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকার সম্পদ আছে। গত বছরে আয় হয়েছে ১৩ লাখ ৫ হাজার ১৫৮ টাকা। আর আয়কর দিয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ২৭৪ টাকা।
কৃষি, ব্যবসা ও চাকরি থেকে আখতার হোসেনের আয় বার্ষিক পাঁচ লাখ
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন কৃষি, ব্যবসা ও চাকরি থেকে বার্ষিক পাঁচ লাখ টাকা আয় করেছেন। হলফনামায় পেশা হিসেবে আখতার হোসেন ‘শিক্ষানবিশ আইনজীবী’ এবং স্ত্রী ‘গৃহিণী’ উল্লেখ করা হয়েছে। রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আখতার হোসেন। হলফনামা অনুযায়ী, তার নগদ অর্থ আছে ১৩ লাখ টাকা। স্ত্রী সানজিদা আক্তারের আছে চার লাখ টাকা। নিজের ব্যাংকে জমা আছে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৪২৬ টাকা। নিজের সাত লাখ ও স্ত্রীর আছে ১০ লাখ টাকার গহনা। নিজের অস্থাবর সম্পদের মূল্য ২৭ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর ১৬ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১৮ শতাংশ কৃষি জমি। যার বর্তমান মূল্য ২৩ হাজার টাকা। ব্যক্তিগত ও সরকারি দায় নেই।
মার্কেটিং কনসালটেন্ট হিসেবে আড়াই লাখ আয় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মার্কেটিং কনসালটেন্ট হিসেবে বার্ষিক ২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৩৩ টাকা আয় দেখিয়েছেন। ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। তার হলফনামা অনুযায়ী, তার হাতে বর্তমানে নগদ ২৫ লাখ টাকা আছে। পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী মিলে তাদের ২২ লাখ টাকার গহনা আছে। তার নামে কোনো বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নেই। ব্যাংকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ৮ হাজার ২৭৫ টাকা জমা আছে, তবে স্ত্রীর নামে আছে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৯৮০ টাকা। ৪০ হাজার টাকার ইলেকট্রিক পণ্য ও আসবাবপত্র আছে এক লাখ টাকার। বর্তমানে ৪০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। তিনি ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ গ্রহণ করেননি। আয়কর রিটার্নে দেখানো সম্পদের পরিমাণ ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
হাসনাত আব্দুল্লাহর মোট সম্পদের পরিমাণ ৫০ লাখ টাকা
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ হলফনামায় দেখিয়েছেন তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৫০ লাখ টাকা। কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বার সংসদীয় আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। হাসনাত আবদুল্লাহ নির্বাচনি হলফনামায় তিনি বর্তমানে নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করছেন। তার স্ত্রী গৃহিণী। হলফনামা অনুযায়ী, তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও বার্ষিক আয় মিলে মোট সম্পদ রয়েছে ৫০ লাখ টাকার। তার মধ্যে ২৬ লাখ টাকার সোনা ব্যাংকে জমা রয়েছে। আসবাবপত্র রয়েছে এক লাখ টাকার, ইলেকট্রনিক পণ্য ৬৫ হাজার টাকার। তিনি ২০২৫- ২০২৬ অর্থ বছরে তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকা। হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। হাসনাত আব্দুল্লাহর নামে কৃষি জমি নেই। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকার মূলধন রয়েছে। ঋণসংক্রান্ত বিবরণী দিয়ে তিনি জানান, তার পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তানের নামে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করা হয়নি।
সারজিসের সম্পদের মূল্য ৩৩ লাখ
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের হলফনামায় দেখিয়েছেন, তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৩ লাখ টাকা। পঞ্চগড়–১ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তিনি। হলফনামা অনুযায়ী, তিনি ব্যবসা থেকে বছরে ৯ লাখ টাকা আয় করেন। তার সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স)। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে সারজিস আলম মোট আয় দেখিয়েছেন ২৮ লাখ ৫ হাজার টাকা।
আরও পড়ুন: বছরে তারেক রহমানের আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, মোট সম্পদ কত?
রিটার্ন অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের মূল্য ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬২৮ টাকা। এ খাতে তিনি আয়কর পরিশোধ করেছেন ৫২ হাজার ৫০০ টাকা। তার হাতে নগদ রয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ১২৮ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমাকৃত অর্থের পরিমাণ এক লাখ টাকা। তার নামে দানসূত্রে প্রাপ্ত ১৬ দশমিক ৫০ শতক কৃষিজমি রয়েছে। অর্জনের সময় ওই জমির মূল্য ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা, যা বর্তমানে আনুমানিক ৫ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পদ বিবরণীতে আসবাবপত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা এবং ইলেকট্রনিক সামগ্রীর মূল্যও ৭৫ হাজার টাকা। তার কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই। তার নামে কোনো বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বা ভবন নেই বলেও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও সারজিস আলমের নামে একটি মামলা রয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন। তার নামে কোনো বন্ড, ঋণপত্র বা স্টক এক্সচেঞ্জভুক্ত শেয়ার নেই।
বাবার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি সম্পদ রয়েছে ছেলে হান্নান মাসউদের
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসন থেকে নির্বাচন করবেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ। একই আসনে হান্নান মাসউদের বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক একই আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। তাদের দুজনের হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাবার চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সম্পদ রয়েছে ছেলে হান্নান মাসউদের।
হলফনামায় হান্নান মাসউদ ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৬ টাকার মোট সম্পত্তির হিসাব দাখিল করেছেন। এতে ২৬ বছর বয়সী আবদুল হান্নান মাসউদ নিজেকে ডিজিল্যান্ড গ্লোবালের স্বত্বাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার কাছে নগদ ৩৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭৫ টাকা, ব্যাংকে ২ হাজার ৫৫ টাকা, ১ লাখ টাকার ঋণপত্র, ৮ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার, ১ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী এবং ১ লাখ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করেন, যেগুলোর অর্জনকালীন মূল্য ৪৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩০ টাকা হলেও বর্তমান মূল্য ৭৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩০ টাকা বলে উল্লেখ করেছেন। সবশেষ জমা দেওয়া আয়কর রিটার্নে ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৬ টাকার মোট সম্পদের হিসাব দাখিল করেছেন।
আরও পড়ুন: পেশায় ব্যবসায়ী নুর, বার্ষিক আয়ে ছাড়িয়ে গেলেন তারেক-শফিকুর-নাহিদকেও
একই আসনে হান্নান মাসউদের বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) হয়ে একতারা প্রতীকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ জমা দেয়া আয় কর রিটার্নে আবদুল হান্নান মাসউদের বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক মোট ২০ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫১ টাকার মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করেছেন।
আবদুল হান্নান মাসউদের বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেকের হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পেশায় তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার কাছে নগদ ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ও ব্যাংকে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫১ টাকা রয়েছে। এছাড়া ২৫ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও ৭৫ হাজার টাকার আসবাবপত্রেরও মালিক তিনি। হলফনামায় তিনি কৃষি ও অকৃষি খাতে মোট ১৬৮ শতাংশ জমির মালিক বলে উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখ্য, সংশোধিত তফসিলের নির্বাচন সময়সূচি অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।